রুবেল কান্তি নাথ
সকালে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলাম কে জানে! যদি হাতের কাছে এই মুহূর্তে বাছাধনকে পেতাম, তাহলে জোরসে জড়িয়ে ধরে চকাস্ করে ওর গালে কয়েকটা চুমু খেতাম।
আহা, কী মধুর সুরই না কানে বর্ষিত হচ্ছে! আমার আশপাশে এখন যদি কোনো সারমেয় থাকত, তাহলে সে গানের তালে বেতাল হয়ে মোতালেব ভাইকে খিঁচে দাবড়ানি দিত।
বেচারা আর গান খুঁজে পেল না। এমন বিতিক্কিছিরি ভাষার গান তিনি কোথা থেকে শুনেছেন বা পেয়েছেন, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। এত বকবক না করে এবার আসল ঘটনা বয়ান করা যাক।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে বাড়ির বাইরে বেরোতেই মোতালেব ভাইয়ের বেসুরে গানের সুরে আমার হার্টফেল করার দশা হলো। তিনি গলা যথাসম্ভব উঁচু করে গাইছেন, ‘ব্লক কইরা দিমু তোরে, ব্লক কইরা দিমু।’
কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, এই অদ্ভুত গান আপনি কোথায় পেলেন? এবং এর মাহাত্ম্যটাই বা কী?’
ভাই আঁতেলের মতো গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘আরে ভাই, এই দেশে বাস করেন আর এই দেশের গানের খবরই রাখেন না! আপনেরে তো জ্ঞানী মানুষ বলে মনে অয়। কিন্তু এখন তো দেখতাছি, আপনি একটা গ আকার গা ধ আকার ধা!’
সকালবেলাতেই কারো মুখে যদি আপনি ‘গাধা’র মতো মধুর সম্ভাষণ শোনেন, তাহলে হয়তো সম্ভাষণকারীর পিঠের ওপর টি-টোয়েন্টির চার-ছক্কার সুনামি বইয়ে দিতেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনার বদলে আমি-ই যেহেতু পরিস্থিতির শিকার, সেহেতু মুখ বুঁজে হজম করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। আমাদের খুব পছন্দের মোতালেব ভাই বলে কথা।
আপনারা তো জানেনই যে, ভাইটার মনে কোনো প্যাঁচট্যাচ নেই। তিনি যা বলেন, সরাসরি বলে দেন। এ ধরনের মানুষেরা সহজ-সরল এবং ভালো মনের অধিকারী হয়ে থাকেন। শয়তানরা স্পষ্টবাদী নয়। তাদের মনে জিলাপির প্যাঁচ।
যাই হোক, ভাইকে বললাম, ‘আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন। এ সম্পর্কে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। দয়া করে যদি আমার প্রশ্নের জবাব দিতেন।’
ভাইয়ের মন হয়তো কিছুটা হলেও গলাতে পেরেছি। তিনি কেশে গলা পরিষ্কার করে বলতে লাগলেন, ‘গানটা একসময়কার বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় ভিলেন ডিপজল মামুর গান। যদিও তার গানটা ছিল—পুঁত কইরা দিমু তোরে, পুঁত কইরা দিমু।’
‘এই সাতসকালে হঠাত্ করে পুঁত কইরা দিমু থুড়ি, ব্লক কইরা দিমু—এই গান গাওয়ার মানেটা কী?’
‘আসলে গতকাল রাইতে এক মাইয়ার লগে মেসেঞ্জারে কুতকুত খেলছিলাম। না মানে, চ্যাট করছিলাম আর কি। অনেক লুতুপুতু আলাপও করছি। কিন্তু সকাল হইতেই দেখি মাইয়া আমারে আর চিনে না। রাইতের মতো আর পাত্তাও দেয় না। এমনকি রাইতে ‘জানু’ও ডাকছিল!’
‘এ আর এমনকি, তেত্রিশ কোটি দেবতাও নাকি নারীর মন সম্পর্কে জানেন না। সেখানে আমি আর আপনি তো কোন ছার!’
‘হ ভাই, এতক্ষণে আপনে একটা জ্ঞানীর মতো কথা কইছেন। আপনেরে গাধা বলাটা আমার উচিত হয় নাই। আপনি আসলে একটা পাঁঠা।’
‘মানে? এসব কী আবোল-তাবোল বকছেন, ভাই। সকালবেলাতেই কি ভাবি সাহেবা আপনাকে ঝাড়ু থেরাপি দিয়েছেন?’
‘আপনে তো ভাই মান-ইজ্জতের বারোটা বাজাই দিবেন দেখছি। লোকে শুনলে কইব, ঘরের কথা পরে জানল কেমনে! বাদ দেন, আসলে ওই মাইয়া ইতং-বিতং করছে দেইখা মাথাটা গরম হইয়া গেছে। তাই আর কি!’
‘তাই কি এই ভয়ংকর গানের ভূত মাথায় চেপেছে আপনার?’
‘হ, রুবেল ভাই। গান গাইয়া মনটারে একটু সান্ত্বনা দিতাছি। গানের সুরে সুরে মাইয়াটারে বুঝাইবার চাইতাছি, আমার লগে ইতং-বিতং করলে, আমি তারে সোজা ব্লক দিবার পারি।’
এই পরিস্থিতিতে আর কথা বাড়ানো সমীচীন বলে মনে হলো না। তাই মুখে অদৃশ্য স্কচ টেপ সাঁটালাম।
মুহূর্তমাত্র দেরি না করে মোতালেব ভাই গানটা গাইতে গাইতে সামনের দিকে পা বাড়ালেন। তাঁর গানের কথাগুলো এতক্ষণে এসে আমার কানে মধু বর্ষণ করতে লাগল। তাঁর মতো আমারও গাইতে ইচ্ছে করছিল, ‘ব্লক কইরা দিমু তোরে, ব্লক কইরা দিমু!’
কারণ গত রাতে আমিও মোতালেব ভাইয়ের মতো মেয়েরূপী এক ছেলের ফেক আইডির কাছে ধরা খেয়েছি!