অয়েজুল হক
বহু চিন্তাভাবনা করে শেষপর্যন্ত জামালের ফাইনাল সিদ্ধান্ত—বেকার জীবন আর রাখবে না। শুনে বাল্যবন্ধু হারুন অনুনয়-বিনয় করছে, ‘দেখ আমিও তো বেকার, তাই বলে মরে যাব?’
জামাল কিছুটা অবাক হয়। অবাক হলে তার কপালের চামড়ায় কতগুলো ভাঁজ পড়ে ভাঙাচোরা রাস্তার মতো।
—মরে যাব মানে?
—ওই যে বললি বেকার জীবন আর রাখবি না।
—হ্যাঁ। রাখব না। বেকার থেকে কর্মজীবী হব। তাহলে কী বেকার জীবন রাখা হলো?
—না, তয় জীবন তো একটাই।
—ছাগল কোথাকার! শোন, চাকরি কপালে নাই। প্ল্যান করছি নিজেরাই কিছু করব।
হারুন খুশি হলো। তারও কিছু করা দরকার। জামালের প্ল্যান মতো ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল খুলে কাজ শুরু করল। যেখানে যত সিরিয়াস নারকীয় ঘটনা, সেখানে তাদের ততোধিক দৌড়ঝাঁপ। ভাইরাল হওয়া নির্ভর করে ঘটনার নিখুঁত ছবি, ভিডিওর ওপর। এ কাজে জামাল খুবই পারদর্শী, মৃতের হাড়গোড় পেরিয়ে ছবি তোলে। তবে হারুন কিছুটা নার্ভাস থাকে, মাঝেমধ্যে বলে, ‘আগুনের ভেতর ঢুকে পড়তে বা থ্যাতলানো মানুষ দেখে তোর বুক কাঁপে না?’
উত্তরে জামাল গুনগুন করে গান গায়, ‘আহা নরকে বসিয়া, ওরে আমি ছবি তুলি হাসিয়া!’
সেলিব্রেটি হতে দেরি লাগে না তাদের। ইউটিউব চ্যানেল থেকে ডলার আসে! ডলারের সঙ্গে সঙ্গে ছোটাছুটির পরিমাণও বেড়ে যায় ।
সেদিন ছোটাছুটির এক পর্যায়ে সালেক বুড়োর সঙ্গে দেখা হলো তাদের। দেখার সঙ্গে সঙ্গে খেঁকিয়ে ওঠেন। দেখার সঙ্গে খেঁকার মিল আছে ঠিক, কিন্তু ছালেক বুড়োর সঙ্গে তাদের কোনো শত্রুতা নেই।
—এই যে, সারাদিন দেখি ক্যামেরা আর একটা ছাগল নিয়ে টো-টো কর। তুমার কামডা কী শুনি?
হারুনের ইচ্ছে করে এক ঘুষিতে সালেকের সামনের দাঁতগুলো ফেলে দিতে। দুঃখের বিষয় বুড়োর সামনের দাঁত নেই।
জামাল মুখে হাসি নিয়ে বলল, ‘ছবি আপলোড করি।’
—আপলোড আর যে লোডই হোক, বিপদের সময় মাইনষের সাহায্য না কইরা এইসব লোডানো ফোডানো কিন্তু ভালো কাম না।
জামাল খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলল, ‘কী যে বলেন! কাকা মাইন্ড কইরেন না, ছবি তোলার জন্যই তো আমার চ্যানেল। এত লাইক, কমেন্ট, ভক্ত, ফলোয়ার। ছবি না তুলি কী করে?’
সালেক বুড়ো চ্যানেল শব্দটা শুনে বেসুরে গলায় বলল, ‘তোমার চ্যানেল মানে?’
—আর্জেন্ট নিউজ ডিডি। নাম শোনেননি?
—চ্যানেলের কি শেষ আছে! তয় ডিডিটা কেমুন যেন লাগে।
—ডিডি হলো ডেলিভিশন দুনিয়া।
সালেক বুড়ো কিছুক্ষণ ভাবল—ডি থেকে ডিশ অ্যান্টেনা, ডেভেলপমেন্ট, ডাইনিং, ড্রেস, ডেলিভারি....। কূলকিনারা না পেয়ে বলল, ‘জীবনভর অনেক কিছু শুনছি। ডেলিভিশন কী? আমার সাথে মশকরা কর?’
