‘নাটকের মান বিচার করে অনুদান দেওয়া উচিত’

গাজী রাকায়েত বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক ও চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা ও নির্দেশক। তাঁর নির্দেশিত নাটক নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন মঞ্চে। আর তাঁর প্রথম নির্দেশিত চলচ্চিত্র ‘মৃত্তিকা মায়া’ ১৭টি ক্যাটাগরিতে পেয়েছিল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। গুণী এই নির্মাতার সঙ্গে কথা বলেছেন নাট্যকার মাহবুব আলম

অনেক দিন চারুনীড়মের নতুন নাটক মঞ্চে আসছে না। এ বিষয়ে কিছু বলবেন কি? মঞ্চে অনুবাদ ও মৌলিক সাহিত্যের মধ্যে আমরা কোন দিকটাতে এগিয়ে?

চারুনীড়মের প্রায় ৬/৭টা প্রোডাকশন আছে। আর নতুন প্রোডাকশন হিসেবে আমাদের তো তিনটাই নতুন। এরমধ্যে ‘ডেড পিকক’ একটি, যার প্রায় ১৮/১৯টা শো হয়েছে। আবার ‘শেষ নবাব’ অনেক ভালো একটি নাটক। এটিরও ৭/৮টা শো আমরা করতে পেরেছি। তবে এটি লাস্ট করার পর আর চার-পাঁচ মাস কোনো ডেট নাই। ‘শেষ নবাব’ তো স্টুডিও থিয়েটারে করব না। কারণ ওটা ওই হলের উপযোগী নয়। শো করতে না পেরে নাটকের সেট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাইদ আহমেদের নাটককে এনকারেজ করা উচিত। যারা বড় দলগুলোয় আছে, নেতৃত্বস্থানীয়; তারা ডেটগুলো নিয়ে নেয়। ছোট দলগুলো ডেট পায় না। কাকে ডেট দেওয়া উচিত আর কাকে দেওয়া উচিত না, এই ক্রাইটেরিয়া ঠিক নাই। একটা নতুন নাটক নামিয়ে আপনি শো করবেন কোথায়? হলের সেই ক্রাইসিস তো মেটেনি। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের কজন নেতৃত্বস্থানীয় লোক ‘শেষ নবাব’ দেখেছে? এই সংকটগুলোর পাশাপাশি দর্শক-সংকট তো আছেই। দর্শক নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। দর্শক দেখল কি দেখল না, এটা কখনোই আমার শিল্পমান বিচারের প্রধান ক্রাইটেরিয়া না। দর্শক হওয়াটা সময়ের ব্যাপার। অনেক সাধারণ নাটকের দর্শক হয়, আবার অনেক ক্লাসিক্যাল নাটকের দর্শক হয় না।

সিনেমার জন্য অনুদান আর নাটকের জন্য অনুদানের মধ্যে বৈষম্য কেমন? এই বৈষম্যকে কতখানি যুক্তিযুক্ত মনে করেন?

গত দু বছর বিশ হাজার টাকা করে দিয়েছে চারুনীড়মকে। এবার তো দেয়ইনি। আমার মনে হয় প্রযোজনা ভিত্তিক অনুদান দেওয়া উচিত। একটি দল যখন নাটক করবে, তখন তার মান বিচার করে তাকে অনুদান দেওয়া উচিত। আমি যেন বিনা পয়সায় শো করতে পারি, টিকিট বিক্রির ওপরে ভরসা করে নয়। ভালো মানের একটা নাটক করতে গেলে প্রতি শোতে বারো থেকে পনেরো হাজার টাকা খরচ আছে। প্রতিটি দলকে যদি শো প্রতি দশ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়, তাহলে কিন্তু একটি দল সচল হয়ে যায়। 

শো-প্রতি অনুদান বরাদ্দ দিতে গেলে হল সংকট এবং অনুদান বণ্টন কতখানি স্বচ্ছ হবে?

