কেঁচো সার উৎপাদন

সাত বছর আগে শুরু করেন ৩ কৃষক, ছড়িয়ে পড়েছে ৬ গ্রামে

নেত্রকোনার প্রত্যন্ত অঞ্চল কেন্দুয়া উপজেলা। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে এই উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন ৩ কৃষক। প্রায় সাত বছরের ব্যবধানে এখন সেই কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট সার) উৎপাদন ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলার ছয়টি গ্রামে।

কৃষকরা বলছেন, নামমাত্র খরচায় তৈরি করা যায় এই সার। বাণিজ্যিকভাবে কেঁচো সার উৎপাদন করে লাভবান হয়েছেন অনেকেই। উপজেলার দলপা ইউনিয়নসহ ১৩টি ইউনিয়নেই দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে  এই পদ্ধতি। কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে এসব কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। স্থানীয় উপজেলা কৃষি অফিসও কেঁচো সার উৎপাদনে কৃষক-কৃষাণীদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাটির স্বাস্থ্য সবল রাখার জন্য জৈব পদার্থের প্রয়োজন। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, অতিমাত্রায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার, অবিবেচকের মতো বালাইনাশক প্রয়োগ, মাত্রা অতিরিক্ত আগাছা নাশক ও বিভিন্ন কৃত্রিম হরমোন ব্যবহারের ফলে প্রতিনিয়তই মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে এবং জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। মাটির ভারসাম্য রক্ষায় এবং জমিতে ভালো ফলন উৎপাদনের জন্য জৈব সারের কোনো বিকল্প নেই। কেঁচো সার মাটির উর্বরতা ধরে রাখে।

সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলার দলপা ইউনিয়নের বেখৈরহাটি ব্লকের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে বাণিজ্যিকভাবে কেঁচো সার উৎপাদনের চিত্র দেখা গেছে। এ সময় কথা হয় কেঁচো সার উৎপাদনে জড়িত কৃষকদের সঙ্গে।

তারা জানান, বেখৈরহাটি ব্লকের জরিনা আক্তারসহ ৩ জন কৃষক-কৃষাণী ২০১৭ সালে জানুয়ারি মাসে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ভার্মি কম্পোষ্ট (কেঁচো সার) উৎপাদন শুরু করেন। বর্তমানে এই ব্লকের ৬টি গ্রামে অন্তত শতাধিক কৃষাণ-কৃষাণী কেঁচো সার উৎপাদন করে নিজেদের জমিতে ব্যবহার করছেন এবং অতিরিক্ত সার বাজারে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। শুধুমাত্র ওই ব্লকে বাণিজ্যিকভাবে এ সার উৎপাদন করছেন কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ জন।

বেখৈরহাটি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাকিল মাহমুদ খান বলেন, অসুস্থ মানুষ যেমন ঠিকমত কাজ করতে পারেন না, তেমনি অসুস্থ মাটিতেও সঠিকভাবে ফলন উৎপাদন অসম্ভব। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈব সারের কোনো বিকল্প নেই। এই জৈব সারের প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কেঁচো কম্পোস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা করতে পারে। এই সার প্রয়োগের ফলে মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখে, মাটির উর্বরতা ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। তাই আমরা কেঁচো সার উৎপাদনে উৎসাহিত করছি।

কৃষক রাকি এমরান বলেন, প্রথমে আমরা দুই-তিনজন শুরু করেছিলাম এখন আমাদের দেখে বেখৈরহাটি এলাকায় প্রায় শতাধিক কৃষক জৈব সার বা কেঁচো সার উৎপাদন করে নিজেদের জমিতেও ব্যবহার করছেন, আবার ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন। খুব কম খরচেই এই সার উৎপাদন করা যায়।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ূন দিলদার বলেন, আমার উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নেই ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদনে কৃষাণ-কৃষাণীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তারা নিজেরাই কেঁচো সার উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কেঁচো সার সব ধরনের ফসলেই ব্যবহার করা যায়। ধান, গম, পাট, আলু, কচু, পেয়াজ, মরিচ, হলুদ, শাক-সবজি, ভূট্টা, ফলদ, বনজ বৃক্ষ, কলা, পেঁপে, লাউ, কুমড়া, চিচিংগা, শসা, ঝিঙা, কড়লা, শীম, পটল, কাকরোল, পানের বরজ ও মৌসুমি ফুল উৎপাদনেও কেঁচো সার ব্যবহার করা যায়।