৪৬ বছর বয়সী জিহাদ সুলেমান আল-সাওয়াফতা তার পুরো জীবন ইসরায়েলের দখলকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চল পশ্চিম তীরের বারদালা গ্রামে নিজের খামারে বসবাস করেছেন। কিন্তু ডিসেম্বরে যখন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা এসে হানা দেন, তখন আল-সাওয়াফতার জমি এবং জীবিকা আগের চেয়ে কমে যায়।
তিনি সিএনএনকে বলছিলেন, বসতি স্থাপনকারীরা এখানে আরেকজন বসতি স্থাপনকারীকে এনে আমাদের এলাকায় বসিয়েছে। ইসরায়েলিরা আমাদের চারণভূমি এবং কৃষিক্ষেত্রকে পৃথক করে একটি রাস্তা তৈরি করেছে। বসতি স্থাপনকারীরা আমাদের সেখানে কৃষিকাজ করতে দেয় না।
সুলেমান বলেন, তারা (ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা) এলাকাটিতে ভিড় জমিয়ে ফেলে। তারা বারদালা এলাকা এবং এর চারণভূমি থেকে হাজার হাজার দুনাম (১,০০০ বর্গমিটার) দখল করে নেয়।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীরের রুটির ঝুড়ি হিসেবে বিবেচিত উর্বর ভূমি জর্ডান উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ব্যাপক হারে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জানুয়ারির শেষের দিকে সিএনএন-এর সফরের সময় ইসরায়েলি বাহিনী একটি নতুন রাস্তা তৈরির কাজ তদারকি করছিল। আল-সাওয়াফতা বলেন, সামরিক বাহিনী ২৪ ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে, বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তা দেয়। এর ফলে তার পক্ষে রাস্তা পার হওয়া এবং নিকটবর্তী জমিতে চাষাবাদ করা ফসলের পরিচর্যা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বারদালা এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্যের অনুরোধের জবাবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সিএনএনকে জানিয়েছে, নতুন রাস্তাটি নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য তৈরি করা হয়েছে। সামরিক আদেশ অনুসারে রাস্তা পাকা করা হয়েছে। কাজের সময় এলাকায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের কোনো ক্ষতি করা হয়নি।
সুলেমান জানান, প্রথমে জমিতে পশুপালনের জন্য স্থাপনা নির্মাণ করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। যেখানে কিছু গবাদির কারণে একসময় তারা জমির মালিকানা দাবি করে। পর্যবেক্ষণকারী গোষ্ঠীগুলো বলছে, বসতি স্থাপনকারীরা বিশাল জমি দখল করে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের অবাধে চলাচলে বাধা দেওয়ার জন্য কুখ্যাত। ইসরায়েলি এবং আন্তর্জাতিক আইন উভয়ের অধীনেই এই পশুপালন স্থাপনাগুলো অবৈধ।
২০২২ সালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী জোট বসতি সম্প্রসারণের উস্কানির মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ইসরায়েলি পশুপালন স্থাপনার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারে এমন মন্ত্রীরা রয়েছেন যারা নিজেরাই বসতি স্থাপনকারী এবং দখলকৃত অঞ্চলটি ইসরায়েলের সাথে সংযুক্ত করতে চান।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর বসতি স্থাপনকারীরা তাদের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তায় জমি দখল আরও বাড়িয়ে দেয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি পশুপালন স্থাপনা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সংস্থা পিস নাউ এবং কেরেম নাভোটের যৌথ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বসতি স্থাপনকারীরা ৪৯টি নতুন অবৈধ পশুপালন স্থাপনা নির্মাণ করে। এগুলো নির্মাণ করে তারা আশেপাশের বিশাল জমি দখল করে নেয়। ওইসব এলাকার স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এর প্রমাণ পেয়েছে সিএনএন।
পিস নাউ এবং কেরেম নাভোটের অনুমান, কয়েকশ বসতি স্থাপনকারীর দখলে থাকা পশুপালন স্থাপনাগুলো এখন পশ্চিম তীরের প্রায় ১৪ শতাংশ এলাকাজুড়ে রয়েছে। পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর মতে, কিছু স্থাপনা চরমপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী এবং বসতি স্থাপনকারীদের নিজস্ব সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব বসতি স্থাপনকারীদের সংস্থাকে বাইডেন প্রশাসনের অধীনে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
পিস নাউ এবং কেরেম নাভোটের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৯০-এর দশক থেকে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীরা পশুপালন স্থাপনা ব্যবহার করে মোট যত জমি দখল করা হয়েছে, তার ৭০ শতাংশই গত আড়াই বছরে দখল করা হয়েছে।
কেরেম নাভোটের প্রতিষ্ঠাতা ড্রর এটকেস সিএনএনকে বলেন, এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, পশুপালন স্থাপনাগুলো একটি জাতীয় প্রকল্প, একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্প। এটি এমন কোনো প্রকল্প নয়, যা ব্যক্তিরা শুরু করেছে। এটি এমন একটি প্রকল্প যার পেছনে ইসরায়েল দাঁড়িয়ে আছে, বাজেট দিচ্ছে, সহায়তা দিচ্ছে, সুরক্ষা দিচ্ছে।
সিএনএন প্রমাণ পেয়েছে, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত একটি সংস্থা বসতি স্থাপনকারীদের পশুপালন স্থাপনা নির্মাণে সহায়তা করেছে। সংস্থটির নাম- ওয়ার্ল্ড জায়োনিস্ট অর্গানাইজেশন (ডব্লিউজেডও), যা ইহুদি রাষ্ট্র তৈরিতে সহায়তা করেছিল। কীভাবে এই গোষ্ঠী পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের জমি বরাদ্দ করেছে সিএনএন সেটিও পর্যালোচনা করে দেখেছে।
পশুপালন স্থাপনা নির্মাণ করে জমি দখলের প্রথা সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য সিএনএন ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের বেশ কয়েকজন সদস্যের সাথে যোগাযোগ করে। কিন্তু কেউই সাক্ষাৎকার নিতে রাজি হয়নি।
সিএনএন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করেছিল। সেখান থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ অংশ এসব বসতিগুলোকে অবৈধ বলে মনে করে। তবে ইসরায়েল এ নিয়ে আপত্তি জানায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থাপনাগুলোর কাছাকাছি বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের জন্য রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হছে। সেই সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে বেড়া। বসতি স্থাপনকারীদের এসব কার্যকলাপ ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জমি দখলের ঘটনাও হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলেছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত ফেব্রুয়ারির শেষে বলেছিলেন, তিনি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের চারটি শরণার্থী শিবিরে অভিযানের ফলে বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা যেন ফিরে যেতে না পারে। জাতিসংঘের অনুমান, প্রায় ৪০,০০০ মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৩০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনির আবাসস্থল পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি অনুমোদন করতে পারেন।
মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে যে, গাজার বাসিন্দাদের সরিয়ে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিতে ট্রামের প্রস্তাব অধিকৃত পশ্চিম তীরেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।
১৯৬৭ সালে জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে ইসরায়েল। ১৯৮০ সালে পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের সাথে সংযুক্ত করে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেও দখলকৃত বলে বিবেচিত হয়।