গ্রামের অনেক গৃহস্থ তাদের একটি দুগ্ধবতী গাভির দুধ বিক্রির অর্থ দিয়ে সংসারের পুরো খরচ চালান। ঠিক রাত ৩টায় সেই গাভিটার অসুখ করলো কিংবা একই সময়ে শহরের কোনো এক পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাওয়া পোষা বিড়ালটির গলায় মাছের কাঁটা বিধলো! এখন এদের চিকিৎসাসেবা দিবে কে? রাত ৩টায় কি ভেটেরিনারি ডাক্তার সাহেবকে পাওয়া যাবে?
যেখানে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে তাকে পাওয়া যায় না। আর এই না পাওয়াই তো স্বাভাবিক, কারণ কর্তৃপক্ষ এখনো ভেটেরিনারি সেবাকে জরুরি সেবা মনে করেনি। জরুরি সেবা/পরিষেবা হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যা স্বাস্থ্য, জীবন, সম্পত্তি বা পরিবেশের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি সৃষ্টি সৃষ্টি করে। জরুরি সেবা হলে সপ্তাহের প্রতিটা দিন ও ঘণ্টা ভেটেরিনারি হাসপাতালগুলো চালু থাকত। তখন একজন খামারি বা অ্যানিম্যাল লাভার ৯-৫টার পরও, সপ্তাহের প্রতিটি দিন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি ডাক্তারের সেবা পেত। তাকে আর কোয়াকের (হাতুড়ে ডাক্তার) শরণাপন্ন হওয়া লাগত না।
আজ সারা বিশ্ব যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সমস্যায় ভুগছে তার পেছনে এই কোয়াকদের অপচিকিৎসায় যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অনেকাংশেই দায়ী। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশের স্বাস্থ্য রক্ষায় জাতিসংঘ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’কে গ্লোবাল থ্রেট হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিগত তিন দশকে ইমার্জিং ভাইরাসঘটিত রোগের ৭৫ শতাংশই প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ত্রাস সৃষ্টি করা কোভিড-১৯ যার বড় প্রমাণ। মহামারিটি বাদুড় থেকে মানুষে ছড়িয়েছিল। যদি প্রাণীতে রোগের প্রাদুর্ভাব সময়মতো শনাক্ত করা সম্ভব হয় তাহলে মানুষে মহামারির বিস্তার প্রতিরোধ সহজ হবে। তবে ভেটেরিনারি সেবা অত্যাধুনিক ও সুসজ্জিত না হলে প্রাথমিক অবস্থায় এদের শনাক্তকরণ সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা আইন ২০২৩, অনুসারে মোট ১৮ ধরনের সেবা জরুরি পরিষেবার আওতাভুক্ত। উক্ত আইনের ২.১ (ড) ধারা মোতাবেক হাসপাতাল, ক্লিনিক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠান ও ডিসপেনসারি সম্পর্কিত পরিষেবা, ২.১ (ঢ) ধারায় ঔষধ উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন, ক্রয়, বিক্রয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং ২.১ (ট) ধারায় খাদ্যদ্রব্য ক্রয়, বিক্রয়, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, মজুত, সরবরাহ বা বিতরণের কাজে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে জরুরি পরিষেবার আওতাভুক্ত করা হয়েছে; কিন্তু ভেটেরিনারি সেবাকে (প্রাণীর চিকিৎসা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিকার), প্রাণিসম্পদ পণ্য (দুধ, ডিম, মাংস) এবং পশুখাদ্য ও ঔষধ পরিবহন সেবাসংশ্লিষ্ট খাতকে জরুরি পরিষেবার আওতাভুক্ত করা হয়নি। ভেটেরিনারি সর্বজনবিদিত ও বিশ্বের প্রাচীনতম একটি পেশা।
বিশ্বের অনেক দেশে ভেটেরিনারি সেবা জরুরি সেবার অন্তর্ভুক্ত। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ভেটেরিনারি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ভেটেরিনারি সার্ভিসকে জরুরি সেবা বলে বিবৃতি দিয়েছে। নেপাল সুপ্রিম কোর্ট ভেটেরিনারি সেবাকে জরুরি পরিষেবার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সে দেশের সরকারকে নির্দেশনা দিয়েছে।
এছাড়া বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী সংস্থা-বিশ্ব ব্যাংক, জাতিসংঘ, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH) এবং ইউনিসেফ প্রাণিস্বাস্থ্য ও মানবস্বাস্থ্যকে ‘ওয়াল হেলথ বা একক স্বাস্থ্য’ এবং ভেটেরিনারি সেবাকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করছে।
তাই বাংলাদেশে মানুষের স্বাস্থ্য খাতের অনুরূপ ভেটেরিনারি সেবা ও প্রাণিসম্পদ পণ্যসমূহকে অত্যাবশ্যক পরিষেবা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তাহলে প্রাণিসম্পদ খাত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিরাপদ প্রাণীজ আমিষ সরবরাহ, আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও মেধাবী জাতি গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে এবং অপার সম্ভাবনাময় প্রাণিসম্পদ পণ্য রপ্তানিমুখী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করবে।
লেখক: তরুণ গবেষক