ইতিহাস জটিল বিষয়। তার নানা বাঁক, নানা মোড়। অনেক জানা বিষয়ের সঙ্গে অজানা বিষয় মিলে সে এক রহস্যের জগত্। সে রহস্যের গ্রন্থিমোচন আরো জটিল কাজ। তাই ইতিহাস জানাও সহজ নয়। যদি একাডেমিক ননফিকশনের মতো করে ইতিহাস উপস্থাপিত হয়, তাহলে তা সাধারণের জন্য দুষ্পাঠ্য। আবার গুণীজনেরা বলেন, ফিকশনে ইতিহাসকে ধরা যায় না। কিন্তু অনাদিকাল হতে সাহিত্যের মাঝেও ইইতহাস মূর্ত হয়ে থেকেছে। কখনো কবিতায়, কখনো গল্পে, কখনো উপন্যাসে। সেই ধারায় এক অনন্য সংযোজন আবদুন্ নূর লিখিত ‘বিচলিত সময়’।
উপন্যাসের পটভূমি মোগল আমল। তবে বৃহত্তর অর্থে ‘মোগল আমল’ নয়। কেননা উপন্যাসের গল্পের সময়কাল শাহ্জাহান পরবর্তী আওরঙ্গজেবের শাসনকাল এবং স্থান, বাংলা। অর্থাত্ মোগল আমলের একটা নির্দিষ্ট সময় এবং সেই সময়ের একটা স্থানকে কেন্দ্র করে লিখিত হয়েছে ‘বিচলিত সময়’ এবং এর পাত্র-পাত্রীও সেই সময়ের এবং সেই স্থানের।
সম্রাট শাহ্জাহানের পর তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেব সম্রাট হলে তিনি তাঁর পুত্র শাহজাদা আজমকে পাঠিয়েছিলেন বাংলার সুবাদার করে। সেই সুবাদারি স্থায়ী হয়েছিল প্রায় পনেরো মাসের মতো। আর তিনি অবস্থান করেছিলেন আমাদের এই ঢাকায়। চাচা শাহজাদা সুজার হাতে তৈরি ঢাকার নানা স্থাপত্য আর নিজের কিছু চিন্তা, কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আজমের দিনকাল। এরই মাঝে জুটে যায় অদ্ভুত এক বন্ধু। নাম তার জাফর। খেপা কবি সে।
বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস অনেক লিখিত হয়েছে। বঙ্কিম থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত লিখেছেন ইতিহাসের কোনো না কোনো সময়কে নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বড় ক্যানভাসে কাজ হয়েছে খুব কম। দুই খণ্ডে লিখিত ‘বিচলতি সময়’ সে অভাব অনেকটাই পূরণ করেছে। কাহিনিসর্বস্ব লেখার বাইরে চিন্তার খোরাক জোগানোর মতো যথেষ্ট উপাদানে সমৃদ্ধ বিচলিত সময়ে ইতিহাসের উপাদানও পাওয়া যায়।
উপন্যাস ইতিহাস হোক কিংবা সমসাময়িক গল্প, উপন্যাসের অন্যতম আবেদন তার গল্প, গল্পের বাঁক আর পাত্রপাত্রী। চরিত্র যদি দৃঢ় না হয় তবে গল্প ব্যর্থ হয়ে যায়। সেদিক দিয়ে জাফর এক অনন্য চরিত্র। তার মাঝে ফুটে উঠেছে একজন বাঙালির চরিত্র বৈশিষ্ট্য। ঢাকার ছেলে জাফর ভালোবাসে এই বাংলাকে। ভালোবাসে এখনকার মানুষকে। আবার কখনো সে প্রতিবাদী, কখনো বিদ্রোহী। তার কবিতায় ফুটে ওঠে তার মানুষের কথা। কখনো ধর্মের কথা। অথচ সে প্রেমিক। সে সৌন্দর্যের পূজারী।
শাহজাদা আজম একজন নিরেট খাঁটি মানুষ হিসেবে উপন্যাসে চিত্রিত। যদিও কোনো মানুষই নিরেট খাঁটি হতে পারে না। মোগল রক্তে অন্যায়-অত্যাচারের বীজ প্রোথিত। কিন্তু উপন্যাসে আজম একজন দরদি, যুক্তিশীল মানুষ। কিন্তু দিল্লির শিক্ষা আর প্রভাবে কিছু নির্দিষ্ট চিন্তাভাবনায় আবদ্ধ সে। যেমনটা হয়েছে বহিরাগত সকল শাসকের ক্ষেত্রে। আজমের সঙ্গে জাফরের বন্ধুত্বের পরে আজমের ভুল ধারণা ভাঙতে শুরু করে।
