আমার পুরো নাম মনিরুজ্জামান, ডাক নাম মনির। হায়াত্ মামুদ নামটা হয়েছে অনেক পরে। যখন লেখালেখি শুরু করলাম, খেয়াল করলাম, ওই সময়ে যাঁরা লিখছেন, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের নাম মনিরুজ্জামান। ১৯৬০ সালের কথা, এই নামে পত্রিকায় লেখা যাবে না। কাজেই বন্ধুরা মিলে ঠিক করলেন, আমার লেখালেখির জন্য অন্য কোন নাম নিতে হবে। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হুমায়ুন চৌধুরী আরো কয়েকজন ছিলেন। ওরা মিলে ঠিক করলেন, হায়াত্ মামুদ হবে মনিরের লেখক নাম।
আমার জন্ম ভারতের হুগলি জেলার মৌড়া গ্রামে। ১৭ আষাঢ় ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে, যা ইংরেজিতে দাঁড়ায় ১০ জুলাই ১৯৩৯ সাল। খুব ছোট্ট, মুসলিম অধ্যুষিত সেই মৌড়া গ্রামের লোকসংখ্যা ছিল খুবই কম। আশপাশে আর কোন মুসলিম গ্রাম ছিল না। মৌড়া গ্রামের পূর্ব পার্শ্বে ছিল জেলে পাড়া। নিচু শ্রেনীর হিন্দু প্রধান ছোট গ্রাম। উত্তর পাশের রাস্তা ধরে মাইল খানেক গেলে খেজুরদহ গ্রাম, আঞ্চলিক ভাষায় খাজুরদ্যে বলতাম। সেই খাজুরদহ গ্রামের বি-বকাউল্লাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের শুরু। তবে খাজুরদহ বি-বকাউল্লাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আমরা এমই স্কুল বলতাম। এমই মানে মিডল ইংলিশ। শুকনো মওশুমে আবাদী মাঠ মাড়িয়ে সোজা স্কুলে চলে যাওয়া যেত। বর্ষায় অবশ্য মাঠে পানির কারণে উত্তরের রাস্তা ঘুরে যেতে হতো। রাস্তার দুই পাশে ফসলের ক্ষেত। আর পথে দেলোয়ারা গ্রাম, খাজুরদ্যের মতো দেলোয়ারা গ্রামকে দেড়েল গ্রাম বলতাম আমরা। দেড়েল গ্রামের পশ্চিমে মাঠ পেরিয়ে অন্য একটি গ্রাম। আর দক্ষিণে শুধু ফসলের মাঠ। সেই সময়ে হুগলিতে ধান-পাট-শর্ষে সব কিছুর চাষই হতো। মৌড়া গ্রামের চারপাশে এই কয়েকটা গ্রামের সঙ্গে ছিল অবারিত ফসলের মাঠ।
আমার মা আমেনা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। তবে ঘর সংসার সামলাতেন আমার ফুফু সাবেরা খাতুন। বাল্যকালে বিবাহ হয়েছিল ফুফু সাবেরা খাতুনের, স্বামী মরে গেলে তিনি ভাইয়ের বাড়ি চলে আসেন, পরে আর বিয়ে-থা করেননি। ঘরের যাবতীয় কাজ সামলাতেন এই ফুফু। বলতে গেলে ফুফু ছিলেন ঘরের কর্ত্রী। ফুফুকে আমরা বেটি বলে ডাকতাম। আমার মা সব সময় নতুন বৌয়ের মতো শাড়ি পরতেন, চালচলনেও মনে হতো নতুন বৌ। আমার নানা বাড়ি গ্রামের এ মাথা আর আমাদের বাড়ি ও মাথা। সারা গ্রামে বসতি ৮-১০ ঘর। কাছাকাছি বাড়ি হওয়ার কারণে প্রতিদিনই বাপের বাড়ি যেতেন আমার মা আর খুব ঘটা করে বাপের বাড়ি যেতেন বছরে দু-একবার। নানাবাড়ি থেকে লোক আসত মাকে নাইওর নিতে। উত্সবের ্আমেজে এমনি একবার মহা-আয়োজন করে মা নতুন বৌয়ের মতো নানা বাড়ি যাচ্ছেন; আমি মায়ের হাত ধরে সঙ্গে যাচ্ছি, আমার জীবনের মজার স্মৃতিগুলোর একটি এটি। আমরা কিন্তু