পবিত্র রমজান মাস এলে বিশ্বব্যাপী মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেড়ে যায়। রমজান উপলক্ষ্যে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যছাড়ের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এতে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, স্বল্প আয়ের মানুষসহ সবাই স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করতে পারে। সেখানে ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজান মাস শুরু হওয়ার এক মাস আগে থেকেই মূল্যছাড় দেওয়া হয়। কাতারে রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হয়ে যায় মূল্যছাড়ের হিড়িক। মালয়েশিয়াতেও বিপুল পরিমাণ পণ্যে মূল্যছাড় দেয়। ইউরোপ, আমেরিকায় দেশগুলো অন্য ধর্মের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। সেখানেও রমজান উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কোম্পানি বাজারে পণ্যে ব্যাপকভাবে মূল্যছাড় দেয়।
অন্যদিকে, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বড় উৎসব ক্রিসমাস ডে, থ্যংকসগিভিং ডে, ব্ল্যাক ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও হ্যালোউন। সারা দেশে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় এসব উৎসব পালিত হয়। এসব উৎসব সবাই অনাবিল আনন্দ উপভোগ করার লক্ষ্যে আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের খ্রিষ্টানপ্রধান দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর অবিশ্বাস্যভাবে দাম কমে যায়। আবার এসব উৎসব পালন করার জন্য উন্নত বিশ্বে সরকার বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য ব্যাংক ঋণ প্রদান করে। সেখানে উৎসব ঘিরে অযৌক্তিকভাবে মূল্য বৃদ্ধির কোনো প্রবণতা ব্যবসায়ীদের নেই। তাদের রয়েছে আদর্শ, নীতি ও নৈতিকতা। মানবতার অন্যন্য নজির পাওয়া যায় এসব দেশে।
পক্ষান্তরে, বাংলাদেশে উলটো নিয়ন্ত্রণহীন বাজার দেখা যায়। সব সময় আমরা সততা, মানবতা ও ইসলামের নীতি-নৈতিকতার কথা বলি। নৈতিকতার মানদণ্ডে আমরা হরহামশা নিজেদের শ্রেষ্ঠ দাবি করি বটে। আমরা আমাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে অনৈতিকতার চরম শিখরে পৌঁছে যাচ্ছি। আমরা লোভ সংবরণ করতে পারি না। লোভ-লালসা চরিতার্থ করার জন্য অসৎ পথ অবলম্বন করছি। লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষ গর্হিত কাজ করছে। সমাজে চলছে ভীষণ এক ভয়াবহ অস্থিরতা। কতক ব্যক্তি অন্যায়-অপরাধ করে অতি দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। কালোবাজারি, মজুতদারি করে মসজিদে গিয়ে সিজদা দিয়ে আল্লাহর কাছে জান্নাত খোঁজে। আশরাফুল মাখলুকাত হলেও আমরা এখনো মনুষ্যত্ব অর্জন করতে পারিনি। তাই কবি মুহাম্মদ আসাদ বলেছেন, ইউরোপ, আমেরিকায় আমি মুসলিম দেখিনি, তবে ইসলাম দেখেছি। আর মুসলমানের দেশে মুসলিম দেখা যায় কিন্তু ইসলাম খুব কমই দেখা যায়।
পবিত্র মাহে রমজান মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি মহিমান্বিত মাস। মানবজীবনে রমজানের গুরুত্ব অপরিসীম। সিয়াম সাধনা, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস রমজান। সব ধরনের গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহর আদেশে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করেন। রোজা কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনে। সেই সঙ্গে ইবাদতের মাধ্যমে আত্মা পরিশুদ্ধ হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। রমজান নিজের জীবন পুণ্যময় করার সুবর্ণ সুযোগ।
হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি এ মাসে একটি সাধারণ ভালো কাজ করবে, অন্য মাসের তুলনায় তাকে একটি ফরজ ইবাদতের সওয়াব প্রদান করা হবে। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ ইবাদত পালন করবে, তাকে সত্তরটি ফরজ ইবাদতের সমপরিমাণ সওয়াব প্রদান করা হবে। পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারার ১৮৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত আছে, ‘যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎকাজ করে, তা হবে তার পক্ষে অধিক কল্যাণকর। আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ, যদি তোমরা জানতে।’ আল্লাহ এ মাসে বিশেষভাবে মুমিন বান্দাদের জন্য রিজিক বৃদ্ধি করেন। সব ধরনের পাপ ও অন্যায় অপকর্ম থেকে দূরে থাকার আল্লাহর নির্দেশনা রয়েছে। যদি রমজানের শিক্ষাকে প্রকৃত অর্থে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবে আমরা কোনো অপরাধ করতে পারি না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রাখা সত্ত্বেও মিথ্যাচার ও পাপকর্ম থেকে বিরত রইল না, ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হওয়া ব্যতীত রোজা তার কোনো কাজে এলো না।’ ইসলামের মূল বাণী হচ্ছে মানবতার উৎকর্ষসাধন হলেও দিনদিন আমরা অমানবিক হয়ে পড়ছি। আমরা ইসলাম থেকে শিক্ষা নিই না এবং তা থেকে আদর্শ গ্রহণ করি না।
