বুলাউয়ে শহরের অ্যাঞ্জেলিনা ও পলিটিক্যাল অ্যাক্ট

পাম গাছের বড়সড় শুকনা পাতার সাথে পেট্রোলের জারিক্যান দড়ি দিয়ে বেঁধে তা টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসছে অ্যাঞ্জেলিনা। আমি বাংলোর বারান্দায় বসে হারারে টাইমসে জিম্বাবুয়ের হালচাল বিষয়ক সংবাদ পড়তে পড়তে এগিয়ে আসা অ্যাঞ্জেলিনার দিকে তাকাই। তার পৃথুলা শরীরে ফুটে উঠছে জীবনের ঘানি টানার ক্লান্তি। কৃষ্ণাঙ্গ এ মেয়েটি সুশ্রী নয় মোটেই, তারপরও কোমর বাঁকা করে পামের পাতা টানার ফলে বাটিকের বস্ত্রে জড়ানো স্তনযুগলের দোদুল্যমানতায় যেন ছড়াচ্ছে যৌবনের আলগা দীপ্তি। আমি জিম্বাবুয়ের বুলাউয়ে শহর থেকে খানিক দূরে একটি ফার্মের যে বাংলোতে বাস করছি, তার পাশের একটি স্কুলে অ্যাঞ্জেলিনা শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করে। আমি এ এলাকায় টিচার্স ট্রেনিংয়ের কনসালটেন্ট হিসেবে একটি প্রশিক্ষণ পরিচালনা করার সময় তার সাথে পরিচয় হয়। স্কুলের অবস্থান বাংলোটির পাশে, তাই তার সাথে যোগাযোগ আজও বহাল আছে। হাফটাইমের বিরতিতে সে আমার বাংলোতে আসে, মোবাইল ফোন ব্যবহার করার উছিলায়।

তীব্র অর্থনৈতিক অধোগতির জন্য জিম্বাবুয়েতে বিদ্যুত্ ব্যবস্থা ও পানীয় জলের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। একবার বাংলোর বাথরুমে পানি নেই শুনতে পেয়ে সে পামের পাতায় জারিক্যান বেঁধে দূরের কোনো ওয়াটার হৌল থেকে নিয়ে এসেছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জল। ঘর্মাক্ত দেহে তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, এবং খুব লাজুকভাবে জানতে চেয়েছিল, আমার কাছে মাথা ধরার কোনো ওষুধ আছে কি না। আমি তাকে আইভি প্রোফেইন বলে একটি ট্যাবলেট দিয়েছিলাম। স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে সে আবার আমার বাংলোতে থামে। সে এবার নিয়ে এসেছে একটি সস্তা চীনা ট্রানজিস্টর। এ ট্রানজিস্টর চালাতে কোনো ব্যাটারি লাগে না। একটি হেন্ডেল ক্রমাগত ঘোরালে তাতে যে বিদ্যুতের জন্ম হয়, তা দিয়েই ট্রানজিস্টরটি চলে। আমরা ট্রানজিস্টর বাজিয়ে একটু ক্ষণ সোওনা সম্প্র্রদায়ের গান শুনি। তারপর সে ট্রানজিস্টর বিক্রি করতে চাইলে আমি বিব্রত হই। বছর দুয়েক আগে অর্থনীতি যখন খানিক ভালো ছিল, তখন তার বয়ফ্রেন্ড জন্মদিনে তাকে ট্রানজিস্টরটি উপহার দেয়। গেল মাস তিনেক হয় সে কোনো বেতন পাচ্ছে না। তার মায়ের হাঁপানির টান বেড়েছে মারাত্মকভাবে। ওষুধ কিনতেই হয়। আমি তাকে কিছু টাকা ধার দিই। আমাদের মধ্যে কথার হয় যে, আগামী মাস তিনেকের মধ্যে যদি টাকাটা কিস্তিতে শোধ দিতে না পারে, তা হলে সে আমাকে ট্রানজিস্টরটি দিয়ে দেবে।

