মাদক, মানসিক চাপ এবং সমাজের ভণ্ডামি 

মাদক নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের দ্বৈতনীতি কাজ করে। আমরা ধূমপান, অ্যালকোহল, গাঁজা বা অন্যান্য মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করি, কিন্তু কখনোই ভাবতে চাই না, কেন মানুষ এসবের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মাদকবিরোধী অভিযান, কঠোর আইন বা সামাজিক লজ্জা দেখিয়ে মানুষকে নেশা থেকে ফেরানো যায় না, যদি না আমরা মাদক গ্রহণের প্রকৃত কারণগুলো খুঁজে বের করি।

ধরুন, একজন পুরুষ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। এতে কেউ কিছু বলবে না। বরং তার সঙ্গীরা হয়তো জিগ্যেস করবে-দে তো, একটা টান দিই।' কিন্তু যদি একজন নারী একই কাজ করেন, তখন ব্যাপারটা হয়ে যাবে 'নৈতিকতার সংকট'। যদিও ধূমপান কারো জন্যই ভালো না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। কিছুদিন আগে দুই তরুণী সিগারেট খাচ্ছিলেন বলে একদল পুরুষ তাদের ওপর মব তৈরি করেছিল। ভাবখানা এমন, যেন তারা ভয়ংকর কোনো অপরাধ করে ফেলেছেন। অথচ এই সমাজই পুরুষদের ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন বা অন্য মাদক গ্রহণকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়।

এই বৈষম্যের কারণ কী? অনেকে মনে করেন, সমস্যা শুধু ধূমপান বা মাদক গ্রহণে নয়, সমস্যা হলো সমাজের ভণ্ডামিতে। পুরুষ ধূমপান করলে সেটি তার স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের অংশ, কিন্তু নারী করলে সেটি তার 'দুশ্চরিত্রতা'র প্রমাণ হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নারী কেন ধূমপান বা মাদকের আশ্রয় নেয়? কারণ হিসেবে অনেকে বলেন-তারা চাইলেও সমাজের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পায় না। স্ট্রেস কমানোর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায়, অনেক নারীও ধূমপানের মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি খোঁজেন। যদিও তা উচিত না। উচিত নয়-নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই। খারাপ তো খারাপই। খারাপের কোনো লিঙ্গ নেই।

সব দেখেশুনে মনে হয়, এই সংকট শুধু নারীদের নয়, সার্বিকভাবে সমাজেরও। মানুষ কেন নেশার আশ্রয় নেয়? কারণ কি এই যে, আমাদের সমাজ আমাদের মধ্যে এত স্ট্রেস তৈরি করে দেয় যে, সেই চাপকে রিলিজ করার জন্য বা ভুলে থাকার জন্য কোনো একটা নেশার কাছে এসে নতজানু হয়? এভাবে তারা চাপ থেকে মুক্তি পেতে চায়! বিষণ্ণতা, মানসিক যন্ত্রণা, ট্রমা, একাকিত্ব-এসব অনুভূতির সঙ্গে লড়তে না পারলে মানুষ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন অনেকে। কেউ ধূমপান করে মানসিক চাপ কমানোর জন্য, কেউ অ্যালকোহল গ্রহণ করে দুঃখ ভুলতে চায়, কেউ গাঁজা সেবন করে সাময়িক উচ্ছ্বাসের অনুভূতি পেতে চায়।

বিশ্ব জুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্ণতা বা মানসিক অবসাদে ভোগা মানুষের মধ্যে ধূমপান ও মাদক গ্রহণের প্রবণতা বেশি থাকে। ধূমপানের নিকোটিন সাময়িক প্রশান্তি দেয়, অ্যালকোহল মস্তিষ্কের ব্যথা অনুভব কমিয়ে দেয়, গাঁজা স্নায়ুকে শিথিল করে। কিন্তু এই স্বস্তিগুলো সাময়িক এবং দীর্ঘ মেয়াদে এগুলো আরো বেশি মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি ডেকে আনে।

শুধু প্রাপ্তবয়স্করাই নয়, শিশুরাও আজ মাদকের শিকার হচ্ছে। পথশিশুরা 'ডান্ডি' নামে পরিচিত একধরনের মাদক গ্রহণ করে, যা মূলত আঠা বা রাসায়নিক গ্যাস। এটি তাদের ক্ষুধা কমিয়ে দেয়, সাময়িকভাবে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। কিন্তু দীর্ঘদিন এটি গ্রহণ করলে মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে যায়, দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন শিশুরা এসব করে? কারণ তাদের পেটে খাবার নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই, ভালো কোনো ভবিষ্যতের আশাও নেই। তারা ক্ষুধা সহ্য করতে পারে না বলেই নেশার আশ্রয় নেয় বলে অনেক শিশু জানিয়েছে। যদি আমরা তাদের খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা এবং ভালো ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতাম, তাহলে কি তারা মাদক গ্রহণ করত?

শুধু দারিদ্র্য নয়, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক ট্রমাও মাদক গ্রহণের একটি বড় কারণ। সন্তান যখন দেখে বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভালো নয়, তারা প্রতিদিন ঝগড়া করে বা কেউ একজন শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তখন তার মনের ভেতরে গভীর ক্ষত তৈরি হয়। বিচ্ছেদ, পারিবারিক অবহেলা, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত শাসন বা অযত্নের কারণে অনেক তরুণ-তরুণী একাকিত্বে ভোগে, যা তাদের ধীরে ধীরে নেশার দিকে ঠেলে দেয়। অনেক সময় পরিবারেই এমন পরিবেশ থাকে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা ট্রমার কথা বললেই তা দুর্বলতা মনে করা হয়। ফলে যাদের সাহায্যের প্রয়োজন, তারা কাউকে বলতে পারে না, কাউন্সেলিং নেওয়ার সুযোগও থাকে না। তারা একসময় নিজেই সমাধান খুঁজতে গিয়ে নেশার আশ্রয় নেয়।

আমরা যদি সত্যিই মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, তাহলে শুধু পুলিশি অভিযান বা কঠোর আইনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে-কেন মানুষ মাদকের আশ্রয় নিচ্ছে? যদি তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারি, তাহলে তারা মাদকের প্রয়োজনই অনুভব করবে না। আমাদের নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে, কীভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা যায়, কীভাবে পরিবারগুলোর মধ্যে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, কীভাবে কর্মসংস্থান বাড়িয়ে দারিদ্র্য কমানো যায়, কীভাবে পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা যায়। মানসিক চাপ কমানোর বিকল্প উপায় কীভাবে তৈরি করা যায়, তা নিয়েও ভাবতে হবে। সমাজকে বুঝতে হবে, মাদক কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট।

একটি সুস্থ সমাজ তখনই গড়ে উঠবে, যখন মানুষ তাদের কষ্ট, হতাশা বা ট্রমা কাটিয়ে ওঠার জন্য মাদকের আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে না। যতদিন পর্যন্ত এই কারণগুলো থেকে যাবে, ততদিন মাদক নির্মূল হবে না। এখন সময় এসেছে দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার, সময় এসেছে সত্যিকারের পরিবর্তন আনার। মাদক নয়, সমস্যার মূলোৎপাটনেই রয়েছে মুক্তি।

• লেখক: গবেষক, মেডিক্যাল হিউম্যানিটিজ ও ট্রমা স্টাডিজ