স্বর্ণ নীতিমালা

ক্ষুদ্র অলংকার ব্যবসায়ীদের কী হবে

g সুশীল মালাকার

 

দেশে স্বর্ণশিল্পের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আনয়ন, উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে সরকার স্বর্ণ নীতিমালা ২০১৮ প্রণয়ন করেছে। ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর এ নীতিমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। নীতিমালার আলোকে জুয়েলারি ব্যবসায় স্বচ্ছতা ও সততা আনয়নের উদ্দেশ্যে জুয়েলারি মালিকদের অপ্রদর্শিত স্বর্ণ ও রৌপ্য বৈধ করে নেওয়ার জন্য ভরিপ্রতি নির্দিষ্ট করারোপ করা হয়েছে। গত ৩০ জুন অপ্রদর্শিত স্বর্ণ ও রৌপ্যের ঘোষণা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। এ ঘোষণায় ১৮ লাখ ভরি স্বর্ণ প্রদর্শন করা হয়েছে। এ থেকে কর আদায় হয়েছে ১৮৩ কোটি টাকা। এর সিংহভাগই বৃহত্ জুয়েলারি দোকান থেকে এসেছে। ঘোষিত এ নীতিমালা বড়ো জুয়েলার্স মালিকদের জন্য যেমন আশীর্বাদ বয়ে এনেছে তেমনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আইনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে ফেলেছে। ক্ষুদ্র জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকার নতুন করে সহজ পন্থা অবলম্বন না করলে ক্ষুদ্র মালিকদের বিলুপ্তি ঘটবে, না হয় তাদের শ্রমিক শ্রেণিতে পরিণত হতে হবে। এটাই মনে করেন অধিকাংশ ক্ষুদ্র জুয়েলার্স মালিকগণ।

যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত অলংকার শিল্প ‘ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প’ হিসেবেই পরিচিত। যুগের চাহিদা অনুসারে এবং গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে শহরে তো বটেই গ্রামেগঞ্জেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা শোরুম খুলতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এসব শোরুমে ৫ থেকে ৫০ ভরি স্বর্ণালংকারের বেশি মজুত নেই। এসব অধিকাংশ দোকান মালিক নিজেই একজন স্বর্ণশ্রমিক। ২/১ জন শ্রমিক অথবা শিক্ষানবিশ নিয়ে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করেন।

বর্তমান স্বর্ণ নীতিমালা অনুযায়ী ছোটো-বড়ো সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স, জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে প্রাপ্ত গোল্ড ডিলিং লাইসেন্স Gold (Procurement, storage and distribution order) 1987, আয়কর নিবন্ধন, ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এছাড়াও মূসক কর্তৃক নির্দিষ্ট ছকে প্রতিমাসে স্বর্ণ ক্রয়-বিক্রয় ও মজুরি থেকে প্রাপ্ত ভ্যাটের হিসাব দাখিল করতে হবে। এসব হিসাব সংরক্ষণের জন্য ক্যাশ-মেমো, ক্রয়-মেমো, অর্ডার-বুক ও স্টক-বুক সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়াও রয়েছে শ্রম আইনের নিবন্ধন। শ্রম আইন সম্পর্কে ক্ষুদ্র জুয়েলারি মালিকদের কোনো ধারণা নেই। কতজন শ্রমিক থাকলে শ্রম আইনের আওতায় ঐ প্রতিষ্ঠান আসবে সে সম্পর্কে কোনো সম্যক জ্ঞান নেই।

মূল্য সংযোজন কর ১৯৯১ এর বিধান অনুসারে স্বর্ণপিণ্ড অথবা স্বর্ণালংকার বিক্রয়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রদান বাধ্যতামূলক। ভোক্তাকেই ভ্যাট দিতে হয়। এই আইনটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নিকট এখনো অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য। কখন কখন এ আইনটি দ্বৈত বা ততোধিক কর-এ পরিণত হচ্ছে। স্বর্ণপিণ্ড ক্রয় করার সময় ভ্যাট দিতে হচ্ছে। সেই স্বর্ণপিণ্ড থেকে কারখানায় অলংকার তৈরির পরে কারখানার মালিককে ভ্যাট প্রদান করতে হয়। পরে সেই অলংকার যখন শোরুম মালিকগণ বিক্রয় করেন তখন স্বর্ণের মূল্য ও মজুরির সঙ্গে ভ্যাটও যোগ করেন। ফলে একজন ভোক্তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩ দফা ভ্যাট প্রদান করতে হয়।

ক্ষুদ্র স্বর্ণালংকার ব্যবসায়ী ও শেরপুর জেলা বাজুস-এর সহসভাপতি মো. শাহজাহান মিয়া জানান, আমাদের ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল কলেজে পড়ুয়া ছাত্রী, গৃহবধূরা ২/১ বছর অন্তরই তাদের অলংকারের ডিজাইন পরিবর্তন করে থাকেন। এদের প্রদত্ত মজুরির ওপরই অধিকাংশ জুয়েলারি দোকান টিকে আছে। পুরাতন সোনার সঙ্গে আরো কিছু পরিমাণ নতুন স্বর্ণ যোগ করে অনেক গ্রাহক অলংকার তৈরি করেন। নতুন ক্রয়কৃত স্বর্ণের মূল্যের ওপর ভ্যাট ক্রেতার নিকট থেকে অবশ্য আদায়যোগ্য। কিন্তু পুরাতন স্বর্ণের ওপর যেন ভ্যাট দিতে না হয়। নচেত্ ভ্যাটের চাপে পুরাতন অলংকার ভেঙে নতুন ডিজাইনের অলংকার তৈরিতে স্বল্প আয়ের ভোক্তাগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এতে গ্রাহক সংখ্যা হ্রাস পাবে। শুধু তাই নয়, স্বর্ণশিল্পীরা নতুন ডিজাইন উদ্ভাবনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি জুয়েলারি দোকানদারের ভ্যাট প্রদান পদ্ধতি সহজতর করার জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। অপরদিকে বর্তমান স্বর্ণ নীতিমালায় স্বর্ণপিণ্ড আমদানির সঙ্গে সঙ্গে অবাধে স্বর্ণালংকার আমদানির সুযোগ দিয়েছেন। স্থানীয় স্বর্ণশিল্পীরা অলংকার আমদানির বিরোধিতা করে বলেন, এর ফলে স্থানীয় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়বেন। বাংলাদেশ স্বর্ণশিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দীনেশ চন্দ্র পাল জানান, বিদেশি অলংকার অবাধে দেশে আমদানি করা হলে দেশের প্রায় ৪ লাখ স্বর্ণশিল্পী বেকার হয়ে পড়বেন।

স্বর্ণের মান প্রণয়ন, যাচাই ও নিয়ন্ত্রণ স্বর্ণ নীতিমালার ৫ নং ধারা ও উপধারাকে অধিকাংশ জুয়েলারি ব্যবসায়ী স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু এর জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর (ল্যাবটেস্ট বা ফায়ারটেস্ট ও হলমার্ক টেস্ট সুবিধাসহ) পরীক্ষাগার স্থাপন করা প্রয়োজন। ব্যক্তিমালিকানায় এর পরীক্ষাগার স্থাপন খুবই ব্যয়সাধ্য। সরকার যদি নিজ উদ্যোগে প্রতিটি জেলায় অন্তত ১টি করে ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে একদিকে যেমন ভোক্তারা প্রতারিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবেন তেমনি অসাধু ব্যবসায়ীরাও সতর্ক হতে বাধ্য হবেন।