মূলত লেখক আবদুন্ নূর আজম এবং জাফরের মাধ্যমে আমাদের দেখিয়েছেন শাসকের সঙ্গে বুদ্ধিজীবীর আদর্শ সম্পর্ক কী হওয়া উচিত। মূলত জাফরের মাঝে একাধারে আমাদের ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা থেকে সত্যিকার বুদ্ধিজীবীর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। মোগল আমলকে কাহিনিতে রেখে লেখক আমাদের দেখাতে চেযেছেন—সকল সময়েই শাসককে পথ দেখানোর জন্য কিছু মানুষের থাকা উচিত।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবন নদীর উজানে’ বইয়ে লিখেছেন ‘বিচলিত সময়’-এর কথা। তাঁর ভাষায়, এই উপন্যাস আমাদের ঢাকা শহরের আখ্যান। আসলেও তা-ই। আবদুন্ নূর তাঁর লেখনীর মধ্যদিয়ে আমাদের নিয়ে গেছেন সতেরো শতকের ঢাকায়। যেখানে ছোট কাটরা, বড় কাটরা তাদের জৌলুশে দণ্ডায়মান। আর পিতার সম্মানে আজম নির্মাণ করছেন কেল্লা আওরঙ্গাবাদ। সে সময়ে আজকের শাহবাগে বাঘ বের হতো। তেজগাঁও ছিল তেজগঞ্জ। বুড়িগঙ্গায় দেশি-বিদেশি জাহাজের সমারোহ।
সে সময়কার হিন্দু সমাজ এবং তাদের রীতিনীতি ফুটে ওঠে রশমীর গল্পে। সেবাদাসী থেকে একাকী এক প্রেমিকা হয়ে যাওয়া নারীর গল্প রশমীর। সে ভালোবাসে জাফরকে, কিন্তু জাফর কিংবা রশমী পরস্পর থেকে বহুদূরে। উপন্যাসে প্রেম থাকতে হয় কেননা প্রেম ছাড়া তো মানুষের জীবন হয় না। সে প্রেমের আরেক নায়িকা নাঙছেন গাভারু। অহম রাজকন্যা। মীর জুমলা অহম দখল করে নিয়ে এসেছিলেন রাজকন্যাকে। আওরঙ্গজেব তাকে করেছিলেন পুত্রবধূ। এ গল্প নাঙছেনের সংগ্রামের গল্প। পিতৃভূমি অহম ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় আর শাহজাদার প্রেমে নিজেকে সঁপে দেওয়া নাঙছেন ইতিহাসে বিস্মৃত। লেখক আবদুন্ নূর বড় মমতার সঙ্গে তাকে এনেছেন মানুষের সামনে।
‘বিচলিত সময়’ আসলে ঢাকার বিবর্তনের গল্প। মোগল আমলে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া ঢাকা। সেইসঙ্গে বিশাল সাম্রাজ্যের ব্যয়ভারের জন্য বারবার নিংড়ে নেওয়া বাংলার গল্প। ‘বিচলিত সময়’ ইতািহসের কিছু তেতো দিক তুলে এনেছে। জাফরের মুখে আমরা বাংলাকে শোষণের খতিয়ান পাই। সবসময়েই শোষিত বাংলা। এমনকি যে শায়েস্তা খাঁ এত জনপ্রিয়, জাফরের মুখে তাঁর দুর্নীতির হদিস দিয়েছেন আবদুন্ নূর। মূলত ‘বিচলিত সময়’ আমাদের বাঙালিদের গল্প। কেননা জাফর আসলে আবহমান সচেতন বাঙালির প্রতিচ্ছবি—যে বাংলাকে ভালোবাসে। তাই উপন্যাসে আমরা দেখি ভাষার প্রতি তার প্রেম। দেশের প্রতি তার প্রেম।
বাংলার ওপরে শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে বহুবার। কখনো পাঠান, কখনো মোগল, কখনো ব্রিটিশ। উপকূল লুটেছে পর্তুগিজরা। উপন্যাসে আন্তোনিয় তাদের প্রতিভূ। ভাষার নামে, ধর্মের নামে মানুষকে বারবার বিভক্ত করেছে এরা নিজেদের স্বার্থে। সেই বিভেদ থেকে উত্তরণের পথ বলে ‘বিচলিত সময়’। ইমাম শামসুদ্দিনের মতো গোড়া ধার্মিকের মন পরিবর্তন হয়ে মানুষের জন্য যখন মন কাঁদে তার, তখন পাঠক বুঝতে পারে ‘বিচলিত সময়’ লেখার উদ্দেশ্য কেবল ঐতিহাসিক পটভূমিতে গল্প বলা নয়, বরং আরো মহত্ উদ্দেশ্য সাধন করে এই উপন্যাস।
বাংলা সাহিত্য, বিশেষত বাংলাদেশের সাহিত্যে সত্যিকার মহত্ কাজ খুঁজে পাওয়া ধীরেধীরে দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে ঢাকার বিবর্তন কিংবা বাংলার ক্রমবিকাশ নিয়ে লেখাও কম। শাহজাদা আজমের পনেরো মাসের সুবাদারির গল্পে এতখানি উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মাঝেই যতখানি সম্ভব, তুলে ধরেছেন আবদুন্ নূর। তুলে এনেছেন বাংলা ও বাঙালির কথা।
‘বিচলিত সময়’ তাই নির্দিষ্ট কোনো সময়ের গল্প না, এ গল্প বাঙালির গল্প।