জোলা বংশ। চাচারা সবাই কাপড় বুননের কাজ করতেন। তবে বাবা শামসের আলী ব্যবসা করতেন। বাবা ইউনিয়ন বোর্ডের ভাইস-প্রেসিডেন্টও ছিলেন। সিমেন্টের রিং-পাইপের ব্যবসা করতেন তিনি, যা সেই সময় কুয়া বানানোর কাজে ব্যবহূত হতো। গ্রামের পাশে খালি মত জায়গায় সিমেন্টের পাইপ বানানোর কাজ চলত দিনমান। আমার চাচারা—গোলাম রহমান, আজিজ রহমান, সবাই এক বাড়িতে থাকতেন। এখন যেমন আমরা ভাইরা একসঙ্গে এক বাড়িতে থাকি। এই পাইপের ব্যবসা কিন্তু বাবা দেশ বিভাগের পর ঢাকায় এসেও করেছেন। এখন অবশ্য সেই রটোবার্ন অ্যান্ড কোম্পানি নামে স্যুয়ারেজ পাইপের ব্যবসাটি নেই। এক সময় আমার বাবার এই পাইপ কারখানাটি ছিলো বাংলাদেশের একমাত্র স্যুয়ারেজ লাইনের পাইপ কারখানা। শ্যামপুরের এই কারখানাটি আমার ভাই সিরাজ গত কয়েবছর আগেও দেখাশুনা করত। এখন এই ব্যবসাটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
ছোট বেলায় বেশ বজ্জাত ছিলাম। সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে যত রকমের বজ্জাতি করা যায় সবই করতাম। গ্রামের বেশ বিত্তবান পরিবার আমরা। বাড়িতে বৈঠকখানা ছিল, ছিল দহলিজ ঘর। গ্রামের স্কুলের শিক্ষক আমাদের বাড়িতে লজিং থাকতেন। সারা সপ্তাহ বাড়ির ছেলে-মেয়েদের পড়াতেন, আর ছুটির দিন তিনি বাড়ি চলে যেতেন। সকালে আমাদের আরবি আমপাড়া পড়াতেন আমার বড় মামা আব্দুল আজিজ। মাটির শ্লেট ও পেন্সিল নিয়ে নিয়ম করে পড়তে বসতোম চাচাতো ভাই-বোন ও আমি। সেই সময় বাটার এক ধরনের ‘নটি সু’ ছিল, নটি শো পড়ে স্কুলে যেতাম।
ছোট বেলায় আমি খুব মোটা ছিলাম। এমন মোটা ছিলাম যে, হাডুডু খেলেছি বলে মনে পরে না। বেশি মোটা হওয়ার কারণে খেলাধুলা আমার হতোই না। তবে গান খুব পছন্দ করতাম। সে সময় দেব সাহিত্য কুঠিরের বই দিয়ে পড়ার হাতে খড়ি। আমাদের বাড়িতে এক জামাই আসতেন, কার জামাই ছিল তা মনে নেই। নাম আব্দুস সোবহান, আমরা তাকে ছোবানি জামাই বলে ডাকতাম। ঠিক মনে নেই, তবে সম্ভবত নানা বাড়ির দিককার কোন আত্মীয় হবেন। ছোবানি জামাাই বাড়িতে এলে আনন্দের সীমা থাকত না। কারণ সেদিনকার মতো আর পড়ার পাঠ চুকে যেতো। সন্ধ্যায় ছোবানি জামাই হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন। যতটুকু মনে পরে শরীয়তি মারফতী গান ধরতেন তিনি। এসব একেবারেই ছোট বেলার কথা।
একটু বড় হয়েছি যখন, তখন থেকে সুযোগ পেলেই সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম। চলে যেতাম ‘দ্বারবাসিনী বাজারের হাটে’। আমাদের গ্রাম থেকে মাইল খানেক দুরে দ্বারসবাসিনী গ্রামে বসত সেই হাট। মনের সুখে ঘুরে বেরাতাম বাজারে, বেলা শেষ করে তার পর ঘরে ফিরতাম।
