টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার সংরক্ষিত শাল-গজারি ও উডলট বাগানে স্থানীয়দের দেওয়া আগুনে পুড়ে ধ্বংস হচ্ছে বনাঞ্চল। এতে নানা প্রজাতির লতাগুল্ম পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। হুমকির মুখে সরকারের টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্প। গত এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে এমন ক্ষতিকর ও ভয়ানক চিত্র। স্থানীয় বন বিভাগ মাইকিং করেও বনে অগ্নিসংযোগ থামাতে পারছে না।
সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্র বলেছে, সরকারের টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের আওতায় সখীপুরের ৭২০ হেক্টর বনভূমিতে আমলকী, লটকন, হরীতকী, নিম, বহেড়া, গর্জন, চিকরাশি, গাদিলা, পিতরাজ, সোনালু, জলপাই, মহুয়া, কাঠবাদাম, গামার, শিমুল, ছাতিয়া, বেল, তেঁতুল, অর্জুনসহ ফলদ ও ঔষধি গাছের ৪২ প্রজাতির ১০ লাখ ৮০ হাজার চারা রোপণ করেছিল বন বিভাগ। তবে যেসব বনে আগুন দেওয়া হচ্ছে, ঐ অংশে প্রকল্পের চারা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে বনের ভেতর বানর, বেজি, বাগডাশ, হনু বিড়াল, কাঠবিড়ালী, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী, চিল, শালিক, ঘুঘুসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং গুইসাপ, শঙ্খচূড় বা রাজগোখরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ মারা পড়ছে, হারিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ বাসস্থান। বানরগুলো মাঝেমধ্যে লোকালয়ে চলে আসছে।
সম্প্রতি সখীপুর বন বিভাগের দেওবাড়ী, কালমেঘা, বাজাইল বিট কার্যালয় সংলগ্ন এলাকা, তক্তারচালা, নলুয়া, বহেড়াতৈল, কচুয়া, কাকড়াজান, এমএম চালা, বড়চওনা ও মরিচা এলাকার কয়েকটি সংরক্ষিত বন ঘুরে আগুন দেওয়ার চিত্র দেখা গেছে।
বন বিভাগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার হতেয়া, বহেড়াতৈল ও বাঁশতৈল (অংশ) রেঞ্জের ১১টি বিটের অধীনে সখীপুরে ২৮ হাজার ৫৯৪ দশমিক ৫২ একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ একর জমিতে শাল-গজারির সংরক্ষিত বন। বন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১ হাজার ৭৮০ একর বনভূমিতে টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার ফলদ এবং ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাতাঝরার বা শুষ্ক মৌসুম এলেই স্থানীয়রা বনে আগুন দেয়। ছোট ছোট গাছগুলো পুড়ে যাওয়ার পর তা সংগ্রহ করে রান্নার কাজে ব্যবহার করাই আগুন দেওয়ার অন্যতম কারণ।
দেওবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা শাহাদত হোসেন বলেন, চৈত্র-বৈশাখ মাসে যখন গজারিগাছের সব পাতা ঝরে পড়ে, তখন ঝোপঝাড় পোকামাকড় থেকে রক্ষা পেতে এলাকাবাসী পাতায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে বনের ভেতরে থাকা সব লতাপাতা পুড়ে পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রতি বছর বনে এভাবে আগুন দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে সখীপুর উপজেলার হাতিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রহিজ উদ্দিন বলেন, বনে আগুন দেওয়ার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে হুমকির মুখে পড়েছে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য। ফলে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বহু উপকারী কীটপতঙ্গ মারা যাচ্ছে। এতে করে বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তিনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য আগুন দিয়ে লাকড়ি কুড়ানোর প্রচলিত অভ্যাস বাদ দিতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বন বিভাগের বহেড়াতৈল রেঞ্জ কর্মকর্তা এমরান আলী বলেন, শুকনা মৌসুমে বনে আগুন দেওয়া একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে এলাকাবাসীকে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার পরও কিছু মানুষ রাতের অন্ধকারে বনে আগুন দিয়ে দ্রুত চম্পট দেয়। এসব দুষ্কৃতকারীকে ধরতে এবং বাগানের ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা রক্ষায় বিভিন্ন এলাকায় পাহারাদারের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সখীপুর উপজেলার বনায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আবদুল্লাহ আল রনী বলেন, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে যাতে বনে কেউ রাতে কিংবা দিনে আগুন না দিতে পারে, সে লক্ষ্যে এলাকাবাসীকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।