সড়কপথে প্রতিনিয়ত সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাকবলিত হয় মোটরসাইকেল। চালক-আরোহী হতাহতের পাশাপাশি প্রায় ক্ষেত্রেই বাইকটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। দুমড়ে-মুচড়ে এমন হাল হয় যে, তা আর চেনার মতো থাকে না। এমনই সব বিধ্বস্ত বাইক সারাইয়ে সারা দেশে সুনাম ছড়িয়ে রয়েছে যশোরের মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপের। দুমড়ে-মুচড়ে প্রায় ভাঙড়ি হয়ে যাওয়া এসব মোটরসাইকেল ঝা চকচকে শোরুমের চেহারার আদলে রাস্তায় ফিরে আসছে। চকচকে এসব বাইক দেখে বোঝার উপায় নেই, দুর্ঘটনায় এটা পুরো বিধ্বস্ত হয়েছিল।
যশোর শহরের নলডাঙ্গা রোডের আবাসিক এলাকাকে ঘিরেই গড়ে ওঠেছে ভিন্নধর্মী এই মোটরসাইকেল রিপিয়ারিং শিল্প। সংকীর্ণ রাস্তার দুই ধারে গড়ে ওঠেছে দুই শতাধিক এমন প্রতিষ্ঠান। সিরাজ-প্রশান্ত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অন্যতম স্বত্বাধিকারী মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রায় ৪৭ বছর আগে কেরামত হোসেন নামের একজন মেকানিক এখানে এই শিল্পের বিকাশ ঘটান। সেই সময়ের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, তখন জাপানি সিডিআই গাড়ির পার্টস নষ্ট হতে শুরু করেছে সবে। এসব পার্টস রিপিয়ারিং-এর মধ্য দিয়েই ব্যবসার শুরু। ঐ সময় স্যালেন্ডার, কানেক্টিং, ক্লাস বক্স, ক্লাস বাটি, চেম্বার, চাকা, ক্রিকার শ্যাপ, গিয়ার শ্যাপ, গিয়ার বক্স, ডাম্পার, হেড স্যালেন্ডারের ত্রুটিগুলো সারিয়ে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হতো।
বর্তমানে এখানে মোটরসাইকেল ও ভেসপার যাবতীয় ত্রুটি মেরামতের সব কয়টি সেক্টরে কাজ হয়। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির রিপিয়ারিংয়ের কাজ করা হয় প্রথমেই লেদে। এরপর দরকার হয় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া চেসিস, ট্যাংকি এবং চাকা সোজার কাজ। এসব ডেন্টিং কাজের পর রঙ এবং স্টিকার কাজের সেকশন হলো পেইন্টিং। সবশেষে ইঞ্জিন মিস্ত্রি এটা ফিটিং করেন। এর বাইরে গদি, ওয়াশ এবং নিকেল করারও পৃথক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শান্ত মোটরসাইকেল কালার হাউজের কর্ণধার মো. শান্ত মোল্লা কুরিয়ার সার্ভিসের একব্যাগ রশিদ দেখিয়ে বলেন, ‘মিলিয়ে দেখেন, ৬৪ জেলায় মেরামত করে পাঠানো হয়েছে। একটা সিডিআই গাড়ির পেইন্টিং ও স্টিকার করতে খরচ হয় ১৫ হাজার টাকা। দুর্ঘটনায় একেবারে ভাঙারি হয়ে যাওয়া আড়াই লাখ টাকা দামের নতুন মোটরসাইকেল ৪০-৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে একেবারে শোরুমের আদলে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে বলে দাবি করেন বেল্লাল হোসেন নামের সিনিয়র মেকানিক। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর গাড়ির চেহারা যারা দেখেন, মেরামতের পর তারা বিশ্বাস করতে পারেন না, এটা সেই গাড়ি! তবে এসব কাজের অত্যাবশ্যকীয় টেম্পার মেশিন না থাকায় তার জন্য ঢাকায় যেতে হয়।
হোসেন ডেন্টিংয়ের মো. হোসেন আলী বলেন, দুর্ঘটনায় চেসিস বাঁকা হলে সোজা করা, ট্যাঙ্কির টোপ তোলা কিংবা ট্যাংকির তলা পালটানোর কাজ এখানে নিখুঁতভাবে করা হয়। ডেকোরেশেন এমনভাবে মডিফাই করা হয় যে, শুধু নাম্বারটাই ঠিক থাকে। আর পুরো চেহারাই বদলে যায়। কুয়াকাটা থেকে মোটরসাইকেল মেরামত করতে আসা ঠিকাদার মো. মিরাজ বলেন, ‘কয়েক বছরে আমার তিন-চার বার এখানে আসা পড়েছে। এত সুন্দর কাজ বাংলাদেশে আর কোথাও হয় না। তবে এলাকার পরিবেশ খুব খারাপ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, একজন কারিগর জানান, কোম্পানির আমদানি করা নতুন মোটরসাইকেল পরিবহনের সময় ট্যাংকির টোপসহ বেশকিছু ত্রুটি সৃষ্টি হয়। একেবারে নতুন এসব বাইকও এখানে মেরামত করে ত্রুটিমুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক-সমিতির কেন্দ্রীয় পরিচালক মো. সিরাজ খান বলেন, ভারত থেকে সহজলভ্য পার্টস এবং সুদক্ষ কারিগরের কারণে মোটরসাইকেল মেরামতে যশোরে বড় রকমের শিল্প গড়ে উঠেছে। কিন্তু প্রায় শিক্ষাহীন এসব কারিগরের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাসহ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে এই শিল্পের আরো প্রসার ঘটবে। সহজ শর্তে বিনিয়োগ করা হলে এখানকার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প ৫০ ভাগ পার্টস আমদানি কমাতে সক্ষম। তিনি আরো বলেন, ‘এখানে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তা আবাসিক এলাকার মধ্যে। মানুষের কটু কথা শুনতে হয়। মোটরসাইকেল রেখে কাজ করতেও সমস্যা হয়। এলাকাবাসীর চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটে। পরিবেশ দূষিত হয়। এজন্য এই শিল্পকে সরকারি উদ্যোগে একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া দরকার।’