আমরা চাচাকে বেটা আর ফুফুকে বেটি বলতাম। আমাদের যতস্মৃতি রয়েছে, তার বেশিরভাগ ফুফু বা বেটিকে ঘিরে। বাবা শমসের আলীর সঙ্গে অনেক স্মৃতিই ভুলে গিয়েছিলাম, পরবর্তীতে বেটি সেগুলো মনে করিয়ে দিতেন। ফুফুর কাছে শুনেছি আমার দাদির বিয়ে হয়েছিল ১৫/১৬ বছর বয়সে। সেই সময় কলেরা, নিউমোনিয়া, টাইফয়েডসহ নানা রকমের মহামারির প্রাদুর্ভাব ছিল। বাবার জন্মের পর দাদা মারা যান। দাদী বাবাকে নিয়ে তাঁর বাপের বাড়ি চলে যান। বাবার ফুফু রওশন আরা একদিন গিয়ে বাবাকে চুরি করে নিয়ে আসেন। বাবার ফুফু ছিলেন একা। তার স্বামী মহামারীতে মারা গিয়েছিলেন। বাবাকে ফুফু নিজের ছেলের মত মানুষ করেন। পরে বাবার ফুফু আমার দাদি হয়ে গেলেন। সেই দাদিকে কিন্তু আমরা ভাই-বোনরা দাদা বলে ডাকতাম। বাবা ফুফুর কাছে বড় হয়েছেন, জগতের কি লীলা আমরা ভাই-বোনরাও তাই। আমাদেরও বাবা জন্ম দিয়েছেন আর মা পেটে ধরেছেন, আর বড় করে তুলেছেন আমাদের ফুফু সাবেরা খানম।
বাবাকে আমি বাবু বলতাম। ছোটবেলায় বাবু বাসায় থাকলে বাবুর সঙ্গেই খেতে বসতাম। তবে বাবু খুব কমই বাসায় থাকতেন। সে অর্থে মায়ের সঙ্গেই খেতে হতো আমাকে। আমাদের মৌরার সব ঘরের মেঝেগুলি ছিল মাটির। খালি পায়ে হাঁটাচলা করতাম আমরা। এখনকার মতো এমন ঘরে জুতা পড়ার প্রচলন ছিল না তখন। খাওয়ার ঘরের মাঝখানে পাটি বিছিয়ে তারপর ফুফু ভাত বেড়ে দিতেন। সপ্তাহে একবার বাজার বসত বাড়ির অদূরে। বাজার থেকে আমাদের তেমন কিছু কিনতে হতো না। বাড়িতে লাগানো সবজি আর পুকুরের মাছ সারা বছর খেয়েও উদ্বৃত্ত থাকত। বাড়ির পেছনে দুটা ও সামনে একটা পুকুর ছিল। প্রয়োজনীয় মাছ সেখান থেকেই আসত। বাড়ির পাশের জমি আর বাড়িতে যে সমস্ত সবজি জন্মাত তাতেই সবজির প্রয়োজন মিটে যেতো। তিন বেলা খাবারের সঙ্গে বিকালে নাস্তা খাওয়া হতো। বিকালের নাস্তায় থাকত দুধ দিয়ে মুড়ি। দুধ ভাতও খাওয়া হত কখনো কখনো। বাড়িতে একটা পাত কুয়া ছিল। সেখান থেকে পানি তুলে রান্না-বান্নার কাজ চলত। এছাড়া আম, জাম, নারকেল, কাঁঠালসহ প্রচুর ফলের গাছ ছিল। মহিষ, গরু ছিল মাথালে। গরুর দুধ খাওয়া হলেও মহিষের দুধ কী করা হতো মনে করতে পারছি না। সেই সময় খুব ম্যালেরিয়ার প্রকৌপ ছিল। প্রায়ই আমার ম্যালেরিয়া হতো। তখন একমাত্র খাবার বার্লি নতুবা সাগু। সঙ্গে কুইনাইন। এই দুইটা জিনিস এতো বেশি খেতে হয়েছে যে, যদি কেউ জানতে চায় আমার অপছন্দের জিনিসের কথা, তাহলে প্রথমেই এই দুটার নাম আসবে।
পাড়ার অন্য ছেলেদের গাছে চড়ে ফল খাওয়ার দৃশ্য খুব টানত। কিন্তু গাছে উঠে কোনদিনই ফল খাওয়া হয়নি আমার। গাছে উঠতে গেলে ফুফুর শাসনের চোখ ছুটে আসত। তাছাড়া অতিরিক্ত মোটা হওয়ার কারণেও গাছে চড়তে পাড়তাম না। বাড়ির বড় ছেলে বলেই হয়ত সবাই চোখে চোখে রাখত। পুরো বাড়ি চষে বেড়ানো বলে একটা কথা আছে, সেটা আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ছোটবেলায় বেশ খাদ্যপ্রিয় বা পেটুক ছিলাম। ছোটবেলায় খেলাধুলা করিনি বলেই হয়তো খেলাধুলা নিয়ে আমার তেমন কোন আগ্রহ কাজ করে না।
