ঈদের লম্বা ছুটি এবং এর অল্প কদিন পরই পাহাড়ের বর্ণিল উৎসব বৈসাবি। এ দুটি উৎসবকে সামনে রেখে লাখো পর্যটক বরণে নতুন রূপে সাজানো হয়েছে মেঘের রাজ্য সাজেক এবং খাগড়াছড়ির পর্যটন কেন্দ্রগুলো। পর্যটকদের ভ্রমণ আনন্দময় ও নিরাপদ করতে প্রশাসনও নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।
পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এবার পাশাপাশি দুই উৎসব ঘিরে লক্ষাধিক পর্যটকের সমাগম হবে খাগড়াছড়িতে।
দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট মেঘের রাজ্য সাজেক। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে এর অবস্থান হলেও খাগড়াছড়িই হচ্ছে সাজেকের একমাত্র সহজ সড়ক পথ। ফলে পর্যটকরা একই সাথে খাগড়াছড়ির পর্যটন স্পট ও সাজেক ভ্রমণে আসেন। গেল ফেব্রুয়ারিতে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাজেক ভ্যালির পর্যটন কেন্দ্রের প্রায় ৩৫টি রিসোর্ট, কটেজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এতে ওই রিসোর্ট-কটেজের মালিকরা এক প্রকার নি:স্ব হয়ে গেছে।
তবে সাজেকের ১২৬টি কটেজ-রিসোর্টের মধ্যে প্রায় ৯১টি এখনও অক্ষত রয়েছে। ঈদ ও বৈসাবি উপলক্ষ্যে এসব রিসোর্ট-কটেজসহ হোটেল রেষ্টুরেন্টগুলো পর্যটকদের বরণে এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রয়োজনীয় মেরামত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রং লেপন ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মন বলেন, সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের কারণে কিছু মানুষ মনে করছেন সাজেক পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এটা ভুল ধারণা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারির অগ্নিকান্ডে সাজেকে ১২৬টি রিসোর্টের মধ্যে ৩৫টি রিসোর্ট পুড়ে যায়। বাকি ৯১টি রিসোর্ট অক্ষত আছে। আশা করছি, ঈদের লম্বা ছুটিতে পর্যটকরা সাজেক বেড়াতে আসবে। তাদের বরণে আমরা সব প্রস্তুতি সেরে নিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সাজেকে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার পর্যটক ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের ব্যাপক সাড়া মিলছে। ঈদ উপলক্ষ্যে আগাম বুকিং ভালোই হয়েছে। ইতোমধ্যেই বেশিরভাগ রিসোর্ট ও কটেজ বুকিং হয়ে গেছে।
কুঁড়েঘর রিসোর্টের মালিক হেলাল বলেন, ঈদ উপলক্ষে আমাদের রিসোর্টে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করছি। বর্তমানে সাজেক একটু ফাঁকা থাকলেও, ঈদের সময়ে পর্যটকদের ভিড় বাড়বে বলে আশা করছি। ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের সুবিধার্থে কিছু রিসোর্ট নতুনভাবে সাজানো হয়েছে এবং বিশেষ অফারও রয়েছে। রেস্টুরেন্টের মালিকরা জানায়, প্রত্যেকবারের মতো এবারও সাজেকে পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে।
অন্যদিকে পর্যটকদের আকর্ষণীয় খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রগুলোও ঢেলে সাজানো হয়েছে। সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যময় অহংকার খাগড়াছড়ির আলুটিলা দেশের অন্যতম আকষর্নীয় পর্যটন স্পট। এ পর্যটন কেন্দ্রের অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান প্রাকৃতিক গুহা, এটিকে দেবতার গুহাও বলা হয়ে থাকে।
২৮২ ফুট দৈর্ঘ্যের এ গুহার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে গা ছমছম অনুভূতি জাগে। এখানে রয়েছে আরেক আকষর্নীয় স্পট রিছাং ঝর্ণা। আছে ঝুলন্ত সেতু।
জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রেও এবার ঈদ ও বৈসাবি সামনে রেখে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটন কেন্দ্রের অভ্যন্তরের ফুটওয়ে, ঝুলন্ত সেতুসহ বিভিন্ন স্থাপনার প্রয়োজনীয় মেরামত হয়েছে। স্বাচ্ছন্দে আনন্দ উপভোগের জন্য বিভিন্ন স্থাপনায় রংয়ের কাজসহ পুরো এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়েছে। এছাড়া পর্যটকদের দীর্ঘদিনের পানীয়জলের সমস্যার সমাধানও করা হয়েছে।
এছাড়া খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ পার্ক, আরেক আকর্ষনীয় পর্যটন স্পট হাতিমাথা, দীঘিনালার নয়নাভিরাম তৈদুছড়া ঝর্ণা, মানিকছড়ির ডিসি পার্ক, গুইমারা সরোবর ফুডপার্ক, রামগড়ে ভারত সীমান্তে অপরুপা কলসীমুখ, আঁকাবাঁকা রামগড়-অযোদ্ধা সীমান্ত সড়ক, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু, লেকর্পাক, ঝুলন্ত ব্রীজ, বিজিবি স্মৃতিস্তম্ভ, রামগড় চা বাগানও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে প্রিয় স্থান। তবে ঈদের ছুটি বা বিশেষ উৎসবের ছুটিতে ভ্রমণপিপাসুরা যান্ত্রিক শহরের ক্লান্তি দূর করতে এখানে ছুটে আসেন।
ট্রাইবেল টেক্সটাইল মার্কেটগুলোও তাদের প্রস্তুতি সেরে নিয়েছে। নতুন-নতুন কালেকশনে দোকানগুলো সাজানো হয়েছে। পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে বাড়তি প্রস্তুতি নিয়েছে পরিবহণ, হোটেল-রেষ্টুরেন্টসহ পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার বলেন, এবারের ঈদের ছুটিতে যারা খাগড়াছড়ি আসবে তাদের সময়টা যাতে ভালো কাটে সেই সেবা দিতে আমরা প্রস্তুত আছি। জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র নতুন করে সাজানো হয়েছে। পরিবহণ সংশ্লিষ্টদেরও সতর্ক করা হয়েছে, যেন পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়া এবং কোন প্রকার হয়রানি যাতে না করা হয়। পর্যটকদের কল্যাণে মোবাইল কোর্ট নিয়োজিত থাকবে।’
খাগড়াছড়ি জেলা ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক জাহিদুর রহমান বলেন, ঈদের ছুটিতে প্রতিটি বিনোদনকেন্দ্রে পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারেন তার জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশ ও সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়ন থাকবে। তিন স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। ঈদের আগের দিন, ইদের দিন এবং ইদের পরের দিন সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবে টুরিষ্ট পুলিশ।