স্থবির নগরজীবন!

ভয়াবহ যানজট জীবনের স্বাভাবিক গতিকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। ঢাকা শহর এবং যানজট—এই দুটি যেন একই সুতোর মালা। যানজটের কারণে ঢাকা শহরে স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ এই শহরে বের হয় জীবিকার তাগিদে, কিন্তু রাস্তায় নেমেই পড়তে হয় তীব্র যানজটে। অফিস টাইমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানজটের কারণে গতি থমকে থাকলেও সময় থমকে থাকে না। কর্মস্থলে সময়মতো পৌঁছতে না পারার কারণে কাজের কাজ কিছুই হয় না। দশ মিনিটের রাস্তা পেরোতে লাগে এক ঘণ্টা। সকাল-বিকাল-সন্ধ্যা, যখন-তখন, যেখানে-সেখানে যানজট। সর্বত্র ভিড় আর ভিড়, গাড়ির ভিড়, মানুষের ভিড়।

রোগীসহ অ্যাম্বুলেন্স যখন যানজটে আটকে পড়ে, তখন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, এমনকি পথিমধ্যে যানজটের কারণে রোগীর মৃত্যুও ঘটে। রাজধানী ঢাকাতেই যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। ফলে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত আর্থিক ক্ষতি হয় বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ তথ্য বিশ্বব্যাংকের। যত দিন যাচ্ছে, যানজট ততই প্রকট আকার ধারণ করছে। ঈদের সময় এই যানজট মারাত্মক আকার ধারণ করে। এখন রোজা চলছে। ঈদ সন্নিকটে। মানুষ শপিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে ঘর থেকে বের হবে। বিশেষ করে দেখা যাচ্ছে রাজধানীর সড়কে ইফতারের আগের তিন ঘণ্টায় যানজট তীব্র হচ্ছে। এমতাবস্থায়, রাস্তাঘাটের কী অবস্থা দাঁড়াবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যানজট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এক বৈঠকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুই সিটি ট্রাফিক সিস্টেম বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বৈঠকে কিছু নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের যানজট নিরসন হবে। আমাদের অবিলম্বে এর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।’

যানজট কমাতে প্রথমেই যে গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাত দেওয়া প্রয়োজন, তাহলো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট উন্নয়ন। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে গুচ্ছ মালিকানা ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা। যাত্রীর জন্য সময় বেঁধে দেওয়া থাকবে। যাত্রী কমবেশি যা-ই হোক, বাস সময়মতো ছেড়ে যাবে। একই রুটে একই কোম্পানির গাড়ি চলাচল করবে। পরিবহন মালিক ও সরকার এদিকে নজর দিলে এখনই যানজটের তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। জোড়-বিজোড় সংখ্যায় নিবন্ধিত প্রাইভেট গাড়ি এক দিন পরপর চলাচল করবে। সঙ্গে সঙ্গে গণপরিবহনের সংখ্যা এবং সুযোগ-সুবিধা বাড়লে প্রাইভেট গাড়ি এমনিতেই কমে আসবে। এছাড়াও ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অফিস শুরু এবং শেষের সময় বিবেচনায় কিছু সমান্তরাল সড়কে একমুখী যান চলাচল ব্যবস্থা চালু করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যানজট তৈরি হয়, তাই এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষ হেঁটে চলার জন্য ফুটপাত হকারমুক্ত করে দিতে হবে। হকারদের জন্য হলিডে মার্কেট চালু করা যেতে পারে। স্বল্প দূরত্বে নাগরিকদের হেঁটে চলার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

এছাড়াও ঢাকা শহরের চতুর্দিকে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণ করা যেতে পারে। যানজট নিরসনে রাজধানীর রাস্তাগুলো প্রশস্তকরণ, ফ্লাইওভার নির্মাণ, বিদ্যমান ফ্লাইওভারগুলোকে আরো বিস্তৃত করা যায়। সর্বোপরি নাগরিক জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্য, সাবলীল ও গতিশীল করে তুলতে যানজট সমস্যার সমাধান অবশ্যই করতে হবে। এ নগরীকে বাসযোগ্য রাখতে প্রয়োজন সময়োপযোগী সুন্দর বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা ও তার দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ। এজন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা এবং দৃঢ় মনোবল।

লেখক :শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়