ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারণায় বলেছিলেন যে, তিনি ক্ষমতায় গেলে ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন। ক্ষমতায় এসেই তিনি সেই প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করেন। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপ বা সরাসরি কথা বলেছেন। দুই দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতি না হলে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসবে। কিন্তু কেন তিনি এমন উদ্বিগ্ন? এর পেছনে নানা কারণ জানাতেই এই প্রতিবেদন।
স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা!
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়েছিল আমেরিকা। তার বিনিময়ে ইউক্রেনের অর্ধেক খনিজের পর এবার ইউরোপে গ্যাস সরবরাহকারী রাশিয়ার পাইপলাইনের অধিকার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র । গ্যাস পাইপলাইনের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে হবে আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স করপোরেশনের হাতে। ইউক্রেনের অর্থনীতির দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই গ্যাস পাইপলাইন, যা রাশিয়ার সুধজা শহর থেকে ইউক্রেনের উজহোরোদ শহরের মধ্য দিয়ে স্লোভাকিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। সোভিয়েত যুগে নির্মিত হওয়া এই গ্যাস পাইপলাইন পাড়ি দিয়েছে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার পথ। ইউক্রেনের অর্থনীতি তো বটেই, ইউরোপের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহের পথ এটি। দীর্ঘ বছর ধরে এর মাধ্যমে কোটি কোটি অর্থ উপার্জন করেছে ইউক্রেন ও রাশিয়া দুই দেশ। কিয়েভের সেন্টার ফর ইকোনমিক স্ট্র্যাটেজির শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ভলোদিমির লানদা বলেন, 'আমেরিকা চাইছে, যতটা সম্ভব আদায় করে নিতে। তবে এই ঔপনিবেশিক চাপ কিয়েভের পক্ষে মানা সম্ভব নয়।'
খনিজ সম্পদের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন। বৃহস্পতিবার দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে, যার লক্ষ্য হলো ইউক্রেন পুনর্গঠনে একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠন করা। ইউক্রেন সরকারের প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিলের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা তাদের লক্ষ্য। এর বিস্তারিত জানা না গেলেও জানা গেছে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের খনিজ ছাড়াও সমঝোতাটি হবে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো এবং তেল গ্যাস পর্যন্ত বিস্তৃত। ইউক্রেনের আলোচকরা সামরিক সহায়তার বিনিময়ে ট্রাম্প যে অর্থ ফেরত দাবি করছেন, সেটি ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তবে তারা এই দাবি মানছে যে, এটি যুদ্ধ অবসানের পর দেশ পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। ইউক্রেন সরকারের স্মারকে বলা হয়েছে, 'একটি মুক্ত সার্বভৌম ও নিরাপদ ইউক্রেনে আমেরিকান জনগণের বিনিয়োগ আকাঙ্ক্ষা রয়েছে'।
জেলেনস্কি চুক্তির বিনিময়ে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আশা করছেন। ইউরোপীয় নেতাদের এক বৈঠকে গত মাসে তিনি বলেছেন 'নিরাপত্তা গ্যারান্টি ছাড়া একটি যুদ্ধবিরতি ইউক্রেনের জন্য বিপজ্জনক হবে'। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার বিষয়টিতে একমত নয়। হোয়াইট হাউজ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি রাশিয়াকে নতুন আগ্রাসন থেকে বিরত রাখবে।
ভূখণ্ড দখল করতেই যুদ্ধবিরতিতে বিলম্ব ঘটাচ্ছে রাশিয়া!
ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন কিন্তু রাশিয়ার হামলাও অব্যাহত রয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও সামরিক সহায়তাও আগের মতো নেই। ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে সমর্থন জানালেও সেটা যথেষ্ট নয়। ফলে ইউক্রেন এখন উভয় সংকটে পড়েছে। রাশিয়া একের পর এক হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে নিচ্ছে। এর আগে ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে। পরে সেখানে গণভোটের মাধ্যমে ক্রিমিয়া রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। রাশিয়ান বাহিনী ধীরগতিতে হলেও ক্রমান্বয়ে দেশটির পূর্বাঞ্চলে অগ্রসর হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন যে কোনো সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির জন্য কয়েকটি শর্ত দিয়েছেন। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হলে আদতে 'ইউক্রেনের ভূখণ্ড' হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্রিমিয়ার রুশ দখলদারিত্বকে মেনে নিতে পারে আমেরিকা। শুক্রবার এই ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
ওয়াশিংটন, ডিসিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ)-এর সংগৃহীত প্রমাণ অনুসারে, রাশিয়ান বাহিনী ২০২৪ সালে ইউক্রেনের ৪ হাজার ১৬৮ বর্গ কিলোমিটার জমি দখল করেছে, যা ভারত মহাসাগরীয় দেশ মরিশাসের দ্বিগুণ এবং নিউ ইয়র্ক সিটির আয়তনের পাঁচ গুণ। রাশিয়া বারবারই বলে আসছে যে, দখল করা ভূখণ্ড তাদেরই। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত কিছু ভূমির বিনিময়ে ইউক্রেনের পূর্ব এবং দক্ষিণাঞ্চলে রাশিয়ার দখল করা এলাকাগুলো বিনিময় করা যেতে পারে। তবে ক্রেমলিন তৎক্ষণাৎ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। গত আগষ্টে ইউক্রেন রাশিয়ার কিছু এলাকা দখল করে। কিন্তু এর পরই রাশিয়া পালটা হামলা চালিয়ে এর অনেকটা অংশ দখল করে। রাশিয়া এখন হামলা জোরালো করেছে, বিভিন্ন এলাকা দখল করছে।
বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, রাশিয়া কৌসুলি ভূমিকা নিচ্ছে। ইউক্রেনের বেশি ভূখণ্ড দখল এবং নিজ এলাকা কিয়েভের সৈন্যকে তাড়িয়ে দিতে পারলে চুক্তির সময়ে খুব ভালো দরকষাকষি করতে পারে। আর সেজন্য যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বিলম্ব হবে, তা রাশিয়ার জন্য সুফল বয়ে আনবে।