শারীরিকভাবে খুব একটা সুস্থ ছিলেন না আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনা। সবে মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে অস্ত্রোপচার করিয়ে ফিরেছিলেন বুয়েনস আইরেসে নিজ বাসায়। তবে সেখানে খুব একা ছিলেন তিনি, তাকে দেখভাল করার কয়েকটা লোক ছাড়া কাছের আর কেউ ছিলেন না। আর তার চিকিৎসকেরা স্বাস্থ্যজনিত বিষয়গুলো দেখতেন নিয়মিত। এর মধ্যেই ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর হঠাৎ না ফেরার দেশে পারি জমান ম্যারাডোনা । তার মৃত্যুর খবর নাড়িয়ে তোলে গোটা ফুটবল বিশ্বকে, ছেয়ে যায় শোকে।
সেসময় তার মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে। স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি চিকিৎসকদের অবহেলা-এসব নিয়েই চলতে থাকে আলোচনা। এছাড়া ম্যারাডোনার এই মৃত্যুকে স্বাভাবিক মানতে চাননি তার দুই কন্যাও। তারাই সঠিক কারণ জানতে মামালা করেন। যা দীর্ঘ চার বছর ঝুলে থাকার পর শুরু হয়েছে বিচার প্রক্রিয়া। যেখানে গেল মঙ্গলবার আদালতে প্রথম দিনের শুনানিতেই ম্যারাডোনার মৃত্যুশয্যায়ী এক মর্মান্তিক ছবি প্রকাশ্যে অনেন এক প্রসিকিউটর। খবর বুয়েনস আইরেস টাইমস।
ম্যারাডোনাকে দেখভাল করা আট চিকিৎসকের মধ্যে সাত জনের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তার মধ্যে রয়েছেন এক নিউরো বিশেসার্জন, এক মনোরোগ ষজ্ঞ, এক মনোবিজ্ঞানী, এক মেডিক্যাল কো-অর্ডিনেটর, এক নার্সিং কো-অর্ডিনেটর, এক চিকিৎসক এবং এক নাইট নার্স। তাদের নিয়েই গেল পরশু থেকে সান ইসিদ্রো আদালতে শুরু হয়েছে বিচার প্রক্রিয়া। যেখানে প্রথম দিনের শুনানিতে আদালতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, 'প্রসিকিউটর প্যাট্রিসিও ফেরারি বিচারকদের সামনে ম্যারাডোনার মৃত্যুর পরের একটি ছবি তুলে ধরে বলেন, 'এভাবেই তার মৃত্যু হয়েছিল।' ছবিটিতে দেখা যায়, বিছানায় শুয়ে থাকা ম্যারাডোনার পেট অস্বাভাবিকভাবে ফোলা, যা প্রসিকিউশনের অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফেরারি বলেন, 'এই ছবিটি তার প্রতি চিকিৎসার চরম অবহেলার প্রমাণ। যারা বলছে, তারা বুঝতে পারেনি তার ঐ সময় কী অবস্থা ছিল, তারা বিচারকদের সামনে মিথ্যা বলছে, আইনকে বৃদ্ধআঙুল দেখাচ্ছেন।'
ছবি প্রকাশের পরপরই আদালতে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অন্যদিকে, মামলার আসামিরা চুপচাপ বসে ছিলেন, তাদের মুখে ছিল টানটান উদ্বেগের ছাপ। এসময় প্যাট্রিস আরও বলেন, 'আজ প্রয়াত দিয়াগো আরমান্দো ম্যারাডোনা, তার সন্তান, তার আত্মীয়স্বজন, তার কাছের মানুষজন এবং আর্জেন্টিনার জনগণ ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে।'
এদিকে ফার্নান্দো বারলান্দো, যিনি ম্যারাডোনার পরিবারের আইনজীবী। তিনি কোনো রাখঢাক না রেখে স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে ম্যারাডোনাকে 'হত্যা' করার অভিযোগ এনেছেন। গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বারলান্দো স্পষ্টভাবে বলেন, 'তাকে হত্যা করা হয়েছে। আর এই কাজের জন্য, এখনো ছায়ায় লুকিয়ে থাকা কেউ, একদল স্বস্থ্যকর্মীকে নিঃশব্দ নিষ্ঠুর উপায়ে তাকে হত্যার জন্য ডেকেছিল। এখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে, একটি অন্ধকার দিক আছে, যা এখনো তদন্তে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, কিছু লোক ছিল যারা দিয়াগোর মৃত্যুর মাধ্যমে লাভবান হতে চেয়েছিল।'
আদালতে শুনানির সময় উপস্থিত ছিলেন ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী এই তারকার পরিবারের সদস্যরা। বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন প্রচুর ফুটবল অনুরাগী, যারা ম্যারাডোনার মৃত্যু বা খুনের বিচার চেয়ে আদালতের সামনে অপেক্ষা করছিলেন পোস্টার হাতে। ম্যারাডোনার ছেলে দিয়েগো ফার্নান্দো একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে ফুটবল তারকার মুখ আঁকা টি-শার্টে লেখা রয়েছে 'ন্যায়বিচার চাই'। এই বিচারপর্ব চার মাস পর্যন্ত চলতে পারে, প্রতি সপ্তাহে তিনটি করে শুনানি হবে বলে জানা যাচ্ছে। বিচারে ১০০ জনেরও বেশি সক্ষী সাক্ষ্য দেবেন। সম্ভাব্য অভিপ্রায়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের আট থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
এর আগে ২০২১ সালে প্রসিকিউটররা একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল যে, ম্যারাডোনার মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো, যদি তার চিকিৎসকদের 'অবহেলা' না থাকত। তার পর থেকেই চিকিৎসকদের প্রতি হত্যার অভিযোগ আরও গুরুত্বর ভাবে উঠতে থাকে।