তার মাঝেমধ্যে মাথা ধরার ধাত আছে। অসুখটি বোধ করি মাইগ্রেইন। মাথাব্যথা শুরু হলে সে কখনো বাংলোয় আসে আইভি প্রোফেইন জাতীয় ট্যাবলেটের সন্ধানে। এ সময় চোখে তার আলো সয় না একেবারেই। তাই সে সস্তা প্লাস্টিকের রোদচশমা পরে। চশমার কাঁচটি হলুদাভ, তার প্রতিসরণে কৃষ্ণাভ মুখে যেন আগুনের অপার্থিব আঁচ লাগে। তার শরীরে আর কোনো মারাত্মক রোগব্যাধি থাকাও অসম্ভব কিছু না। একবার মাথাব্যথায় সে সংজ্ঞা সম্পূর্ণ হরিয়ে ছিল। স্কুলের বাচ্চারা ট্যাবলেটের জন্য ছুটতে ছুটতে আমার বাংলোতে আসে। তাদের সঙ্গে আমি ফাস্টএইড বক্স নিয়ে স্কুলে যাই। হাতে চক-ডাস্টার মুঠো করে ধরে সে ফ্লোরে নেতিয়ে পড়ে ছিল। স্মেলিং সল্টে কাজ হয়। জল ছিটে দিতেই সে চোখ মেলে।

আমি যে মাঝেমধ্যে তাকে সহায়তা দিচ্ছি, তার প্রতিদান দিতে সে উদগ্রীব হলে, আমিই তাকে বুলাউয়ে শহরটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানোর অনুরোধ জানাই। কিন্তু সমস্যা বাঁধে আমার তত্ত্বাবধানে যে গাড়িটি আছে, তাতে পেট্রোল না থাকলে। অ্যাঞ্জেলিনা খোঁজখবর নিয়ে ব্ল্যাকে আজ আমার জন্য এক জারিক্যান ভর্তি পেট্রোল নিয়ে এসেছে। তাকে পাশের সিটে বসিয়ে আমি বুলাউয়ে শহরের দিকে ড্রাইভ করি। সে গাইড করে আমাকে প্রথমে নিয়ে আসে একটি ইন্ডিয়ান নেইবারহুডে। ভারতীয় অভিবাসীরা যে নেইবারহুডে বাস করছে, তার বাড়িগুলো ম্যানশনের মতোই বিশাল, পাঁচ-সাত একরের বাগানজুড়ে। অ্যাঞ্জেলিনা জানায় যে, জিম্ভাবুয়ে যখন রোডেশিয়া ছিল, তখন শ্বেতাঙ্গরা কেবলমাত্র এসব ভিলায় বাস করত। রবার্ট মুগাবের নেতৃত্বে অধুনা কৃষ্ণাঙ্গদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বিস্তৃত হয়েছে, প্রতিক্রিয়ায় শ্বেতাঙ্গরা ভারতীয় অভিবাসীদের কাছে অল্প মূল্যে বিষয়-আশয় বিক্রি করে বিলাত ফিরে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্ল্যাক মার্কেটের বাজার ভারতীয়রাই টিকিয়ে রেখেছে। অ্যাঞ্জেলিনার বড়ভাই মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসার সাথে গোপনে লিপ্ত আছে। তাকে মূলধন যোগাচ্ছে এক গুজরাটি অভিবাসী।

আমরা সবুজ গম্বুজওয়ালা একটি সুদর্শন মসজিদ ও তার লাগোয়া মকতব অতিক্রম করে চলে আসি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায়। এদিকে আসতে গিয়ে পাড়ি দিতে হয় রেলের লেভেল ক্রসিং। দেখি, আদ্যিকালের একটি স্টিম ইঞ্জিন কয়লার চালান নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধুঁকছে। পর পর অনেকগুলো কারখানার কপাট বন্ধ। একসময় আফ্রিকার দক্ষিণ অঞ্চলে শিল্প উত্পাদনের দিক থেকে জোহানেসবার্গের পরেই ছিল বুলাউয়ে শহরের স্থান। আজকাল এদিকে শতকরা পঁচানব্বই শতাংশ কলকারখানায় লকআউট চলছে। অ্যাঞ্জেলিনার বাবা ছিলেন ইস্পাত কারখানার মেকানিক। ট্রেড ইউনিয়নের দাবি আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত থাকার কারণে তিনি গেল তিন বছর হলো কারাগারে আছেন। জেলে খাবারদাবারের বড় অনটন, তার ওপর পুলিশি প্রহারে তার গতরে যে ঘা ও ক্ষত হয়েছে, তাও শুকাচ্ছে না।

