নদনদীকে আর 'হত্যা' করা যাইবে না 

২০২০ সালে সায়েন্স রিভিউজ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা সকলকে চমকাইয়া দিয়াছিল! একদল গবেষক দাবি করিয়া বসেন, ভারতের রাজস্থানের মরুভূমি অঞ্চলের চরিত্র একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। থর মরুভূমির বুক চিরিয়া একসময় নদী বহিয়া যাইত। শুধু তাহাই নহে, থর মরুভূমির নিচে শত-সহস্র বৎসরের লুপ্ত নদীপথ ধরিয়া অতীতে একাধিক প্রজাতির পরিযোজন ঘটিয়াছিল। গবেষক দলের দাবি অনুযায়ী, এই নদীপথ ধরিয়াই আগমন ঘটে আদিম মানবগোষ্ঠীর। স্রোতস্বিনী এই নদী ব্যবহার করিয়া তাহারা ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করিয়া এই অঞ্চলে সভ্যতার প্রভূত ক্রমবিকাশও সাধন করিয়াছিল। জানা যায়, রাজস্থানের সেই আদিম নদীখাত হইতে বর্তমান নিকটবর্তী নদীটির দূরত্ব ২০০ কিলোমিটারেরও অধিক। গবেষকরা জানাইয়াছেন, নদীখাত সরিয়া যাওয়ার ফলেই মূলত এহেন প্রাকৃতিক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। 'প্রকৃতির দান' নদনদীর গতিমুখের এইরূপ পরিবর্তন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নহে; যেমন, ভূমিকম্পে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের গতিপথের পরিবর্তন। এই ধরনের হাজারো উদাহরণ রহিয়াছে। প্রশ্ন হইল, নদী কি কেবল প্রকৃতির নিয়মেই গতিপথ পালটায়; নদনদীগুলি কি কেবল আপন খেয়ালেই চলে; ইহাতে মানুষের দায় কতটা? 

সম্প্রতি দেশের রংপুর অঞ্চলে 'আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন' লক্ষ করা যাইতেছে। গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, উজানে নদনদীগুলিতে ভারতের বাঁধ নির্মাণ, কম বৃষ্টিপাতে নাব্য হ্রাস এবং দখল-দূষণের কারণে বিরূপ প্রভাব পড়িতেছে রংপুর অঞ্চলের নদনদীতে। নদনদীগুলির স্বাভাবিক গতিপথ হইয়া গিয়াছে রুদ্ধ। ফলে স্বভাবতই ইহার প্রভাব পড়িতেছে ফসল উৎপাদন ও কৃষি অর্থনীতিতে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করিয়া দিয়া বলিয়াছেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের ফলে এই অঞ্চলের পরিবেশ বিপন্ন হইতে চলিয়াছে। অথচ একসময়ে রংপুর অঞ্চলের এই নদীগুলি ছিল প্রমত্তা যৌবনা! 

নদনদীগুলোর এই করুণ দশা কি এক দিনে ঘটে? অবশ্যই না। যখন মানুষ প্রকৃতির নিয়ম মানিতে চাহে না, তাহার বিরুদ্ধাচরণ করা শুরু করে, ঠিক তখনই প্রকৃতি শুরু করে তাহার নিষ্ঠুর খেলা। অনেক সময় নদনদী, খাল-বিলের মধ্যে বাঁধ দিয়া পানির গতিপথ পরিবর্তন করিয়া থাকি আমরা। ইহার সঙ্গে নির্বিচার দখল-দূষণ তো রহিয়াছেই। ফলে সেইনদীগুলি একটা সময়ে আসিয়া শুকাইয়া যায়, সেইখানে জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হারাইয়া যায়, অধিক শুষ্কতার কারণে কমিয়া যায় জমির উর্বরা শক্তিও; নদী হইয়া যায় বিলুপ্ত। এইরূপ অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের খেসারত হিসাবে আমরা কতশত নদী-খালকে 'হত্যা' করিয়াছি, তাহার ইয়ত্তা নাই। 

'হত্যা' বলা হইতেছে এই কারণে যে, নদীরও প্রাণ রহিয়াছে এবং উহা আদালত কর্তৃক স্বীকৃত! ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত তুরাগ নদটিকে দখল ও দূষণ হইতে বাঁচানোর উদ্যোগের অংশ হিসাবে এক রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট তুরাগ নদকে 'জীবন্ত সত্তা (লিভিং এনটিটি)' হিসাবে ঘোষণা করেন। যদিও আমরা কয় জন জানি যে, শুধু আমরা নহে, পৃথিবীর অনেক দেশ নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসাবে গণ্য করিয়া থাকে। স্বর্ণ আর কয়লার খনির কারণে নদী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০১৭ সালে কলম্বিয়ার সাংবিধানিক আদালত 'রিয়ো এট্রাটো' নামক একটি নদীকে এই অধিকার দেন। নিউজিল্যান্ডের একটি নদীকে খুবই পবিত্র মনে করা হয় এবং তাহাকেও জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করা হইয়াছে। এই ধরনের দৃষ্টান্ত রহিয়াছে আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতেও। অর্থাৎ, নদী একটি জীবন্ত সত্তা, তাহাকে তাহার মতো করিয়া বাঁচিতে দিতে হইবে, সেই অধিকার তাহার রহিয়াছে। 

নদী বিশেষজ্ঞরা বলিয়া থাকেন, আমাদের এই অঞ্চল স্মরণাতীত কাল হইতেই প্রাকৃতিক সম্পদে অতুলনীয়, যাহার কৃতিত্ব এই অঞ্চলের নদনদীগুলির। একসময় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল 'নদী নদী কোথায় যাও/ বাপভায়ের বার্তা দাও'-এর ন্যায় অজস্র ছড়া, কবিতা। নদী-খাল সত্যিই আমাদের খেলার সঙ্গী ছিল; কিন্তু যখন হইতে আমাদের মাথার মধ্যে ঢুকিল যে, 'পানি কেবল নিম্নভূমির দিকেই গড়ায়', আমরা নদীকে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো চালাইতে গেলাম! ইচ্ছামতো নদীর গতিপথ পরিবর্তন করিতে লাগিলাম। ইহার অভিঘাত কতটা মারাত্মক হইতে পারে, ফি বৎসর দুর্যোগের সময় তাহা আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি। এই অবস্থায় রাষ্ট্রীয় পরিচর্যায় নদীগুলিকে বাঁচাইয়া রাখিতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ইহাতে শতভাগ আগের অবস্থায় ফিরানো না গেলেও এখন নদীগুলি যেই অবস্থায় রহিয়াছে, তাহা অবিকৃত রাখা যাইবে। দখলদারদের উচ্ছেদ করিয়া নদীর প্রাণ ফেরানো যাইবে। ইহাতে নদীগুলি বিলুপ্তির কবল হইতে রক্ষা পাইবে, রক্ষা পাইব আমরা।