—রাগেন ক্যান চাচা? টেলিভিশন শোনেননি?
—হ, শুনছি।
—টেলিভিশনের আপডেট ভার্সন হলো ডেলিভিশন।
—তা এই ভার্সন কে বাইর করছে?
—আমি চাচা, আমি। জামাল।
সালেক বুড়ো ফোকলা দাঁতে হাসেন।
রাস্তায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটল। আজকাল অনেকটা ব্যাট বলের লড়াইয়ের মতো বাস-ট্রাকের লড়াই শুরু হয়েছে। আর সে লড়াইয়ে বলির পাঠা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। শুনেই বাইক নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলো জামাল ও হারুন। বাসের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে দিয়েছে ট্রাক। রক্ত, লাশ। আহত, নিহত। কান্না, আর্তনাদ। ভিড় ঠেলে ক্যামেরা হাতে এগিয়ে যায় জামাল। বুঝা যায় না—মানুষ না উট! উট লম্বা গলা উঁচিয়ে ছোটে, জামাল লম্বা হাতে মোবাইল উঁচিয়ে। জামাল যে একা সেটাও নয়, পাতি সেলিব্রেটি, পাতি চ্যানেলের বেশকিছু মানুষও আছে।
আহতদের দ্রুত সরিয়ে নিতে অ্যাম্বু্বুলেন্সের সঙ্গে আসা একজন জামালকে বলল, ‘ভাই, প্লিজ! কাজে ব্যাঘাত হচ্ছে, এখানে কেউ দাঁড়াবেন না।’ জামাল লোকটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ইস! বড় মানব দরদি সেজেছে। আর মুখে বলল, ‘পাঁচ মিনিটের একটা ভিডিও করে চলে যাব।’
লোকটা চলে যায়। যাওয়ার সময় মহান গোছের একটা ভাব নেয়। জামালের হাসি আসে। লাশ, রক্ত, ছিন্নভিন্ন দেহের সামনে হাসি এলেও হাসা অনুচিত। ভিডিও করার সময় কাজে ব্যাঘাত ঘটায় হারুন।
—জামাল।
—হুঁ। বলে ফেল।
—আমার মাথা ঘুরছে। সহ্য করতে পারছি না। বেহুঁশ হয়ে যাব কিন্তু।
—কী বলিস!
—হ্যাঁ, এসব দেখা যায় না, কী মর্মান্তিক!
—এসব মর্মান্তিকের ভেতরই লুকিয়ে আছে ডলার, সেলিব্রেটি...
কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা ক্ষত-বিক্ষত দেহের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে হারুন। কয়েক মিনিটের ভেতর তাকে লাশের সঙ্গে গাড়িতে টেনেটুনে ওঠানো হলো। জামাল মনে মনে ভাবল, ওর শাস্তি হওয়া দরকার। লাশ দেখে ভয় পায়! যা এখন লাশের সাথে মিলেমিশে থাক।
ভিডিও শেষ করে বাইকে উঠল। বাড়ি গিয়ে দ্রুত আপলোড দিতে হবে। বাইক কখন রাস্তা ছেড়ে একেবারে খাদের কিনারে এসেছে সেলিব্রেটি আর হারুনের হাস্যকর ঘটনায় খেয়াল করতে পারেনি। গতি কমাতে পারে না। মুহূর্তেই বাইক নিয়ে রাস্তা রেখে অনেকটা শুটিং স্টাইলে বিশ হাত নিচের ডোবার ভেতর উড়ে গিয়ে পড়ে। নিচে পড়তেই অনুধাবন করল, অবস্থা বেগতিক! হাত-পা, মাজার হাড়গোড় এদিক সেদিক উল্টে পাল্টে গেছে। বিকট শব্দ, বিকট চিত্কারে আশপাশের মানুষ ছুটে এল। অধিকাংশ মানুষ ক্যামেরা হাতে ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
জামালের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মনে মনে ভাবছে, এরা কি মানুষ! মানুষ না আবার জন্তুও না। তারচেয়েও খারাপ। বিড়বিড় করে ঠোঁট নেড়ে বলল, ‘আহা! তোরা নরকে ডুবিয়া মানুষের কষ্ট গেলি ভুলিয়া!’