ওই সময় মৌড়া গ্রামের আমি ব্যতীত আর দুয়েকজন স্কুলে যেত। সেই সময়টায় মুসলমানদের ভেতর লেখাপড়ার তেমন প্রচলন ছিল না। দেখা গেল, এপাড়ার একজন তো দু’এক গ্রাম পর আরেকজন স্কুলে যাচ্ছে। প্রাইমারিতে আমার প্রিয় এক বন্ধু ছিল, নাম লুতু। ওর পুরো নাম লুত্ফর রহমান। ওর সঙ্গে আমার বেশ ভাব ছিল। আমাদের বন্ধুত্বটা এতই শক্ত ছিল যে, বর্ষায় ওদের বাড়ি থেকে স্কুলে আসা-যাওয়া অসুবধাি হতো বলে পুরো বর্ষা আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল করত। লুতুর বড় ভায়েরা সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করত, কাজেই লুতু অনেক কিছু জানত। বই পড়া আর শিল্পের অনুপ্রেরণাটা মনে হয় ওর কাছ থেকেই পেয়েছি। ওর কাছে আমি বিশেষভাবে ঋণী। জেনেছি লুতু আর এই ধরাধামে নেই, মারা গেছে।
যাতায়াতের জন্য সে-সময়ে গ্রামের সব বাড়িতে বাই-সাইকেল ছিল। অবস্থাপন্নদের ছইগাড়ি ছিল। ঘরের বৌ-ঝিদের কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে, খেতে কৃষাণ খাটা একজনকে দিয়ে ঘাটে পড়ে থাকা গাড়িতে ছই জুড়ে দিয়ে ছইগাড়ি ছুটত।
একবার বাবা ব্যবসার কাজে কোলকাতা যাবেন, বাবা বললেন, আমাকে নিয়ে যাবেন। জীবনে প্রথম নিজের গ্রামের বাইরে যাব। বিরাট উত্তেজনাকর অভিজ্ঞতা। খুব সকালে উঠে বাটা’র নটি সু পড়লাম, হাফপ্যান্ট ও বোধকরি হাফহাতা শার্ট পড়েছিলাম সেদিন। তখন বয়স ১০ কিংবা ১১ হবে, পড়ি পঞ্চম শ্রেণীতে। বাবা শার্ট-প্যান্ট পড়তেন, সেদিনও তাই পরেছিলেন। বেতের হাতলের ছাতি হাতে বাবা আগে আর আমি পেছনে। তখন দূরের পথে যাতায়াতের জন্য বাস ছিল না, রেলই একমাত্র ভরসা। গ্রামের রাস্তা পার হয়ে পৌঁছাই মেল্কি রেলস্টেশন। আমার দেখা প্রথম স্টেশন, লাল টিনের ছাউনি দেয়া। ত্রিবেণী আর তারকেশ্বর ছিল হিন্দুদের খুব পূজনীয় ও পবিত্র স্থান। এই দুই জায়গায় যাতায়াতের সুবিধার জন্য এলাকার জমিদারগণ মিলে এই রেললাইন প্রবর্তন করেছিলেন। যার নাম ছিল বিপিআর বা বেঙ্গল প্রবেনসিয়াল রেলওয়ে। লাল দেয়ালের স্টেশনে বসে থাকতে থাকতে অবশেষে ট্রেনে চেপে বসলাম। আমি জানালায় বসে দেখছি গ্রামের পর গ্রাম ছাড়িয়ে মাঠ, ঘাট, নদী ঘাট, ছবির মতো পিছে ফেলে যাচ্ছি পথ-ঘাট। কেমন স্বপ্নের মতো দৃশ্যগুলো ছেড়ে ছেড়ে যাচ্ছে। কয়েকবার কেটলি হাতে টি-বয়কে ঘুরতে দেখেছি। কেউ চা চাইলে মাটির কাপে করে কেটলি থেকে চা ঢেলে দিচ্ছে। চা পান শেষে ফেলে হচ্ছে কাপ বা পেয়ালা। আমরা খুব সকালে রওনা করে বেলা ১১ টায় কোলকাতা পৌছি।
প্রথম ঘর ছেড়ে দূরে, চিরচেনা প্রথম গ্রাম ছেড়ে দূরে এবং প্রথম কোলকাতা দর্শন। এটা শুধু কোলকাতায় পৌঁছানো না। সেটা ছিল শিকড় ভাঙ্গার কাহিনী। সেই মৌড়া থেকে কোলকাতা দিয়ে শুরু আমার ভ্রমণ চলছে। এই ভ্রমণ ভালবাসার, এই ভ্রমণে শিখেছি জগতে আমরা এসেছি ভালবাসা দিতে, ভালবাসা পেতে। আর কিছুই থাকবে না। শুধু ভালবাসাটা রয়ে যাবে।
অনুলিখিত