এখানে স্বচ্ছতার থেকেও বড় কথা হচ্ছে নির্বাচনের ভোট। আমি যখন সবাইকে খুশি করতে যাব, তখন আর সিলেকশন হবে না। ঢাকায় এখন সত্তরটার মতো দল আছে। আমি কি এদের সবাইকে খুশি করতে পারব? তাহলে ক্রাইটেরিয়া কী হবে? নিয়মিত শো করার একটি জায়গা দিতে হবে। তাকে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। সেক্ষেত্রে একটি প্রিভিউ কমিটি করতে হবে, কেননা সবাই নিজের নাটককে শ্রেষ্ঠ নাটক মনে করছে। তবে কমিটির লোককে অবশ্যই সম্মানী দিতে হবে। সেখান থেকে সিলেকশনের মাধ্যমে বিশটা নাটক আপনি নিয়ে আসেন ন্যাশনাল থিয়েটারের জন্য। এই বিশটা নাটকেরই নিয়মিত শো হবে শিল্পকলায়। এদের নিয়মিত অনুদান দিতে হবে। তাহলেই কিন্তু নাটকটা বেঁচে গেল। এভাবে অনুদান বরাদ্দও সঠিক হবে এবং হল বরাদ্দও স্বচ্ছ হবে। এক্ষেত্রে সরকারের এগিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। আর এটা শুধু ঢাকায় করলে চলবে না। প্রতিটি জেলায় এই প্রক্রিয়ায় কাজ করতে হবে। এটাকে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবেই বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক বাঁচবে।

বর্তমানে অনেক নাটক হচ্ছে রেপার্টরি থিয়েটারের নাম দিয়ে। এটি সার্বিকভাবে নাটকের মানোন্নয়নে কী ভূমিকা রাখছে?

আসলে ডেফিনেশনে কিছুটা ভুল বোঝার বিষয় আছে। রেপার্টরি হলো একটি কোম্পানি, যার অধীনে কয়েকটি নাটক তৈরি থাকবে। সেদিক থেকে তো আমাদের প্রতিটি গ্রুপ থিয়েটারই একেকটা রেপার্টরি। রেপার্টরি মানেই কি প্রফেশনাল থিয়েটার? এটার নাম হতে পারে ইন্টারগ্রুপ থিয়েটার। আমরা এই নামই দিয়েছিলাম। শিল্পকলা একাডেমি যে কাজটা করে, সেটা সরকারি আন্টারগ্রুপ থিয়েটার। আর আমরা যেটা করি, সেটা বেসরকারি ইন্টারগ্রুপ থিয়েটার। এখন গ্রুপ থিয়েটারের যে চর্চা, সেটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আর বাংলাদেশে আছে। সেটা পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। শুধু টাকা দিয়ে তো রেপার্টরি হয় না। সরকারি গ্রান্ড যদি ধরেন, সেটা গ্রুপ থিয়েটারেই দেওয়া উচিত।

আপনার নির্দেশিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র করছেন ‘গোর’, এটি একইসঙ্গে বাংলা ও ইরেজি ভাষায় অভিনীত হয়েছে। দুই ভাষায় করার কারণ কী?

একটু পেছনে তাকালে দেখবেন, বাংলাদেশ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ইংরেজি ফিচার ফিল্ম হয়নি। একটি অসাধারণ চলচ্চিত্রকে বোঝার জন্য যদিও ভাষা প্রধান ফ্যাক্টর নয়, তারপরও আমরা কিছু কিছু জায়গায় আটকে আছি। কলোনিয়াল যে ইফেক্ট, সেখান থেকে আমরা বের হতে পারছি না। গোটা পৃথিবীতে একটি কমন ল্যাঙ্গুয়েজ আছে, সেটা কী? সেটা হলো ভাষা। ভাষার কারণে আমরা পিছিয়ে থাকব, সেটা তো হতে পারে না। একুশে ফেব্রুয়ারি তো এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হয়েছে। আমার কথা হলো, আপনি যে ভাষাতেই কথা বলেন না কেন, তার আগে আপনার মাতৃভাষা ঠিক করে বলেন। আর একটা বিষয়, যেটা আমার মাথায় আছে, সেটা হলো, আমাদের দেশের অনেকের ছেলেমেয়ে এখন বিদেশে বড় হচ্ছে। তাদের অনেকেই বাংলা ভালো করে বোঝে না। যাদের জন্য ইংরেজিটা সহজ হবে। আমি একটি দর্শকও মিস করতে চাই না। তাই দুই ভাষাতেই এটি অভিনীত হয়েছে এবং আরবি, ফ্রেঞ্চ, জার্মানসহ কয়েকটি ভাষায় এটির সাবটাইটেল হবে।