২৪ ঘণ্টা পার হলেও সুন্দরবনের ধানসাগর টহল ফাঁড়ির তেইশেছিলার বনের আগুন এখনও নেভেনি। গত ২১ বছরে সুন্দরবনের ওই অঞ্চল এবং এর আশপাশের এলাকায় ২৪ বার আগুন লেগেছে।
আগুনের ঘটনা যতই বাড়ছে, সন্দেহ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাকৃতিক কারণে নয়। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী চক্র আগুনের ঘটনায় দায়ী। বর্ষার আগে পরিকল্পিতভাবেই আগুনের সূত্রপাত ঘটানো হয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বন বিভাগ কর্মকর্তাদের অনেকের ধারণাও অভিন্ন।
বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত একুশ বছরে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে ২৪ বার আগুন লেগেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ২০০৫ সালে চাঁদপাই রেঞ্জের পচাকোড়ালিয়া এলাকায় দুইবার, ২০০৬ সালে শরণখোলা রেঞ্জের তেরাবাকা, চাঁদপাই রেঞ্জের আমুরবুনিয়া ও ধানসাগর এলাকায় পাঁচবার, ২০০৭ সালে পচাকোড়ালিয়া, নাংলী, ২০১০ সালে গুলিশাখালী, ২০১১ সালে নাংলীতে ২ বার, ২০১৪ সালে গুলিশাখালীতে, ২০১৬ সালে নাংলী, পচাকোড়ালিয়া, তুলাতলায় তিনবার, ২০১৭ সালে ধানসাগর ষ্টেশনের মাদ্রাসারছিলা এলাকায় একবার, ২০২৪ সালের গত ৪ মে চাঁদপাই রেঞ্জের আমুরবুনিয়া টহল ফাঁড়ির লতিফেরছিলা, সর্বশেষ গত ২২ মার্চ শরণখোলা উপজেলার পশ্চিম রাজাপুর গ্রাম সংলগ্ন চাঁদপাই রেঞ্জের কলমতেজীর টেপারবিল ও ২৩ মার্চ ধানসাগর ফরেষ্ট টহল ফাঁড়ির শাপলারবিল তেইশেরছিলায় সুন্দরবনে আগুনে বনের লতা পাতা, গুল্ম ছোট ছোট বলা প্রজাতির গাছ পুড়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন সংলগ্ন উত্তর রাজাপুর, পশ্চিম রাজাপুর, ধানসগার, গুলিশাখালী, আমুরবুনিয়া গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিয়মিত বিরতি দিয়ে বছরের পর বছর সুন্দরবনে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আগুন জ্বলে ওঠে। একটি চক্র বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের বিলে মাছ ধরার জন্য খরার সময় শুষ্ক বনে আগুন লাগিয়ে ছাই তৈরী করে। বর্ষায় বিলে কৈ, মাগুর, শিং মাছ আগুনে পোড়া ছাই খেতে আসে। বর্ষায় ওই চক্রের লোকেরা বনরক্ষীদের ম্যানেজ করে অবৈধভাবে বিলে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে থাকে। গোপন ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে এ ঘটনায় জড়িতদের নাম পরিচয় জানা যাবে।
বনবিভাগের কর্মকর্তারাও একই সুরে কথা বলছেন। সম্প্রতি সময়ে লাগা আগুন প্রাকৃতিকভাবে নয়। বরং কেউ লাগিয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বনবিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মো. ইমরান আহমেদ সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থল তেইশেরছিলা পরিদর্শন শেষে বলেন, সুন্দরবনের তেইশেরছিলার আগুন অনেকটা নিভে গেছে। মাঝে মাঝে কিছু ধোঁয়া দেখা যায়। সুন্দরবনের এই আগুন প্রাকৃতিকভাবে লাগেনি বলে মনে হচ্ছে। আগুনের ঘটনায় ইতোমধ্যে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আরও কমিটির সদস্য বাড়ানো হবে। তদন্তের পরে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।
এদিকে পূর্ব সুন্দরবনের কলমতেজির আগুন নিভে গেলেও রোববার সকালে ধানসাগর টহল ফাঁড়ির শাপলারবিল তেইশেরছিলার বনে নতুন করে আগুন জ্বলে ওঠে। এখানে আগুনের ব্যপকতা বেশি। রোববার সকাল ১০টার দিকে ড্রোন দিয়ে নতুন করে জ্বলে ওঠা আগুন দেখতে পায় বনরক্ষীরা।
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা বিপুলেশ্বর দাস বলেন, বনবিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের নিরলস চেষ্টায় ফায়ার লাইন কেটে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনা হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) দীপন চন্দ্র দাস বলেন, ধানসাগর ষ্টেশনের শাপলার বিল তেইশেরছিলায় বনে আগুনের ব্যপকতা বেশি। আগুন যাতে ছড়াতে না পারে সে জন্য আগুনের চারপাশে ফায়ার লাইন কেটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। কাছাকাছি কোন পানির উৎস নেই। আগুনের স্থল থেকে তিন কিলোমিটার দুরে ভোলা নদী। নদীতে জোয়ার ছাড়া পানি থাকেনা। রোববার রাতে জোয়ারে ফায়ার সর্ভিস ও বনরক্ষীরা পাম্প মেশিনের সাহায্যে পানি দিয়ে আগুন অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। নদীর ভাটায় পানি দেয়া বন্ধ রয়েছে।
শরণখোলা ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবতাদ ই আলম বলেন, ভোলা নদীতে পানি না থাকায় নদী থেকে তিন কিলোমিটার দূরে দুর্গম বনে গিয়ে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হচ্ছে । পানির অভাবে আগুন নেভানোর কাজ সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বনের প্রায় এক বর্গ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে আগুন জ্বলছে। বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে আগুন ও ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, বাগেরহাট, খুলনা, কচুয়া ও ফকিরহাট থেকে ৬ টি ইউনিটের অর্ধশত ফায়ার ফাইটার ধানসাগর ষ্টেশনের শাপলারবিলের তেইশেরছিলায় আগুন নেভানোর কাজে নিরলস কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের একই কর্মকর্তা।