পিঁপড়া বিজ্ঞানী পিঁপিঁপু পুরু লেন্সের চশমার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল, মেঘ মেঘ আকাশ, অনেক কালো মেঘ, বর্ষাকাল এসে গেছে বোধহয়। চিন্তার রেখা পিঁপিঁপুর চোখে মুখে, গত বছর এই বর্ষাকালে তার কলোনির অনেক পিঁপড়া মারা গেছে, এবার তাদের জন্য কিছু করতে হবে। মানুষ বিজ্ঞানের জগতে অনেকদূর এগিয়ে গেছে, তাহলে পিঁপড়া কেন পিছিয়ে থাকবে। পিঁপড়া চিকিত্সক পিঁপিঁলু পিঁপিঁপুর দিকে তাকিয়ে বলল—
সায়েন্টিস্ট কী ভাবছেন? জানতে পারি?
বর্ষাকাল তো এসে গেল।
সে চিন্তা তো আমারও, এবার কিছু করতে হবে। গত বছর অনেক পিঁপড়া পেটের রোগে মারা গেছে। বিশুদ্ধ খাবার জল ছিল না। মানুষের কারণে পৃথিবীতে জলবায়ুর অনেক পরিবর্তন ঘটছে, প্রকৃতির সঙ্গে অন্যায় করছে মানুষ প্রজাতি আর তার দায়ভার পৃথিবীর সকল জীবকুলকে নিতে হচ্ছে।
ঠিক বলেছেন ডাক্তার পিঁপিঁলু, মানুষ যা চায় তা প্রকৃতিবিরুদ্ধ। প্রকৃতি কেন সে অন্যায় মেনে নেবে, প্রকৃতি চাইলে সব পারে। এমনকি প্রকৃতি চাইলে মানুষ প্রজাতি পৃথিবী থেকে ধ্বংস হয়ে যাবে।
ঠিক বলেছেন সায়েন্টিস্ট পিঁপিঁপু, আমি চেম্বারে গেলাম অনেক রোগী আছে।
সামনে প্রচণ্ড বর্ষা আছে, এবার বন্যা হতে পারে, যেভাবেই হোক পিঁপড়াদের রক্ষা করতে হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে পিঁপিঁপু একটা আইডিয়া তৈরি করল, প্রচণ্ড বন্যার সময় কীভাবে পিঁপড়া কলোনিকে রক্ষা করা যায়। পিঁপিঁপু গবেষণাগারে রাত-দিন পরিশ্রম শুরু করল, পনেরো দিনের মাথায় একটা যন্ত্র আবিষ্কার করল সায়েন্টিস্ট পিঁপিঁপু, এই যন্ত্র জল থেকে অক্সিজেন তৈরি করবে। পিঁপিঁপু যন্ত্রটির নাম দিল ‘অক্সিপিঁ’ এই যন্ত্রই পিঁপড়াদের জীবন রক্ষা করবে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে অল্প অল্প, বাতাসের ঘ্রাণ শুঁকে পিঁপিঁপু হিসাব করল—আর এক সপ্তাহ পর ভারী বর্ষণ শুরু হবে। সব কর্মীপিঁপড়াদের ডাকা হলো, পিঁপড়া রাজা এলেন, তিনি এই কলোনির রাজা পিঁপিঁতু, তাঁর নির্দেশেই কাজ শুরু হলো। এক লক্ষ পিঁপড়া শুরু করল সুড়ঙ্গ খনন কাজ। সুড়ঙ্গের মাথায় থাকবে একটা বিশাল গুহা, সেখানে সকল পিঁপড়া আশ্রয় নেবে, আর সেখানে থাকবে একটা জলাধার, সেই জল থেকে ‘অক্সিপিঁ’ যন্ত্রটি গুহার প্রয়োজনীয় অক্সিজেন তৈরি করবে। জোনাকি পোকাদের সঙ্গে মিটিং হলো, তারাও সেখানে আশ্রয় নেবে এবং অন্ধকার গুহায় তারা আলো দেবে। দেখতে দেখতে বন্যা শুরু হয়ে গেল। সকল পিঁপড়া সারিবদ্ধভাবে গুহায় প্রবেশ করছে। সবার শেষে গুহায় প্রবেশ করল পিঁপিঁপু তারপর পিঁপিঁলু। গুহার ভেতর লক্ষ লক্ষ পিঁপড়া অবস্থান করছে, কেউ কেউ খাবার বিতরণ এবং সেবাকাজে