ঈদের আনন্দ নেই শহীদ আবু সাঈদের পরিবারে

রংপুরের জুলাই আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যদের মনে ঈদের আনন্দ নেই। তার শোকে স্মৃতিতে ডুবে আছেন পরিবারের সদস্যরা। আবু সাঈদহীন ঈদের আনন্দ যেন শূন্য হয়ে গেছে তাদের জীবনে। এমন শূণ্যতা দৃশ্য পীরগঞ্জের জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামের সেই ছোট্ট মাটির বাড়িতে।  

শহীদ আবু সাঈদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ঈদের ছুটি দিলে বাড়িতে ফিরে আসতেন আবু সাঈদ। সারাদিন ভাগ্নি-ভাতিজাদের সাথে আনন্দে দিন কাটতো। আবু সাঈদের বাড়িতে আসার খবর শুনে ছুটে আসতেন তার বন্ধুরা। তাদের সাথে দিনভর খেলাধুলা ও গল্প-গুজবে সময় কেটে যেত আবু সাঈদের। প্রতিবেশী স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কেউ বাড়িতে আসলে তার লেখাপড়ার খোঁজ খবর নিতেন আবু সাঈদ। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সময় দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন নিজের লেখাপড়াও চালিয়ে যেতেন। প্রতি বছরের মত এবারও ঈদ ঘুরে এলেও এবার আবু সাঈদের সাথে পরিবারের সদস্যদের ঈদের নামাজ পড়া কিংবা ঈদের দিনে একসাথে খাবার খাওয়া আর হবে না।

আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, ভাইকে ছাড়া এবারই প্রথম ঈদ করতে যাচ্ছি। ভাই বাড়িতে আসতো, আনন্দ-উল্লাসে দিন কাটতো। কিন্তু এবারের দিন আমাদের দুঃখ-বেদনার, কান্নার।ছোট ভাই বাড়ির আঙ্গিনায় চিরনিন্দ্রায় শায়িত। ভাইয়ের কবর দেখলেই চোখে পানি চলে আসে। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। প্রতি বছর রমজানে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে ভাই বাসায় চলে আসতো। আবু সাঈদসহ পরিবারের সকল সদস্য মিলে ইফতার করতাম। আজ শনিবার (২৯) মার্চ সকালে ফজরের নামাজের পর আমি, বাবা, ছোট ভাইসহ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কান্না ভেঙ্গে পড়ি। আবু সাঈদসহ চব্বিশের অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের যেন আল্লাহ জান্নাত নছিব করেন। যেসব আহত ভাই রয়েছেন তারা যেন সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন দেশবাসীর এই দোয়া কামনা করছি।

আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হাসান বলেন, ঈদের ছুটিতে আবু সাঈদ আমাদের বোনের বাসায় যেত। ভাগ্নি, ভাতিজাদের নিয়ে তার ভাল সময় কাটতো। তাদের আদর করতো, ঘুরাফিরা করতো, কেনাকাটা করতো। আবু সাঈদের ক্রিকেট পছন্দ ছিল না। ঈদের ছুটিতে আবু সাঈদ বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি থাকলেও সে লেখাপড়ায় সময় দিতো। কিভাবে লেখাপড়া করছে, আগামীতে কিভাবে করবে এসব নিয়ে বাড়িতে বেশি আলাপ-আলোচনা করতো। সেই সাথে বাড়িতে কোন স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কেউ আসলে তাকে লেখাপড়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতো। কিভাবে লেখাপড়া করলে ভাল করা যাবে সেই পরামর্শ দিত। ঈদের সময় নামাজ পড়া হতো বাড়ির পাশে বাবনপুর জামে মসজিদে। আমি, বড় ভাই, বাবা, আবু সাঈদ এক সাথে ঈদের নামাজ পড়তে যেতাম। এখন সেই মসজিদের নাম শহীদ আবু সাঈদ জামে মসজিদ নামকরণ করা হয়েছে। এ মসজিদের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ এসেছে। দ্রুত দৃষ্টিনন্দন মসজিদে তা পরিণত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন পরিবার থেকে আমরা কিছু খরচ দিতাম। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে সে চলতে পারতো না। সেজন্য সে রংপুরে টিউশনী করতো। টিউশনীর টাকা কিছু বাঁচিয়ে ভাগ্নি-ভাতিজাদের ঈদের উপহার হিসেবে কাপড় কিনে দিত।

শহিদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, আবু সাঈদ ঈদের সময় গরুর মাংস, পোলাও, সেমাই খেত। আমার হাতের রান্না তার অত্যন্ত পছন্দের ছিল। ঈদের সময় আবু সাঈদসহ তার ভাই-বোনদের নিয়ে আনন্দে সময় কাটতো। আজ আমার বুকের ধন নেই। একজন মা বোঝে তার সন্তান হারানোর কষ্ট। আমার ছেলেকে আল্লাহ যেন শহীদী মর্যাদা দান করবেন।

আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, আবু সাঈদের জন্য কবরের পাশে শুধু কাদি, আর আল্লাহর কাছে দোয়া করি। এখন সবাই আমার খোঁজ-খবর রাখে। সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। আরও যারা শহীদ হয়েছেন তাদের সকলের জন্য দোয়া করবেন। আমার ছেলে জীবন দিয়ে নতুন স্বাধীনতা এনেছে। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে।  
 
প্রসঙ্গত, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ২০২৪ সালে ১৬ জুলাই দুপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেটের সামনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন।