দীর্ঘ সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও খোদ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির তথ্য উঠে আসছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন সময়ে সিন্ডিকেট, ডলারের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহে ঘাটতি, আর কারসাজির কথা গণমাধ্যমে উঠে আসছে প্রায়শই। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বা মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ নিয়ে সাধারণ মানুষ রয়েছে ধোঁয়াশায়।
সম্প্রতি বাজারে সবজির দাম কমে আসলেও ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধি ভোক্তাদের চিন্তিত করে তুলছে। কারণ বিশ্ববাজারে যখন ভোজ্য তেলের দাম কমে আসছে দেশের বাজারে এর দাম বৃদ্ধি কারসাজির দিকেই আঙুল তুলছে। যখন কোনো পণ্যের সরবরাহ কমে যায়, তখন ভোক্তারা সেটি পাওয়ার জন্য বেশি মূল্য দিতে বাধ্য হয়, ফলে বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায়।
অর্থনীতিবিদরা একে 'সাপ্লাই শক' বা সরবরাহজনিত ধাক্কা বলে থাকেন। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্য ও জ্বালানির রপ্তানি বাধ্যগ্রস্ত হয়, যার ফলে বিশ্ববাজারে এই পণ্যগুলোর সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব আমাদের দেশেও লেগেছে।
মূল্যস্ফীতির অভ্যন্তরীণ কারণের পাশাপাশি বহিস্থ কারণও রয়েছে। এর একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধিজনিত এবং একটি অংশ ডলারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত। এই মূল্যস্ফীতি আরো উসকে দিয়েছে দেশে টাকার জোগান বৃদ্ধি করার মাধ্যমে। সাধারণত উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশ সুদের হার বাড়িয়ে থাকে। যাতে করে মুদ্রা সরবরাহ হ্রাস পায়। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে রক্ষার জন্য সরকার টাকা ছাপিয়ে প্রতিনিয়ত সহায়তা দিয়েছে। সরকারের ঘাটতি মেটাতে ব্যাপক হারে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে টাকা ধার করেছে। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কতটা পড়েছে সেটি বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বিশ্লেষকদের মতে উচ্চ দাম থাকার পরেও মূল্যস্ফীতি কম হতে পারে বা শূন্যও হতে পারে। যেমন গতবছর ১০০ টাকা দিয়ে কোনো পণ্য কিনে একই পণ্য যদি এ বছরও ১০০ টাকায় কিনতে হয় সেক্ষেত্র পণ্যের দাম যা-ই হোক না কেন মূল্যস্ফীতি বা মূল্যবৃদ্ধির হার শূন্য। বাংলাদেশে গত দুই বছর ধরে দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতির মানে হচ্ছে উচ্চ দামের জিনিস আরো বেশি খরচ করে কিনতে হচ্ছে। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরের চলন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তার আগের বছরে, অর্থাৎ ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৪৮। বিবিএসের তথ্যে আরো দেখা গেছে, শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষ মূল্যস্ফীতির কারণে বেশি ভুগছে। কোভিড মহামারি থেকে বিশ্ব বেরিয়ে এলেও অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।
মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক চিত্র হলেও বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতিকে অর্থনীতির জন্য অভিঘাত হিসেবে দেখা হয়। মুদ্রাস্ফীতি বলতে বোঝায় পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাওয়াকে। যা সাধারণত ঘটে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের কারণে। সহজ ভাষায় বললে, একটি দেশের বাজারে পণ্যের মজুত এবং মুদ্রার পরিমাণের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হয়। যদি পণ্যের তুলনায় মুদ্রার সরবরাহ অনেক বেড়ে যায় অর্থাৎ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত মাত্রায় টাকা ছাপায় তখনই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। এর ফলে একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আপনাকে আগের চাইতে বেশি মুদ্রা খরচ করতে হবে। এর মানে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে।
সব মিলিয়ে ঐ মুদ্রার মান বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। তবে মুদ্রার সরবরাহও এখানে একটি বড় বিষয়। মুদ্রার সরবরাহ নির্ধারণে বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তবে সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে, এম-টু বা বিস্তৃত অর্থ। এ পদ্ধতিতে ক্যাশ এবং ডিপোজিটকে এক করে ধরা হয়। ২০২০ সালের জুন মাসে বিস্তৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ১৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন টাকা। ২০২৩ সালের জুন মাসে এটি গিয়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন টাকায়। অর্থাৎ তিন বছরে মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন টাকা। এ অর্থ দিয়ে ১৬টি পদ্মা ব্রিজ বানানো যায়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মুদ্রাস্ফীতি যদি ঐ দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম থাকে তাহলে সেটার তেমন নেতিবাচক প্রভাব থাকে না। সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি থাকলে সেটাকে সহনীয় বলা যায়। ৭ থেকে ১০ শতাংশ হলে মধ্য ও নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়ে যাবে। এবং এর চাইতে বেশি মুদ্রাস্ফীতি পুরো দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে এটা নির্ভর করছে সেই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর। তবে হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়লেই সেটাকে মুদ্রাস্ফীতি বলা যাবে না। যদি সামগ্রিকভাবে পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ে তাহলেই বুঝতে হবে মুদ্রাস্ফীতির কারণে এমন হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির প্রধান কারণ হলো মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যাওয়া। এছাড়া আরো কিছু কারণ রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যুদ্ধের কারণে পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয় ফলে সংকট দেখা দেয়, যার প্রভাব দামে গিয়ে পড়ে। এছাড়া যুদ্ধে লিপ্ত রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধে বিনিয়োগের জন্য প্রচুর অর্থ ছাপিয়ে থাকে, সেটাও মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়।