ব্যস্ত। সায়েন্টিস্ট নিজেই ‘অক্সিপিঁ’ যন্ত্রটি দিয়ে অক্সিজেন উত্পাদন করতে শুরু করল, তাকে সাহায্য করছে দশ হাজার পিঁপড়া। পৃথিবী তার চিরচেনা রূপ বদলে এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। মাটির ওপরে প্রচণ্ড বন্যা শুরু হয়েছে, পাহাড়ি ঢল নামছে। পিঁপড়াদের ফুসফুস নেই, তবুও তারা অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। পিঁপিঁপু লক্ষ করল, গুহায় অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে আর কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। মহাবিপদ, পিঁপিঁপু বুদ্ধি করে আরো পাঁচটি যন্ত্র তৈরি করে রেখেছিল আপদকালীন সময়ের জন্য, সেগুলোও চালু করা হলো। সাংবাদিক পিঁপড়া পিঁপিঁসা খবর আনল, বন্যার পানি সব চলে গেছে, মানুষের ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে, এখন চাইলে আমরা মাটির ওপরে চলে আসতে পারি। সুড়ঙ্গের বন্ধ মুখ খোলা হলো, সব পিঁপড়া বাইরে এল, বুকভরে নিশ্বাস নিল এবং শুরু হলো কলোনির জন্য নতুন করে বাসা বাঁধার কাজ। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল খাদ্যের, সব খাদ্য প্রায় ফুরিয়ে গেছে, জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে, এখন কী হবে। দুই দিনের মধ্যে কর্মী পিঁপড়ারা কিছু খাদ্য কলোনির জন্য সংগ্রহ করল। পিঁপিঁপু বসে বসে ভাবছে, মানুষ নিজেই নিজের ক্ষতি করতে ব্যস্ত, প্রকৃতি সেই ক্ষতি মেনে নিতে নারাজ। মানুষ ফসলের মাঠে কেমিক্যাল ব্যবহার করছে কীট-পতঙ্গকে মারার জন্য, কিন্তু তারা কি জানে না—তারাও পৃথিবীর সন্তান এবং প্রকৃতির অংশ। অনেক পিঁপড়া প্রজাতি এই সকল কেমিক্যালের কারণে এই অঞ্চল থেকে ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষের অত্যাচারে পৃথিবীর কোনো প্রাণী নিরাপদ নয়। আফ্রিকার আমাজান জঙ্গল থেকে খবর এল সেখানকার পিঁপড়ারা মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, এবং তারা একধরনের বিষটোপ আবিষ্কার করেছে, যা পিঁপড়াদের লালায় থাকবে এবং কোনো মানুষ তাদের কিংবা প্রকৃতির ক্ষতি করতে এলে তারা কামড়ে সেটা মানুষের শরীরে দিয়ে দেবে। এই পিঁপড়াদের কামড় খেয়ে মানুষের আজীবনের জন্য প্যারালাইসিস হয়ে যাবে। আমাজান পিঁপড়া কলোনির সায়েন্টিস্ট পিঁপিঁড়িঁ পিঁপিঁপুকে ইমেইল করে সেই বিষটোপের ফর্মুলা পাঠাল। পিঁপিঁপু তার ল্যাপটপের সামনে বসে আছে এবং মানুষের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ কতটা যুক্তিসঙ্গত সেটাই ভাবছে। সব মানুষ তো খারাপ না, কিছু কিছু মানুষ ভালো আছে বলেই পৃথিবী এখনো টিকে আছে সকলের জন্য, ভালোমন্দ মিলিয়েই এই পৃথিবী।