অর্ধেক আকাশের মেঘ কতখানি দূর হলো?

অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোতে নারী নির্যাতন বা নারীর প্রতি বৈষম্যের প্রধান কারণ হচ্ছে, নারীর যোগ্যতার প্রতি মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা। নারীর যোগ্যতার প্রতি মর্যাদা বলতে আমরা কী বুঝি? এটাকে বিভিন্ন পর্যায়ের নারীর যোগ্য মর্যাদা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠাকে বুঝানো যেতে পারে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীকে তার যোগ্য আসন, অধিকার ও নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকাকে বুঝায়। প্রতিটি ইস্যুতে নারীকে তার মতামত প্রকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিতে হবে। একজন নারীর তার ব্যক্তিগত বিষয়, পোশাক, আচরণ ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকতে হবে।

বাংলাদেশ এখনো এই ব্যাপারে অনেকটাই পিছিয়ে আছে। মাঝে দুই বছর (২০০৭-২০০৮) বাদ দিয়ে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দুই জন জন নেত্রী পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ৩০ বছরে নারী কতখানি এগোলো? নারীর যোগ্যতার মর্যাদার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ অগ্রগতি কি হয়েছে? বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক আকাশ নারীতে পরিপূর্ণ। সেই অর্ধেক আকাশের মেঘ কতখানি দূর হলো? এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের নারীরা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় কর্মক্ষেত্রে অধিক হারে অংশগ্রহণ করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কর্মক্ষেত্রে তারা যোগ্য মর্যাদা এবং অধিকার পাচ্ছেন না। বিবিধ কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মোতাবেক, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে ১০ হাজার ৭০৪টি। একই বছর আগস্ট-ডিসেম্বর সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৬ হাজার ৮৬৭টি।

আর ২০২৫ সালে জানুয়ারি মাসে নারী নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০টি। গত বছর (২০২৪) জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ৪৬৪টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য অনুসারে গত বছরের আগস্ট মাস থেকে এ বছর ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সাত মাসে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ জানিয়ে কল এসেছে ৩৪৮টি। অন্যদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকের তথ্য সংকলন করে জানিয়েছে, গত বছর (২০২৪) নারী ও শিশু নির্যাতনের ২ হাজার ৫২৫টি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সাত মাসে ১ হাজার ৬৬৪টি এবং আগস্ট থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৫ মাসে ৮৬১টি নারী নির্যাতনের ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গত বছর ৩৪৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১২ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৩ জনকে। ধর্ষিতা হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ছয় জন। নারীর প্রতি সহিংসতা বা নির্যাতনের সঠিক বিচার হচ্ছে না। আইনি জটিলতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। অর্থাত্ দেশে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে।

বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো গত ৮ মার্চ বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হলো। প্রথমদিকে ‘নারী দিবস’ পালন করা হতো শ্রমজীবী নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য। পরবর্তীকালে তা সব শ্রেণি-পেশার নারীর অধিকার আদায়ের সম্মিলিত দাবিতে পরিণত হয়। নারী দিবস এখন সার্বজনীনতা অর্জন করেছে। কাঠামোগতভাবেই নারী বৈষম্যের শিকার। এর মূল কারণ হচ্ছে, নারীর অর্থনৈতিক অধিকার এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। নারীর যোগ্যতার মূল্যায়ন বলতে শুধু নারীকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে হবে—তা নয়। নারীর যোগ্যতার মর্যাদা বলতে সমাজের প্রতিটি স্তরে বা ক্ষেত্রে তার মতপ্রকাশ এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করা বুঝায়। নারীকে যদি উপযুক্ত শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জনের অধিকার দেওয়া যায় তাহলে সার্বিকভাবে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত হতে পারে। একজন নারী যদি আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হন তাহলে সমাজ এবং সংসারে তার মর্যাদা ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। তার মতামতকে অন্যেরা গুরুত্ব দেয়। সাংসারিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। একজন নারী যদি উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জন করতে পারেন তাহলে তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠাও সহজীকরণ হয়। কিন্তু আমাদের সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো নারীকে বৈষম্যের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। নারীরা এমনকি শিক্ষিত হয়েও বা অর্থ উপার্জন করলেও মানবিক মর্যাদা পাচ্ছেন না, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণ করতে পারছেন না। স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করতে পারছেন না।

কৃষিকাজ থেকে শুরু করে তৈরি পোশাকশিল্পে নারীরা অধিকহারে অংশগ্রহণ করছেন। গত ৩০-৪০ বছরে শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা প্রদর্শন করা সত্ত্বেও মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হচ্ছে। একজন পুরুষ শ্রমিক যে হারে মজুরি পান নারীরা তা পান না। অর্থাত্ শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও মজুরি বৈষম্য আগের মতোই রয়েছে। অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রে দিবা যত্ন কেন্দ্র না থাকায় নারীরা তাদের সন্তান পালন নিয়ে সমস্যায় পড়েন। একই সঙ্গে দেখতে হবে, কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি কোনো অনাচার করা হচ্ছে কিনা, মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে পুরুষ কর্মীর সঙ্গে নারী বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে কিনা। নারীকে তার ব্যক্তিগত মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে দেওয়া হচ্ছে কিনা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর মতামতকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন সুবিধা কেমন তাও গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামীণ পুরুষেরা গ্রামে কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। কারণ মজুরি কম। তারা গ্রাম ছেড়ে শহরে বা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জমির মালিকগণ উত্পাদন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে। আর এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মজুরি কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নারী কৃষি শ্রমিকরা যেহেতু অসহায় তাই তারা বাধ্য হয়ে কম মজুরিতে গ্রামীণ কৃষিকাজে যুক্ত থাকছেন। এছাড়া নারীদের অনেকেই এখন গ্রাম ছেড়ে শহরে কর্মসংস্থানের জন্য আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পেও নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এমনকি ব্যাটারি তৈরি এবং কাঠের ফার্নিচার তৈরি কারখানায় নারীরা কার্পেন্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তারপরও তারা মজুরি বৈষম্যের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। কারখানা মালিকগণ প্রধানত শ্রমিকদের তুলনামূলক কম মজুরি দিতে চান বলেই নারীদের কাজে নেন।

বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে, কিন্তু তারা কি নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন? সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কি নারীর সমানুপাতিক অংশগ্রহণ আছে? সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের মতামতকে কি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? নারীকে আমি বিভিন্ন পদে রাখলাম কিন্তু তাকে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ দিলাম না, তার মতামতকে উপেক্ষা করলাম—তা হলে নারীর মর্যাদা মূল্যায়ন কী করে হবে? শহর থেকে গ্রাম প্রতিটি পর্যায়ের নারীর প্রতি বৈষম্য প্রত্যক্ষ করা যায়। সম্প্রতি গণআন্দোলনে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। রাজপথে নারীরা আজ অনেক সাহসী ভূমিকা পালন করেন। সুতরাং বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে এমন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে যাতে নারী বা পুরুষ সবাই স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। এটা করা গেলেই নারীর যোগ্যতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অ্যাকাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : এম এ খালেক