পবিত্র রমজান সহিষ্ণুতা, কৃষ্ণসাধন, আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস হলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা এ মাসে ভীষণ বেপরোয়া ও অসংযমী হয়ে ওঠে। প্রতি বছর রমজানের আগে থেকে বাজারে নিত্যপণ্যে দেখা দেয় চরম অস্থিরতা। রমজানকে কেন্দ্র করে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। ফায়দা লুটতে রমজান মাস আসার জন্য একটি অসাধু চক্র সারা বছর মুখিয়ে থাকে। এ মাসে সক্রিয় হয়ে ওঠে সিন্ডিকেট, কালোবাজারি ও মজুতদার। অসাধু চক্র বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অনৈতিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে এক ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করে। সরকার যায়-আসে কিন্তু সিন্ডিকেট থাকে বহাল তবিয়তে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বিভিন্ন অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলেছে।
সরকার প্রতি বছর রমজানের আগে রমজানের নিত্যপণ্য দ্রব্যের শুল্ক ছাড় দিলেও কোনো ফায়দা হয় না। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা বা বিশেষ চাহিদার সময় দাম বাড়িয়ে দেওয়া হারামের কাজ। কালোবাজারি, মজুতদারি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ও গর্হিত অপরাধ। এ প্রসঙ্গে নবি করিম (সা.) বলেছেন, সুবোধ ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত হয় আর পণ্য মজুতকারী অভিশপ্ত হয় ইবনে মাজা ২/৪২৮)। হাদিসে আরো বর্ণিত আছে, 'যে ব্যক্তি ৪০ দিন পর্যন্ত কোনো পণ্য গুদামজাত করে রাখবে, মানুষকে কষ্ট দেবে, সে এই সমুদয় সম্পদ দান করে দিলেও তার গুনাহ মাফের জন্য যথেষ্ট হবে না [মিশকাত ২৭৭২]।
দেশের প্রধান সমস্যা হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও সে তুলনায় মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়নি। সাধারণ মানুষ এসব অসাধু চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। দ্রব্যের অগ্নিমূল্য কারণে মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভোক্তাদের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষ। এতে জনজীবনে অনেক দুর্ভোগ নেমে এসেছে। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষ তাদের চাহিদা মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন।
টিসিবি ট্রাকের দীর্ঘ লাইনের বার্তা দেয় স্বল্প আয়ের লোকেরা চলতে অক্ষম। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের প্রতিনিয়ত মূল্যবৃদ্ধি যেন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সিন্ডিকেট, মজুতদারের চালবাজিতে ভরা মৌসুমেও চালের বাজার চলছে অস্থিরতা। ভোজ্য তেলের তেলেসমাতি চলছে সারা দেশে। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভোজ্য তেলের মজুত থাকার পরও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করায় দুই মাস যাবৎ চলছে ভোজ্য তেলের চরম অরাজকতা। সরকার পরিবর্তনের ফলেও নিত্যপণ্য দ্রব্যের দাম কমার পরিবর্তে মূল্য বৃদ্ধির কারণে জনমনে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা সাধারণ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে দারিদ্রতার মুখে। বাজারের ওপর কোনো সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
বাংলাদেশের বাজার অব্যবস্থাপনার সুযোগে মজুতদার, কালোবাজারি ও সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এরকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে জনজীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। রমজান মাস ত্যাগের মাস, ভোগ বিলাসের নয়। আমরা যাতে পবিত্র রমজানের শিক্ষা সঠিকভাবে উপলব্ধি অনুশীলন করতে পারি মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সেই তাওফিক দান করুক। রমজান মাসের সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে সবার জীবন পরিশুদ্ধ হোক।
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক