যোগ্য সত্ত্বেও চাকরিতে পিছিয়ে প্রতিবন্ধী নারী

আল আরাফা ইসলামিক ব্যংকে প্রিন্সিপাল অফিসার ফাহিমা খাতুন ১৩ বছর ধরে কাজ করছেন । তিনি দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী। দুই চোখেই কিছু দেখতে পান না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র-বিজ্ঞানে মাষ্টার্স করে ফাহিমা বেসকারি উন্নয়ন সংস্থায় ১৬ বছর কাজ করেন। তারপর যখন ব্যাংকে ইন্টারভিউ দেন তখন প্রথমই তাকে নিয়ে সন্দিহান হন সবাই। তিনি তাদের বোঝাতে পারেন-তাকে একবার সুযোগ দিয়ে দেখার জন্য। সেই সুযোগ পেয়ে আজ অবধি নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন ফাহিমা। তিনি বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে কাজ করেন। তবে আধুনিক বাংলাদেশে এখনো অনেক প্রতিবন্ধী নারী কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান না।

চাকরি হয় না তাদের: নাহিদা আক্তার মলি ২০১৮ সালে খিলগাঁও মডেল কলেজ থেকে মার্কেটিং-এ মাষ্টার্স পাশ করেন। এখন পর্যন্ত তার কোথাও চাকরি হয়নি। সরকারি বেসকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে মলি চাকরির আবেদন করেন । কিন্তু তাকে সব সময় শুনতে হয় শ্টর্-লিস্টে তার নাম বাদ পড়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন মলি । শিক্ষাও দক্ষতা তাকে একটি চাকরি এনে দিতে পারছে না। সব ভাই বোনের বিয়ে হওয়ার পর মা আর মলির সংসারে এখনো মা ছোটখাটো হাতের কাজ করে চালান। এই অবস্থায় তার চাকরি খুব প্রয়োজন। প্রয়োজন শুধু মলির নয়, প্রয়োজন ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ শিক্ষিত ও দক্ষ প্রতিবন্ধী বেকার নারীর। যদিও সংশ্লিষ্টদের মতে , ৩ শতাংশ প্রতিবন্ধী নারী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে যুক্ত এবং ১ শতাংশ পেশায় যুক্ত।

আইনে আছে কাজে নেই: মলি জানান, তার বা পায়ে সমস্যা একপায়ে লোহার জুতা পরে তাকে হাঁটতে হয়। তারানা শহীদ এসএসসি পর্যন্ত পড়াশুনা করে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেন। তারপর অনেক জায়গায় চাকরির জন্য আবেদন করেন, কিন্তু তারও কোথাও থেকে ডাক আসে না। তার মতো আরো অনেক প্রতিবন্ধী নারী আছেন যাদের শিক্ষা সনদও প্রশিক্ষণের দক্ষতা কোন পেশায় যুক্ত করতে পারছে না বলে জানান প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন সংস্থা-ডাব্রিউডিডিএফ-এর নিবার্হী পরিচালক আশ্রাফুন নাহার মিষ্টি। 

তিনি বলেন,  ২০১৩ সালে করা হয় প্রতিবন্ধী অধিকার ও সুরক্ষা  আইনে সুস্পষ্ট লেখা আছে যোগ্যতা থাকলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে কোন প্রকার বৈষম্য করা যাবে না। কিন্তু আমরা হর-হামেশাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি এবং অনেক যুদ্ধ করে পড়াশুনা শেষ করে পেশায় ঢুকতে বৈষম্যের শিকার হতে দেখি। হুইল চেয়ার ব্যবাহার করা মিষ্টি বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে ৩৪ জন স্টাফ আছেন যার মধ্যে ২ জন প্রতিবন্ধী পুরুষ। ৩২ জন নারী তাদের মধ্যে ২৮ জন প্রতিবন্ধী। তাদের উচ্চতা কম হলে উঁচু চেয়ার দেওয়া হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলে তারা কম্পিউটারে জজ সফর্টওয়ার ব্যবহার করে কাজ করতে পারেন।অর্থাৎ যার যা প্রয়োজন সে সহযোগিতা পেয়ে কাজে যুক্ত আছেন তারা। 

মানসিকতা বদলাতে হবে: তথ্য প্রযুক্তির সময়ে প্রতিবন্ধিতা কাজের জন্য বাধা হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন বি-স্ক্যানের সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব। তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষিত হলে এবং তাদের পরিবার সহযোগিতা করলে তারা যে সকল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কাজের সুযোগ পান। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয় না। প্রতিবন্ধী নারী হলে তার প্রতি বৈষম্য আরো কয়েকগুন বেশি হয়। আমাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে যারা তাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হল যোগাযোগা ব্যবস্থা। প্রবেশগম্য নয় আমাদের বেশির ভাগ যানবাহন। তারপরও একজন সেরিব্রালপলসি আক্রান্ত ব্যক্তি নারায়নগঞ্জ  থেকে বনশ্রীতে এসে কাজ করেন। তাই তাদের কাজে যুক্ত করতে সহযোগিতা যেমন প্রযোজন তেমন প্রবেশগম্য ব্যবস্থাপনাও প্রয়োজন।’

আরো আছে প্রতিবন্ধকতা : প্রতিবন্ধী নারী কাজে যুক্ত হলে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি বলে জানান, ডাব্রিউডিডিএফএর  চেযারপারসন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিরিন আক্তার। তিনি বলেন, তাদের যাতায়াতের সমস্যা, পরিবার থেকে বেড় হওয়া সমস্যা মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা আছে। আর ব্যাংকের  প্রিন্সিপাল অফিসার ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘প্রতিবন্ধী নারীকে আগে কাজের যোগ্য হয়ে কাজে নামতে হবে । যাতে তাকে কাজ দিয়ে  কেউ অপবাদ দিতে না পারে যে, প্রতিবন্ধী নারীরা কাজ পারেন না। শিক্ষা, দক্ষতা আর পদে পদে ‘আমি পারি’ প্রমাণ দেওয়ার মানসিকতা নিয়েই পেশায় আসতে হবে।’