অরণ্যের অরাজকতা যেন মাথাচাড়া না দেয়

ভারতীয় উপমহাদেশের ইউরোপীয় তথা ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের ক্ষেত্রে লর্ড ম্যাকলের বিশেষ ভূমিকা রহিয়াছে। আইনের ক্ষেত্রেও তাহার একটি বিশেষ ভাবনা ছিল। তিনি মনে করিতেন যে—একটি সাধারণ, স্পষ্ট এবং অভিন্ন আইনি ব্যবস্থা ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়, যাহাতে প্রশাসন পরিচালনা সহজ হয় এবং ঔপনিবেশিক শাসন মজবুত হয় । তাহার এই দণ্ডবিধির খসড়ার উপর ভিত্তি করিয়াই বর্তমান ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের দণ্ডবিধি গঠিত হইয়াছে । আমরা যেমন প্রাকৃতিক নিয়ম স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুধাবন করিতে পারি, তেমনি লর্ড ম্যাকলে মনে করিতেন, আইন হইবে এই রকম যে, ইহাকে বুঝিতে কাউকে বিশেষ কোনো জ্ঞানের অধিকারী হইতে হইবে না । অর্থাৎ আইন বিধি স্বয়ং সহজভাবে সকলের নিকট প্রতিভাত হইবে ।

তবে উপমহাদেশ তথা পিছাইয়া পড়া দেশসমূহে বর্তমানে যেই চিত্র দেখা যায়, তাহাতে মনে হয়, অধিকাংশ সাধারণ মানুষের নিকট আইন যেন ভিনগ্রহের কোনো নিয়ম । ইহা তাহারা জানে না, বোঝে না এবং অবশ্যই—মানে না। কোথাও যদি কোনো উচ্ছৃঙ্খল জনতা তথা মব কাউকে পিটাইতে থাকে, যাহা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, দেখা যাইবে ইহাদের মধ্যে অনেকেই সেই নৃশংস ঘটনার ভিডিও করিতেছে। ভিডিও করা হইতেছে দেখিয়াও এই মব ভায়োলেন্সকারী জনতা তাহাদের অপরাধকর্ম হইতে পিছাইয়া আসে না। তাহারা জানে যে, এই ভিডিওর মাধ্যমে তাহাদের অপরাধ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইবে, তাহার পরও উচ্ছৃঙ্খল জনতা আইন নিজের হাতে তুলিয়া নেয় ।

ইহার কারণ কী? আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা? নাকি আইনের গুরুত্ব বুঝিতে না পারা? অনেকে মনে করেন, আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা তৃতীয় বিশ্বের একটি বড় সংকট। লর্ড ম্যাকলে যেই স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, তাহা ছিল এক সহজবোধ্য, সুস্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা, যাহাতে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করা সহজ হয়; কিন্তু দুঃখের বিষয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে এই ধারণা এখনো বাস্তবায়িত হইতে পারে নাই। যেই কারণে আইন অমান্যের দৃশ্য সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয় । আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকিবার অন্যতম কারণ হইল, সাধারণ জনগণের মধ্যে আইনি সচেতনতার অভাব। ম্যাকলে মনে করিতেন, আইন হওয়া উচিত এমন যে, ইহা সকলের নিকট সহজবোধ্য হইবে; কিন্তু বাস্তবতা হইল, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই আইনের ভাষা দুর্বোধ্য, আদালতের কার্যক্রম জটিল এবং বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতিতে আবৃত। ফলে সাধারণ মানুষ আইন মানিবার চাইতে ইহাকে পাশ কাটাইবার পথ খোঁজে। দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগের অসামঞ্জস্যতাও আইনের প্রতি অনাস্থার জন্ম দেয়। আইন সকলের জন্য সমান হওয়া উচিত; কিন্তু বাস্তবে তৃতীয় বিশ্বে বহু ক্ষেত্রে ইহার ভিন্নতা দেখা যায় ।

দুর্ভাগ্যের বিষয় হইল, তৃতীয় বিশ্বের দেশে ন্যায়বিচারের অভাব থাকিবার কারণে জনগণ নিজেরাই ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব লইতে চাহে, ফলে গণপিটুনি বা জনতার আদালত গঠিত হয়; কিন্তু তাহাতে সমাজে দেখা দেয় ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা, প্রতিষ্ঠা পায় অরণ্যের অরাজকতা । প্রশ্ন হইল, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে কীরূপে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ফিরাইয়া আনা যায়? প্রথমত, আইনের প্রচার ও সহজবোধ্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন । দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়াই আইন সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান প্রদান করিতে হইবে, যাহাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আইনের গুরুত্ব অনুধাবন করিতে সক্ষম হয়।

মনে রাখিতে হইবে, আইন কেবল একটি শাসনব্যবস্থার কাঠামো নহে; ইহা একটি জাতির নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলন। আইনকে সম্মান না করিলে, সমাজে স্থিতিশীলতা থাকিবে না। তৃতীয় বিশ্বে অরণ্যের অরাজকতা মাথাচাড়া দিলে তাহাকে একসময় আর সহজে সামলানো যায় না । ইহা যেন বোতলবন্দি দৈত্যকে বোতলমুক্ত করা, যাহাকে চাহিলেও আর সহজে বোতলে ভরা যায় না ।