স্টার্টআপরা বিনিয়োগ বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে

রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রয়োজনীয় সেবার সরবরাহে ঘাটতি যেমন গ্যাস ও বিদ্যুত্ এবং নানা ধরনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, দক্ষ জনশক্তির অভাব বাংলাদেশে স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ অধিক হারে আকর্ষিত না হওয়ার  প্রধানত কারণ হিসেবে ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে।  এগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিরসন করা যাবে তাও মনে হয় না। এফডিয়াইর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা, দীর্ঘদিন থেকে এফডিয়াই স্বল্পসংখ্যক কিছু খাতে আটকে আছে এবং বেশির ভাগ এফডিয়াই হোল রি-ইনভেস্টমেন্ট। সরকারি পরিসংখ্যানে বিনিয়োগের যে প্রাক্কলন করা হয় তার এক-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়।

সরকার নানান ধরনের  কর্মপ্রেরণা ঘোষণা করলেও অনেক দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তা অনেকটা এগিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যান। লাইসেন্স এবং অন্যান্য রেগুলাটরি বিষয় যেমন সার্টিফিকেট, পারমিশন ইত্যাদির জন্য প্রচুর সময় দরকার হয় এবং কোথায় কী পাওয়া যাবে, কীভাবে পাওয়া যাবে, প্রক্রিয়া কী রকম, কী কী ডকুমেন্ট দরকার এসবের সঠিক তথ্য পেতে উদ্যোক্তাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়, এসব কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সন্তোষজনক বিনিয়োগ হয়নি বিশেষ করে যেসব খাতে আমাদের টেকনোলজি ট্রান্সফার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য প্রস্তুতের দরকার রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপিতে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৯৪ শতাংশ কিন্তু বাস্তবায়িত হয়েছে, বেসরকারি খাতে ২৩.৫১ শতাংশ (লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬.০৮ শতাংশ), সরকারি বিনিয়োগ ৭.৪৭ শতাংশ যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮.৮৬ শতাংশ (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪)। বিগত কয়েক বছর থেকেই বিনিয়োগ আশানুরূপ হচ্ছে না। যার সঙ্গে কর্মসংস্থানের একটি ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। এ কারণে আত্মকর্মসংস্থান একটি উপায় হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে।

এ রকম একটি বাস্তবতার মধ্যে যুবসমাজ তাদের প্রতিভার মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্ভাবনী মডেল দ্বারা একটি নীরব বিপ্লবের মাধ্যমে স্টার্টআপ বিজনেসে আশার প্রদীপ জ্বেলেছেন। বিভিন্ন ই-কমার্স যেমন পাঠাও, চালডাল, শপআপ (বি২বি ই-কমারস), আই ফার্মার প্রভৃতির মাধ্যমে তরুণরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে ও আত্মকর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করছে।  বিকাশ বাংলাদেশে একটি অন্যতম সফল প্রকল্প, যার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠী যথেষ্ট সেবা পাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে এ স্টার্টআপগুলোর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার যা অন্যান্য দেশের তুলনায় যদিও এখনো অনেক কম তবে এ সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আশা করা যায়। যেমন সিংগাপুরে এ সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারের বেশি, ভারতে ৩ লাখ ৩৭ হাজার ছাড়িয়েছে। মালয়েশিয়াতে  প্রায়  ১৯ হাজার স্টার্টআপের মধ্য ইউনিকর্ন বা স্টার্টআপ যাদের বিনিয়োগ ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি তাদের সংখ্যাও বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে এ সংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়ানো সম্ভব হতে পারে বলে ধারণা করা যায়। 

বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো স্টার্টআপ নীতি নেই। তবে শিল্পনীতি ২০২২-এ স্টার্টআপের একটি সংজ্ঞা সংযোজন করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বা বৈদেশিক বাজারে প্রবেশের জন্য নতুন সেবা বা পণ্য সৃষ্টির মাধ্যমে উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন কিন্তু দ্রুত অগ্রগতি ও সর্বোচ্চ মুনাফার সম্ভাবনাসম্পন্ন নতুন ও উদ্ভাবনীমূলক ব্যবসাকে স্টার্টআপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশেও বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মতো বিনিয়োগ হতে পারে যেমন—গুগল, উবার, ফেসবুক ও টুইটার ইত্যাদি।  ইতিমধ্যে কিছু কিছু উদাহরণ তৈরি হয়েছে যাদের দেখে অন্যেরাও উত্সাহী হতে পারে। বাংলাদেশে উদাহরণযোগ্য স্টার্টআপ ব্যবসার আবাসস্থল হতে পারে, যে লক্ষ্যে আরো কাজ করা দরকার। প্রতিভাধর স্টার্টআপগুলোর আইডিয়াসমূহের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ও স্কেলেবিলিটি বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ সহায়তা বিশেষভাবে দরকার। এ খাতে বেশির ভাগই গ্লোবাল অর্থায়ন। উদ্যোক্তা অর্থায়ন করে বিনিয়োজিত অর্থ থেকে লাভবান হওয়ার জন্য, তবে বৈশ্বিক অর্থায়নকে উত্সাহিত করা হলে এ দেশ থেকে টাকা ফেরত নেওয়া একটি বড় সমস্যা এবং এখানকার এক্সিট নীতিতে দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। বাংলাদেশে ব্যবসা নিবন্ধিত একজন উদ্যোক্তাকে তার নিজ দেশে অথবা অন্য দেশে  টাকা ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব এবং নীতিগত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। নিবন্ধন ও অন্যান্য লাইসেন্স প্রাপ্তি বাংলাদেশ একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ডকুমেন্টেসনের প্রয়োজনের কথা তো বলাই বাহুল্য। যেমন—চামড়া খাতে একটি শিল্প স্থাপনে ২৩টিরও বেশি লাইসেন্স বা সার্টিফিকেট এবং ১৯৩টি ডকুমেন্টস দরকার হয়।

