বাস্তুহারা শঙ্করী দাসীরা এখন কোথায় যাবেন!

ব্রিটিশ আমল থেকেই একখণ্ড ভিটে-মাটিতে ভানু রায়ের বসবাস। মায়ের পর সেখানে ঠাঁই হয় শঙ্করী দাসীর (৭৯)। স্বামী-সন্তান, নাতি-নাতনি মিলিয়ে ৯ সদস্যের পরিবার নিয়ে শঙ্করী দাসী সেখানেই বসবাস করছিলেন। তবে ভূমি খেকোদের নজর পড়ায় ভেঙে ফেলা হয়েছে শঙ্করী দাসীদের ঘরবাড়ি।

উচ্ছেদ করা হয়েছে শত বছরের সেই পুড়নো ভিটে থেকে। মাথাগোঁজার ঠাঁই হারিয়ে শঙ্করী দাসীর এখন জায়গা হয়েছে গ্রামের পাকা সড়কে। ভূমি খেকোদের আগ্রাসনে শুধু যে শঙ্করী দাসীই এভাবে পথে বসেছেন তা নয়। আকবর আলীও স্ত্রী আর দুই মেয়ে নিয়ে সড়কে তাঁবু টাঙিয়েছেন। ভুক্তভোগী শঙ্করী দাসী ও আকবর আলীর বাড়ি নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা ইউনিয়নের গজেন্দ্র চাপিলা গ্রামে। যোগেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাসের সেই রেকর্ডীয় ভিটাতেই তারা দশকের পর দশক ধরে বসবাস করছিলেন।

শঙ্করী দাসী ইত্তেফাককে জানান, নিজেদের না হলেও ১৯ শতাংশের ওই ভিটায় তারা ব্রিটিশ আমল থেকে বসবাস করছিলেন। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে যোগেন্দ্র চন্দ্র বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেও থেকে যান তার মা ভানু রায়। নব্বইয়ের দশকে তারা ১৯ শতাংশের ৯ শতাংশ জায়গা দেন ভূমিহীন আকবর আলীকে। সেই থেকে তারা হিন্দু-মুসলিম পরিবার দুটো মিলেমিশে এক ভিটেয় বসবাস করছিলেন। একই গ্রামের সোভাজান নামের এক নারীর দায়ের করা উচ্ছেদ মামলায় আদালতের আদেশের কথা বলে বিনা নোটিশে ২৩ এপ্রিল তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। তড়িঘড়ি করে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চারটি থাকার ঘর, টয়লেট ও টিউবওয়েল। উচ্ছেদের পর থেকে দুই পরিবারের বৃদ্ধ, নারী-শিশুসহ ১৪ সদস্য বাস করছেন গ্রামের পাকা সড়কে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও চাপিলা ইউনিয়ন ভূমি অফিস জানিয়েছে, গজেন্দ্র চাপিলা মৌজার আরএস ৫৭ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ১৪২ নম্বর দাগের ২.১ একর জমির মালিক পার্শ্ববর্তী সিংড়া উপজেলার কলম গ্রামের যোগেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস। তবে ওই সময় থেকেই এই জমিটিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন ভানু রায়। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব শুরু হলে যোগেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস সপরিবারে ভারতে চলে যান। ফলে সর্বশেষ ১৯৭২ সালের ভূমি রেকর্ড অনুযায়ী ১.৩৫ একর জমি অর্পিত হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়। ১৯৮৯ সালে ১.৩৫ একরের মধ্যে ভানু রায়ের নামে ১০ শতাংশ, আকবর আলীর নামে ৯ ও স্থানীয় মকসেদ আলীর নামে ২৫ শতাংশসহ মোট ৪৪ শতাংশ জমি লিজ দেয় সরকার।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, মূলত অর্পিত সম্পত্তিতে বসবাস করা দুটি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হলেও এ ব্যাপারে তারা কোনো নোটিশ বা আদেশ পাননি। অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত করতে তারা আদালতে কোনো প্রতিবেদনও দাখিল করেননি। ফলে কাগজপত্র অনুযায়ী উচ্ছেদের শিকার পরিবার দুটির নামেই এখনো ওই জমির লিজ বহাল রয়েছে।

ভুক্তভোগী আকবর আলী বলেন, ১৯৭৪ সালে ৯৭৪ নম্বর দলিলে যোগেন্দ্র চন্দ্রের ওয়ারিশদের কাছ থেকে ৪৪ শতাংশ জমি সোভাজানের নামে ক্রয়ের দাবি করা হচ্ছে। অথচ তার এবং ভানু রায়ের সঙ্গে সোভাজানের স্বামী মকসেদ আলীও ১৯৮৯ সালে ২৫ শতাংশ জমি লিজ নিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, যোগেন্দ্র চন্দ্র সপরিবারে ভারতে যাওয়ায় জমিটি অর্পিত হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। অথচ সেই জমি ক্রয়ের দলিল দেখানো হচ্ছে। মূলত এসব কাগজপত্র তৈরিতে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন সোভাজানের ছেলে আবু হানিফ। সত্য গোপন করে বিনা নোটিশে তাদের উচ্ছেদ করেছেন। তিনি এই জালিয়াতির বিচার দাবি করেন।

চাপিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, যে ভিটা থেকে দুটি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, এই জমিটি অর্পিত সম্পত্তি (ভিপি) হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছে। জমিটি অবমুক্ত না করে এবং সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নোটিশ প্রদান না করে দুই পরিবারকে কিভাবে উচ্ছেদ করা হলো, তা তার বোধগম্য নয়।

এদিকে কোনো নোটিশ ছাড়া ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে উচ্ছেদের ঘটনায় ঝর্ণা রানী বাদী হয়ে সাভাজান বিবির ৫ পুত্রসহ ৬জনকে অভিযুক্ত করে সোমবার রাতে গুরুদাসপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

ঝর্ণা রানী ইত্তেফাককে বলেন, কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই অচমকা ২৩ এপ্রিল তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো জমি না থাকায় এখন তারা পরিবারের ৯ সদস্য নিয়ে সড়কে তাঁবু পেতে ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন।

গুরুদাসপুর সহকারী জজ আদালত থেকে উচ্ছেদ মামলায় রায় পাওয়ার দাবি করে সোভাজান বিবির ছেলে আবু হানিফ ইত্তেফাককে বলেন, আদালতের নিষেধ থাকায় তারা সাংবাদিকদের কাছে কাগজপত্র সরবরাহ করতে পারছেন না।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ ইত্তেফাককে বলেন, ওই জমি থেকে বসতি উচ্ছেদ বা অর্পিত জমি অবমুক্তির বিষয়ে আদালত থেকে তিনি কোনো আদেশ পাননি। তবে উচ্ছেদের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে সাধ্যমতো সহায়তা দিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার দুটিকে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছেন তিনি।