কর্মে কমে যাচ্ছে নারীর অংশগ্রহণ

দেশের নারীর কর্মে অংশগ্রহণ করোনাকালের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারলেও এখনো ৫০ শতাংশ নারী শ্রমে যুক্ত হতে পারেনি। আবার দেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাত গার্মেন্টস সেক্টরে কমেছে নারীর অংশগ্রহণ। ব্যাংকিং খাতে তিন বছর থমকে আছে, একই অবস্থানে আছে নারী কর্মীর সংখ্যা। অথচ দেশে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি এবং গড় আয়ুও বেশি। তাই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী শ্রমশক্তিকে কাজে লাগাতে শ্রমে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও টেকসই করতে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে ইনোভেটিভ পদক্ষেপ গ্রহণ বাস্তবায়নের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিজ্ঞজনরা।

তৈরি পোশাক খাতে নারী কর্মী কমেছে :দেশের তৈরি পোশাক খাতে কমেছে নারীর অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর গবেষণা ২০২৪ সালে প্রকাশ করা গবেষণায় দেখা যায় ২০১৪ সালে দেশের গার্মেন্টেস ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৫৬ শতাংশ। যা ২০২৩ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৫৩ শতাংশ। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, অটোমেশন ও অন্যান্য খাতের তুলনায় মজুরি ও সুযোগসুবিধা কম থাকায় এই খাতে তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কমে গেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাপড ইন বাংলাদেশের (এমআইবি) এর তথ্য মতে, পোশাক খাতে নিযুক্ত মোট শ্রমিকের মধ্যে নারীর সংখ্যা কমে ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ এক সময় পোশাক খাতের মোট শ্রমিকের ৮০ শতাংশের বেশি ছিলেন নারী।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, গার্মেন্টেস শিল্পের বয়স ৫০ বছর হলেও পরিপূর্ণভাবে সম্পালইন হতে পারেনি। এই শিল্প এখনো নানা রকম প্রতিবন্ধকতার মধ্যে আছে। সব চেয়ে কম মুজুরি, বেতনভাতাসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি না দেওয়া শ্রম আইনের অধীনে ৫০-এর অধিক নারী থাকলে যে কেয়ার সেন্টার থাকার মতো শ্রমিক অধিকার আদায় হয়নি। উপরুন্তু বেশ কিছু গার্মেন্টেস যৌন হয়রানির শিকার হন নারী। ফলে অনেক পরিবার এখন আর নারীকে গার্মেন্টেস কাজে দিতে চায় না।

তিন বছর ব্যাংকে নারী কর্মী একই অবস্থানে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২৩ সালের জুলাই-ডিসেম্বর করা প্রতিবেদন মতে ব্যাংকে নারী কর্মীর হার তিন বছর ধরে আটকে আছে ১৬ শতাংশে। প্রতিবেদনে বলা হয় দেশের ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও তা মোট জনবলের বিপরীতে এখনো বেশ কম। ব্যাংকগুলোর বোর্ড তথা পরিচালনা পর্ষদে নারীর সংখ্যা কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, ২০২৩ সালের শেষে ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩৪৬। এর বিপরীতে পুরুষ কর্মীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৫০। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, ব্যবস্থাপনা পর্যায় গেলে নারী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয় না। তখন তাদের হেড অফিসে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করা হয়। তখন অনেক নারী চাকরি ছেড়েও দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর নাজনিন সুলতানা বলেন, নারী কম আসছে আবার তারা অনেক সময় সংসার সন্তানকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করে। আমি যখন কাজ করেছি তখন ছেলেরা যে দায়িত্ব নিয়েছে সেই দায়িত্বই নিয়েছি। কারণ পুরুষের একটা বদ্ধমূল ধারণা আছে মেয়েরা সন্তান সংসারের জন্য সব দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে।  কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র হোসনে আরা শিক্ষা বলেন, নারীরা সংসার করবে কাজও করবে এমন একটা মনোভাব নিয়ে কাজ করছেন। তাদের কাজের সাথে সংসারকে না মিলানোর পরামর্শ দেন তিনি। দক্ষ নারীকে প্রতিষ্ঠান পদোন্নতি দিবে বলেও গুরুত্বারোপ করেন। 

এই বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ইত্তেফাককে বলেন, নারীকে এখনো সংসারের ৮০ শতাংশ কাজ করতে হয়। তার উপর বাচ্চা রেখে কাজ করাও একটা বড় প্রতিবন্ধকতা। সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিবা যত্ন কেন্দ্র করছে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, অনেক মেয়েরা কাজে বিরতি দিয়ে সংসার গুছিয়ে আবার কাজে ফিরতে চান। আবার বাল্যবিবাহ হওয়া মেয়েদের শিক্ষা ও কাজে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে বাড়ছে নারী-পুরুষের বৈষম্য। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ)এর ২০২৪ সালের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ’ প্রতিবেদন মতে বার্ষিক সূচকে বড় ধরনের পতন হয়েছে বাংলাদেশের। ডব্লিউইএফ-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বার্ষিক এই সূচকে গত বছরের তুলনায় ৪০ ধাপ পিছিয়েছে দেশ। বিশ্বের ১৪৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের শূন্য দশমিক ৬৮৯ স্কোর পেয়ে ৯৯তম অবস্থান আছে।