বাংলাদেশের স্টিল মিলের বহরে আরেকটি কারখানা যুক্ত হতে যাচ্ছে। বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লি. (বিএমএসআইএল) এর উৎপাদন আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে শুরু করার কথা। তবে নানামুখী ঝামেলার কারণে বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লি. (বিএমএসআইএল) প্রকল্পটি চ্যালেঞ্জে পড়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লি. চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপন করা হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে ক্রেতাদের সুবিধা দেওয়ার কথা চিন্তা করছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন প্রযুক্তির ফলে প্রতি টন রডের উৎপাদন খরচ ৩ হাজার টাকার মতো কমবে।
কোম্পানির নির্বাহীরা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, বিএমএসআইএল কারখানাটি ৭০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। কিন্তু মার্কিন ডলারসহ অন্যান্য মুদ্রার দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে এখানে মোট ৩ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। প্রকল্পটির পরিচালক মোহাম্মদ মাজেদুল ইসলাম বলেছেন, 'বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো রিবার কয়েল এবং ওয়্যার রড উৎপাদন করবে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া স্টিল উৎপাদনে আধুনিক এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হবে, যা প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতি থেকে তুলনামূলক কম খরচে মানসম্পন্ন স্টিল উৎপাদন করবে।
কোম্পানির নির্বাহীরা জানান, বার্ষিক ১২ লাখ ৫০ হাজার টন উৎপাদন সক্ষমতার এ প্রকল্পের অর্ধেক কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ইতালিয়ান প্রযুক্তি ড্যানিয়াল মিডা কিউএলপি মিনিমিলি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো রিবার কয়েল এবং ওয়্যার রড উৎপাদন শুরু করা হবে, যা আমদানি কমিয়ে দেশের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে।
তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর থেকে অর্থছাড়ে ধীরগতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন হুমকির মধ্যে পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা জানান, প্রকল্পের জন্য আট ব্যাংকের ২ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা সিন্ডিকেটেড ঋণ হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা মাত্র ৫৪০ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। এর ফলে আমদানিকৃত মেশিনারিজের শুল্ক পরিশোধ করা যাচ্ছে না। অনেক মেশিনারিজ চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকলেও তা ছাড় করা যাচ্ছে না। এর ফলে পোর্ট ডেমারেজ বাবদ বিপুল অঙ্কের টাকা দেনা পড়ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলে কারখানাটির ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেওয়া না গেলে কোম্পানির পাশাপাশি ব্যাংকও সমস্যায় পড়বে। উল্লেখ্য, বিএমএসআইএল বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান নয় বলে জানিয়েছেন, এর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা জানান, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমদ আকবর সোবহানের ছোট ছেলে ও বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাফওয়ান সোবহান এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা। বসুন্ধরা গ্রুপের দেনাপাওনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলে কর্মকর্তারা জানান।
উদ্যোক্তারা জানান, বিএমএসআইএল কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি থেকে ৩ মিমিএসএফডি প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া বেজা এবং বাংলাদেশ রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন বোর্ড থেকে যথাক্রমে ৬ এমএলডি অপরিশোধিত পানির সরবরাহ এবং ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের অনুমোদনও পাওয়া গেছে। কোম্পানিটি এরই মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ লাইনে ২৫২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। প্রকল্প এলাকার কাছে সন্ধীপ চ্যানেলে একটি জেটি নির্মাণের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে কোম্পানিটি। এর মাধ্যমে স্টিল উৎপাদনের কাঁচামাল পরিবহন এবং উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের পরিকল্পনা আছে কোম্পানিটির।
প্রকল্প পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, বিএমএসআইএল প্রকল্পে বছরে ১০ লাখ ২৫ হাজার টন উৎপাদন হবে। ইতিমধ্যে আমরা প্রকল্পের সাইট ডেভেলপমেন্ট, স্টিল স্ট্রাকচার, মেকানিক্যাল এবং ইলেকট্রিক কাজের অর্ধেক শেষ করেছি। ইটালিয়ান আধুনিক টেকনোলজি ব্যবহার করায় প্রকল্পটি বিদ্যুৎসাশ্রয়ী, সবুজ কারখানা হিসেবে পরিচিতি পাবে।
স্টিল কারখানায় বিনিয়োগ বসুন্ধরার এবারই প্রথম নয়। উদ্যোক্তারা জানান, ২০০০ সালে কোম্পানিটি ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জে একটি স্টিল মিল কারখানা স্থাপন করেছিল। লোকেশন ভালো না হওয়ায় বসুন্ধরা কারখানাটি চালু না রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় দুই যুগ পরে বসুন্ধরা আবার কেন এ ব্যবসায় আসছে? এমন প্রশ্নের জবাবে মাজেদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের পরিমাণ পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে কম। দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে স্টিলের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। এজন্য গ্রুপটি নতুন করে স্টিল বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের পরিমাণ ৫৫ কেজি যা ২০৩০ সালে ৯৫ কেজিতে উন্নীত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি ভারতে মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের পরিমাণ ৯৩ কেজি, জাপানে ৪৩২ কেজি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২৬৬ কেজি। এক হিসেবে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে বাংলাদেশের স্টিল খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৪ শতাংশ। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের রডের উৎপাদন ৯০ লাখ টনে পৌঁছেছে।
চ্যালেঞ্জে দেরী হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়ন
বিএমএসআইএল এর কারাখানা নির্মাণে জোর দিয়ে কাজ অনেকটুকু এগিয়ে নেওয়া হলেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে প্রকল্পটিকে ঘিরে। প্রকল্প কর্মকর্তারা বলেন, ব্যাংকের নানা জটিলতার কারণে প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেরী হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর পাশ করা অর্থও পাওয়া যাচ্ছে না প্রকল্প বাস্তবায়নে। বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যাংকগুলো তাদের একক গ্রাহকসীমার লিমিট অতিক্রম করেছে। বিষয়টির ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হলেও সেখান থেকে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। অর্থছাড় না হবার কারণে আমদানি করা প্রকল্পের অনেক যন্ত্রপাতি চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে আছে। দিনের পর দিন ডেমারেজ চার্জও বাড়ছে। অপরদিকে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা) বিভিন্ন পরিষেবা যেমন-গ্যাস, পানি ইত্যাদির লাইন সরবরাহ করেনি। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মাজেদুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক অর্থছাড় না করলে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেরী হবে। এতে কোম্পানির সাথে সাথে ব্যাংকও সমস্যায় পড়বে। তার মতে, বর্তমানে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মেশিনারিজ চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে আছে। সব মিলিয়ে প্রায় শতকোটি টাকার মতো ডেমারেজ যোগ হয়েছে। এটি শেষ পর্যন্ত প্রকল্প ব্যয়ের সাথে যুক্ত হবে। মাজেদুল ইসলাম জানান, বসুন্ধরা স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লি. এরই মধ্যে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি থেকে গ্যাস লাইনের অনুমতি নিয়েছে। এজন্য কারখানার মধ্যে গ্যাস রিসিভিং সেন্টারও বসানো হয়েছে। কোম্পানিটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের জন্য ২৫২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।