এ খাতে আসা উদ্যোগগুলোতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রায় ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশে নিবন্ধিত উদ্যোক্তাদের প্রশাসনিক জটিলতা এবং উদ্যোগ স্থাপনের এসব সমস্যার কারণে অনেক সময় এরা বাংলাদেশের পরিবর্তে সিংগাপুরে নিবন্ধন করতে বেশি আগ্রহী হয়। নিবন্ধন, এক্সিট, রিপাট্রিয়াসন নীতি সহজ করা দরকার।

আইসিটি মন্ত্রণালয় তরুণ প্রজন্মকে উত্সাহিত করতে কাজ করছে এবং ফিনটেক, এন্টারপ্রাইজ সলিউশন, লাইফস্টাইল, লজিস্টিকস, হেলথ টেক, এগ্রিটেক ও এডুটেকের মতো কিছু খাতকে স্টার্টআপের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মন্ত্রণালয় সরকারি তহবিলে গঠিত একটি ‘ফান্ড অব ফান্ড’ (এফওএফ) প্রণয়নের কাজও করছে। নীতিগত বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) ফার্মের উপস্থিতি কম। এফওএফ কার্যকর করতে এ সব ভিসি ফার্মগুলোর কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০০ সালে আইটি ও কৃষি খাতের জন্য ইক্যুইটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনার্স ফান্ড (ইইএফ) নামে একটি তহবিল গঠন করে, এটি একটি সুদমুক্ত তহবিল থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ বিশেষ তহবিল সফলতার মুখ দেখেনি। এফওএফ একটি অনুরূপ তহবিল, যা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের মাধ্যমে বণ্টন করা হবে। এতে ঝুঁকি হ্রাস ও ইক্যুইটি সমর্থনের জন্য ভিসি ফার্মগুলো অংশীদার হিসেবে শেয়ার গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের পিকেএসএফ বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করে, এফওএফের কার্যপ্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে এটি বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশের মধ্যে স্টার্টআপের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা কঠিন। তহবিল সংগ্রহের জন্য বিএসইসি থেকে অনুমতি প্রয়োজন, অন্যদিকে তহবিল সংকট ও সংগ্রহজনিত জটিলতার কারণে দেশে ইক্যুইটি ইনস্ট্রুমেন্টের পরিমাণও কম। এ কারণে ভিসি ফার্মগুলোর অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোক্তা তৈরি ও স্বকর্মসংস্থানকে উত্সাহিত করতে একটি তহবিল তৈরি করেছে, যার নাম ‘স্টার্টআপ ফান্ড’। এটি একটি ঘূর্ণায়মান পুনঃ অর্থায়ন তহবিল, যার পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা। ২০২০ থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে তপশিলভুক্ত ব্যাংকগুলো তাদের বার্ষিক নিট মুনাফার ১ শতাংশ এই তহবিলে জমা দেবে। তবে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এ পর্যন্ত মাত্র ৩৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।

ভারতে এসআইডিবিআই (SIDBI) একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যারা ‘ফান্ড অব ফান্ড’ (এফওএফ) তৈরি করে স্টার্টআপগুলোতে অর্থ বিতরণ করছে। ভারতের বেঙ্গালুরুর সিলিকন ভ্যালি একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ হাব হিসেবে গড়ে উঠেছে, যেখানে অসংখ্য বহুজাতিক করপোরেশন, ৪০০-এর বেশি গ্লোবাল গবেষণা ও উন্নয়নকেন্দ্র, অত্যাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ৪০০০+ স্টার্টআপ রয়েছে (প্রাপ্ত তথ্যমতে)। বাংলাদেশও এমন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে, কারণ উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে দেশের দক্ষ প্রতিভার একটি বড় অংশ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে এবং বিদেশের জিডিপিতে অবদান রাখছে যেটা সে বাংলাদেশেই করতে পারত, যদি সঠিক নীতিমালা দিয়ে তাকে সাহায্য করা যেত।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) ফার্মগুলোকে স্টার্টআপের সঙ্গে যুক্ত করে ফান্ড অব ফান্ডকে (এফওএফ) কার্যকর করা যেতে পারে। এগুলো স্টার্টআপের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে, যাতে উদ্ভাবনী ও অপ্রচলিত প্রকৃতির অন্তর্নিহিত উচ্চ ঝুঁকি থেকে স্টার্টআপগুলো সুরক্ষিত থাকতে পারে। ‘ইয়ং ফোর্টেসের’ মতো উদ্যোগকে নীতি সহায়তা ও অর্থায়ন করে বৈশ্বিক অবস্থান অর্জনে সহায়তা করা যেতে পারে, যা বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করবে।

পোস্ট-এল্ডিসি পর্যায়ে ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি বা আইপি  একটা বড় বিষয় হিসেবে সামনে আসবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে যোগ্য কোম্পানিকে তাদের ডিপিয়াইয়াইটি (DPIIT) বা Department for Promotion of Industry and Internal Trade দ্বারা স্বীকৃতি দেওয়া হয় যাতে তারা কর অব্যাহতির সুযোগ এবং কমপ্লায়েন্স হওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা  পায়। বাংলাদেশে এ ধরনের WTO কমপ্লায়েন্ট সুযোগ ব্যবহারের জন্য তৈরি হতে হবে। স্টার্টআপ-লোগো, পেটেন্ট প্রটেকশন, সহজ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট, সিংগেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, সহজ এক্সিট ইত্যাদি সুযোগ দেওয়া দরকার যাতে আমরা এ ধরনের নতুন সেবা এবং উত্পাদন খাতে আমরা অনেক নতুন স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের দেখতে পাই।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট