জনবল ও অর্থ সংকটে চরম টানাপোড়নের পর অবশেষে কক্সবাজার ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালের বিশেষায়িত বিভাগ করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। টানা ৯ মাস ৩০ চিকিৎসকসহ ১৩০ জন কর্মচারী বিনা বেতনে সেবা দিয়ে চালু রেখেছিলেন এ বিভাগটি। কিন্তু বিনা বেতনে এভাবে সেবা চালু রাখা আর সম্ভব না হওয়ায় বৃহস্পতিবার (৮ মে) হাসপাতালটিতে সিসিইউ সেবা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এর আগে বিষয়টি গত ৫ মে ঊর্ধ্বতন মহলকে লিখিতভাবে অবহিত করেছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবাধয়ক ডা. মং টিং ঞো।
একই কারণে যেকোনো মূহুর্তে বন্ধ ঘোষণা করা হতে পারে বিশেষায়িত আরেকটি বিভাগ নিবিড় পরিচর্যা-কেন্দ্র বা ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)। এ বিভাগেও দায়িত্বশীল কোন চিকিৎসক বা সেবাদানকারি অন্য কোন কর্মচারী নেই। এরপরও এতদিন তা টেনেটুনে চালু রাখা হয়েছিল।
অথচ, কক্সবাজার জেলার প্রায় ২৮ লাখ মানুষের সঙ্গে ২০১৭ সাল এবং তারও আগে মিলিয়ে যোগ হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা। আর প্রতিবছর পর্যটন শহর হিসেবে দরিয়ানগরে বেড়াতে আসেন কয়েক লাখ পর্যটক। বিপুল জনগোষ্ঠীর উন্নত চিকিৎসা সেবার কোন প্রতিষ্ঠান নেই। দেশের অন্য জেলার মতো ২৫০ শয্যার কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালটি এখানের প্রায় অর্ধকোটি মানুষের সেবা দিয়ে আসে। আইসিইউ, সিসিইউসহ অন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিতে ত্বরিত ভাবে ৫০০ শয্যার কক্সবাজার সরকারি মেডিকেল কলেজ (কমেক) ও হাসপাতালটি স্থাপন জরুরী বলে মনে করছেন কক্সবাজারের সচেতনমহল।
তথ্যমতে, হাসপাতালটিতে সরকারি মঞ্জুরি হওয়া পদ রয়েছে ৩২৮টি। এর মাঝে ৭৬টি শূন্য পদ বিদ্যমান। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে পাঁচশ হতে এক হাজার রোগী সেবার জন্য আসেন। মাত্র তিনজন চিকিৎসক এখানে সেবা দেন। ন্যূনতম সেবা চালু রাখতে হলে জরুরি বিভাগে অন্তত ১২ জন চিকিৎসক দরকার। এ ছাড়া ২৫০ শয্যার হলেও হাসপাতালের ইন্ডোরে গড়ে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ রোগী ভর্তি থাকে।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন ও সদর হাসপাতাল কার্যালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের ‘স্বাস্থ্য ও জেন্ডার সাপোর্ট প্রকল্প’ (এইচজিএফপি), স্বাস্থ্য ও লিঙ্গ সহায়তা প্রকল্পের (এইচজিএস) অধীনে রোহিঙ্গা সংকটে স্থানীয়দের জন্য বিশ্বব্যাংকের বরাদ্দ অর্থে আন্তর্জাতিক ও দেশি বিভিন্ন এনজিও জেলাব্যাপী হাসপাতাল ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে আসছে ২০১৯ সালের শুরু থেকে। এতে কক্সবাজার স্বাস্থ্য বিভাগে সরকারিভাবে নিয়োগ করা জনবল ছাড়াও কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে ১৯৯ জন পদায়ন করা হয়েছিল। যাদের দিয়ে হাসপাতালটিতে চালু করা হয়েছিল আইসিইউ, সিসিইউ, জরুরি প্রসূতি এবং শিশু সুরক্ষা সেবা কার্যক্রম। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে। ওই সময় বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমসহ নানাভাবে সংবাদ প্রকাশের পর সরকারি প্রচেষ্টায় প্রকল্পের মেয়াদ ৩ মাস বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। এরপর আর তা আগায়নি। ফলে, বিশাল সংখ্যক জনবল বিনা বেতনে সেবা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু প্রকল্প মেয়াদ আর বাড়ছে না এবং বিনাবেতনে কাজ করে সংসার চাকা সচল রাখা যাচ্ছে না দেখে তারা হাসপাতাল ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপরই মূলত বন্ধ হয়ে যায় বিশেষায়িত এসব সেবা।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিং ঞো বলেন, প্রকল্প বন্ধ হওয়ার পর ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অপারেটিং (আইএসও) নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নতুন একটি প্রকল্পের অনুমোদন হওয়ার আশ্বাস পাওয়া যায়। যার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইসিইউ, সিসিইউসহ বিশেষায়িত বিভাগ সমূহ চালু করা হয়। যেখানে ৩০ জন চিকিৎসক ও একশত কর্মচারী ছিল। যারা গত ৯ মাস ধরে বিনা বেতনে সেবা প্রদান করে আসছিলেন এবং বিভাগ সমূহ চালু ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মূলত বিশেষায়িত বিভাগ সমূহ এনজিও’র উপর নির্ভরশীল। আইসিইউ ও সিসিইউসহ কয়েকটি বিভাগ সরকারি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের অধীনে নয়। গত জুন মাসে এসে এনজিও প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনমাস বাড়ানো হলেও পরে সেপ্টেম্বর এ বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর প্রকল্প মেয়াদ বাড়বে ভেবে বিনা বেতনে অনেকেই চালিয়ে গেছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এখনো প্রকল্প আটকে আছে। এরমধ্যে অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। তাই চিকিৎসক ও কর্মচারী অভাবে সিসিইউ বিভাগ বৃহস্পতিবার (৮মে) বন্ধ হয়ে গেছে। আইসিইউ এখনো চালিয়ে বিনা বেতনে চালাচ্ছে দায়িত্বশীলরা। তাও যেকোনো মূহুর্তে বন্ধ হতে পারে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, পর্যটন নগরী হিসেবে কক্সবাজারে আইসিইউ, সিসিইউসহ অন্য বিশেষায়িত সেবাগুলো অতিশয় দরকার। জেলা সদর হাসপাতালে এসব সেবা নিয়মিত করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু কক্সবাজার সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চালু হলে এসব সেবা অনায়াসে পাওয়া যেত।
তবে, প্রতিষ্ঠার ১৪ বছরেও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন না হওয়ায় এনজিও নির্ভর বিশেষায়িত সেবা নিয়ে হাপিত্যেশ করতে হচ্ছে আমাদের। পর্যটন ও বিপুল রোহিঙ্গা আশ্রিত এলাকা হিসেবে এ সংকট উত্তরণে অতিসহসা কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপনে সরকারের ত্বরিত উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন খোকা।