আমরা কমার্শিয়াল এলাকায় এলে অ্যাঞ্জেলিনা মাংকিজ-পো বলে একটি এলিগেন্ট রেস্তোরাঁ দেখিয়ে মন্তব্য করে, জিম্বাবুয়ে যখন রোডেশিয়া ছিল, তখন এ রেস্তোরাঁয় কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গদের প্রবেশাধিকার ছিল। আমি গাড়ি পার্ক করে তাকে নিয়ে মাংকিজ-পোর লাউঞ্জে এসে বসি। কাপ-কেকের সাথে সাদামাটা লিপটন চা খেতে খেতে অ্যাঞ্জেলিনা বলে, ‘টু টেল ইউ দ্য ট্রুথ, আমি যখন বালিকা স্কুলের ছাত্রী, তখন আমার বয়ফ্রেন্ড গোল্ডমাইনে কাজ করে বেশ কিছু টাকা-পয়সা নিয়ে ফিরে এসেছিল। আমরা তখন বর্ণবাদী বিভাজনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। সে একদিন আমাকে লাঞ্চ করানোর জন্য এ রেস্তোরাঁয় নিয়ে আসে। ওয়েটাররা খাবার পরিবেশনের পরিবর্তে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ আমাদের থানায় নিয়ে যায়। তারপর আমার সাথে যে আচরণ করে—আই ডোন্ট নো হাউ টু টেল ইউ।’ অ্যাঞ্জেলিনা আঙুল দিয়ে কপালের শিরা টিপছে, তার না আবার মাইগ্রেনের অ্যাটাক হয়, এসব ভেবে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বলি, ‘লেটস নট টক অ্যাবাউট দিস এনি মোর।’ সে পার্স থেকে এক টুকরা কাগজ বের করে তাতে লিখে, ‘ইট ওয়াজ অ্যা পলিটিক্যাল অ্যাক্ট, সো আই মাস্ট টেল ইউ। না পুলিশ আমাকে রেপ করেনি, তারা হাতকড়া বাঁধা আমার বয়ফ্রেন্ডের সামনে আমাকে বিবস্ত্র করে পাছায় চাবুক মেরেছিল। দ্যাটস্ অল, আই ফেল্ট লাইক আই মাস্ট টেল ইউ দিস।’ আমি অপ্রিয় প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য জিজ্ঞেস করি, ‘এ বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে তোমার কি এখনো সম্পর্ক আছে?’ ‘ইয়েস, সে-ই তো আমাকে ট্রানজিস্টরটি উপহার দিয়েছিল। বাট, জিম্বাবুয়েতে ইকোনমিক সিচ্যুয়েশন খারাপ হতেই সে রাজনৈতিক কারণে বেকার হয়ে পড়ে। তারপর ব্লাডি কাওয়ার্ড পালিয়ে যায় সীমান্ত অতিক্রম করে সাউথ আফ্রিকায়। বাট, ইউ নো আই হ্যাভ মাই মাদার অ্যান্ড ইয়াংগার ব্রাদার্স। আমি তো তার মতো পালিয়ে যেতে পারি না!’ তার কাহিনি শুনে আমি কী বলব বুঝতে পারি না। বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকি। তারপর হঠাত্ করে খেয়াল হয়, পাশের চেয়ারটিতে বসে অ্যাঞ্জেলিনা কেমন যেন করছে, এলিয়ে পড়ছে তার শরীর। জানতে চাই, ‘হোয়াট ইজ হেপেনিং টু ইউ অ্যাঞ্জেলিনা? নট ফিলিং ওয়েল?’ কোনো জবাব পাই না। আশ্চর্য হয়ে দেখি, তার চোখ দুটি মুদে আসছে। শ্বাসপ্রশ্বাসও হয়ে উঠছে মারাত্মকভাবে দ্রুত। দেখতে দেখতে সংজ্ঞা হারিয়ে তার মাথা ঢলে পড়ে চেয়ারের হাতলের দিকে।

ভারসাম্য সম্পূর্ণ হারিয়ে যাতে পড়ে না যায়, এ জন্য আমি তাকে ধরে থাকি। ইশারায় ওয়েটার ঠাণ্ডা জলের বাটি নিয়ে ছুটে আসে। আমি বাম হাতে চোখেমুখে জলের ছিটা দিই। মৃদু খিঁচুনিতে কেঁপে ওঠে তার শরীর। আমি অতঃপর রুমাল ভিজিয়ে তার ঘর্মাক্ত কপাল মুছিয়ে দিতে দিতে ভাবি, আধেক চেনা কৃষ্ণাঙ্গ এ নারীকে প্রয়োজনে সেবা প্রদানও কী পলিটিক্যাল অ্যাক্ট নয়?