বাজারে যদি কোনো পণ্য ও সেবার চাহিদা বেড়ে যায় এবং সে অনুযায়ী সরবরাহ না থাকে, তখন দাম বেড়ে যায়। আবার কোনো জিনিস তৈরি করতে যে সামগ্রী লাগে তার দাম বাড়লেও মূল পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আবার যদি একটি দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে পণ্য ও সেবা সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকলেও দামে এর প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবলভাবে নির্ভরশীল জ্বালানি তেলের ওপর। কারণ যে কোনো পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় পেট্রোল বা ডিজেলে চালিত যানবাহনের মাধ্যমে। ফলে এই তেলের দামের প্রভাব সব পণ্যের ওপরেই কমবেশি পড়ে। যেমন ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর দিকে একটা বড় প্রভাব পড়েছিল জ্বালানি তেলের ওপর। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়াও মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম কারণ। অর্থাৎ বেশি দরে ডলার কিনতে হলে বেশি মুদ্রার জোগন নিতে হবে। আর সরকার যদি বিভিন্ন কারণে বেশি করে মুদ্রা ছাপাতে শুরু করে, এতে বাজারে মুদ্রার আধিক্য দেখা যায় অথচ জিনিসপত্রের জোগান না বাড়ায় পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়।
একটি দেশের সরকার সাধারণত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে খরচ করার জন্য বৈদেশিক ঋণ নিয়ে থাকে এবং সেই মুদ্রা যখন দেশের বাজারে আসে অথচ অন্যদিকে পণ্যের সরবরাহ আগের মতোই থাকে। তখন সেটার প্রভাবেও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়ে দিলে, মানুষ প্রচুর ঋণ নিতে শুরু করে। এতে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়। এতে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। এজন্য কোভিডের প্রভাব এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ঠেকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় সব বড় অর্থনীতির দেশ তাদের সুদ হার বাড়িয়ে এটা নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়।
সরকার বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভর্তুকি দিলে কিংবা সরকার খরচ বাড়ালে সেই টাকা জনগণের পকেটে আসে। এর প্রভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে। মজুরি বা বেতন বৃদ্ধিও মুদ্রাস্ফীতির বড় কারণ হতে পারে। সাধারণত মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ চলে এলে তাদের পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ে। মুদ্রাস্ফীতির প্রধান কারণই হলো-অর্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। উল্লেখ্য, বিগত সরকার ইচ্ছে করেই ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে রেখেছিল। এর কারণে কোম্পানি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যায়। এর ফলে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত ছিল। মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানো উচিত বলে তখন অনেক অর্থনীতিবিদ মত দিয়েছিলেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে বিরূপ প্রভাব পড়ে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। তবে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি লাঘবে তৎপর হলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে তারা মনে করছেন। মুদ্রাস্ফীতির ফলে মুদ্রার মূল্য কমে যায়। স্থানীয় মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ায় অন্য দেশ থেকে আমদানি কমে যায় বা খরচ বেড়ে যায়। কারণ ঐ একই জিনিস কিনতে আগের চাইতে বেশি খরচ করতে হয়। এতে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বাজারে মুদ্রাস্ফীতি অব্যাহত থাকার পেছেনে অনেক সময় ব্যবসায়ীদের কারসাজিকেও দায়ী করা হয়। বলা হয়ে থাকে, অসাধু ব্যবসায়ীরা উৎপাদন না বাড়িয়ে পণ্য মজুত করে রাখে।
অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের জন্যই তারা বাজারে এমন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। তবে আমাদের দেশের বেশকিছু পণ্য আমদানি করতে হয় এবং সেগুলো করে কিছুসংখ্যক আমদানিকারক। এসব ক্ষেত্রে কিছু কৃত্রিম সংকট তৈরি করা যায়। কিন্তু দেশে উৎপাদিত পণ্য যেমন-চাল, আলু, পেঁয়াজ, মাছ, গরুর মাংস, মুরগি এবং ডিমের মতো পণ্যগুলো কয়েক লাখ কৃষক উৎপাদন করে থাকেন। অর্থনীতির ভাষায় যে বাজারে লাখো বিক্রেতা থাকে সেটা একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার। একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সাধারণত চাহিদা বাড়লে অথবা সরবরাহ কমে গেলে পণ্যের দাম বাড়ে। এটাও সত্যি যে, একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা দুরূহ। কারণ লাখ লাখ কৃষককে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। এক্ষেত্রে ভালো উপায় হতে পারে সরকার যদি অর্থনীতিবিদদের দিয়ে বাজারের প্রকৃত অবস্থা খতিয়ে দেখা। তবে, মুদ্রাস্ফীতি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও কোনো দেশের জন্যই অতিরিক্ত ও দীর্ঘ মেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি ভালো ফল বয়ে আনেনি।
লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক