সংবাদ প্রকাশের পর জোড়াতালিতে ফের সচল কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সিসিইউ

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে দীর্ঘদিন সেবা প্রদানের পর নানা অসঙ্গতিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশেষায়িত বিভাগ করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) ফের চালু হয়েছে। জনবল ও অর্থ সংকটে বন্ধ হওয়ার ৫ দিন পর মঙ্গলবার (১৩ মে) সকাল থেকে আবারও সিসিইউ সেবা চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গণমাধ্যমে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টায় বিশেষায়িত বিভাগটির জন্য সরকারিভাবে দুজন চিকিৎসক পদায়ন করা হয়েছে। কিন্তু সিসিইউর মতো বিভাগ দুজন দ্বারা পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় আলোচনা করে ৯ মাস বিনা বেতনে সেবা প্রদানকারিদের মাঝে দুইজন চিকিৎসক আবারও বিনা বেতনে সেবা প্রদানে সম্মতি দিয়ে কাজে যোগ দিয়েছে। ফলে ৪ জন চিকিৎসক নিয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকে বিভাগটি ফের চালু হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে বলে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, হাসপাতালের তত্ত্বাবাধয়ক ডা. মং টিং ঞো।

হাসপাতালের তত্ত্বাবাধয়ক ডা. মং টিং ঞো জানান, টানা ৯ মাস ৩০ চিকিৎসকসহ ১৩০ জন কর্মচারি বিনা বেতনে সিসিইউতে সেবা দিয়ে এসেছিল। কিন্তু তারা তা কন্টিনিউ রাখতে না পেরে বৃহস্পতিবার (৮ মে) সিসিইউ বন্ধ ঘোষণা হয়। বিষয়টি উধ্বর্তন মহলকে লিখিতভাবে একাধিকবার অবহিত করার পর নানা প্রচেষ্টায় সোমবার রাতে ২জন চিকিৎসককে জরুরি ভিত্তিতে পদায়ন করা হয়।

কক্সবাজার সিভিল সার্জন ও কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের ‘স্বাস্থ্য ও জেন্ডার সাপোর্ট প্রকল্প (এইচজিএসপি), স্বাস্থ্য ও লিঙ্গ সহায়তা প্রকল্পের (এইচজিএস) অধীনে রোহিঙ্গা সংকটে স্থানীয়দের জন্য বিশ্বব্যাংকের বরাদ্দ অর্থে আন্তর্জাতিক ও দেশি বিভিন্ন এনজিও জেলাব্যাপী হাসপাতাল ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২০১৯ সালের শুরু থেকে বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে আসছে। এতে কক্সবাজার স্বাস্থ্য বিভাগে সরকারিভাবে নিয়োগ করা জনবল ছাড়াও সদর হাসপাতালে ১৯৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদায়ন করা হয়েছিল। যার অধিনে হাসপাতালটিতে চালু করা হয়েছিল আইসিইউ, সিসিইউ, জরুরি প্রসূতি এবং শিশু সুরক্ষা সেবা কার্যক্রম। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে। ওই সময় বিষয়টি গণমাধ্যমে  প্রকাশের পর সরকারি প্রচেষ্টায় প্রকল্পের মেয়াদ ৩ মাস বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করে। যেখানে ৩০ জন চিকিৎসক ও একশত কর্মচারি ছিল। যারা গত ৯ মাস ধরে বিনা বেতনে সেবা দিয়ে আসায় বিভাগ সমুহ চালু ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার সিসিইউ বন্ধ ঘোষণা হয়।

এদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মুলত বিশেষায়িত বিভাগ সমুহ এনজিও’র উপর নির্ভরশীল ছিল। আইসিইউ ও সিসিইউসহ কয়েকটি বিভাগ সরকারি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের অধিনে থাকে না। গত জুন মাসে এসে এনজিও প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনমাস বাড়ানো হলেও সেপ্টেম্বর তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপরও প্রকল্প মেয়াদ বাড়বে আশায় বিনা বেতনে অনেকেই কাজ চালিয়ে গেছেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখনো প্রকল্প আটকে আছে। এর মাঝে অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন। এজন্য সিসিইউ বিভাগ বৃহস্পতিবার ডাক্তারের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যম বিষয়টি গুরুত্বসহকারে প্রচার করার কর্তৃপক্ষের বদান্যতায় মঙ্গলবার বিভাগটি ফের চালু করা সম্ভব হয়েছে। তবে, আইসিইউ বিভাগও যেকোন মুহুর্তে বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে। এটি সচল রাখতে গেলে প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন দেয়া জরুরি।

চিকিৎসকরা জানান, কক্সবাজার জেলার প্রায় ২৮ লাখ মানুষের সঙ্গে ২০১৭ সাল এবং তারও আগে মিলিয়ে যোগ হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা। আর প্রতিবছর পর্যটন শহর হিসেবে দরিয়ানগরে বেড়াতে আসেন কয়েক লাখ পর্যটক। বিপুল জনগোষ্ঠীর উন্নত চিকিৎসা সেবার কোন প্রতিষ্টান নেই। দেশের অন্য জেলার মতো ২৫০ শয্যার কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালটি এখানের প্রায় অর্ধকোটি মানুষের সেবা দিয়ে আসে। আইসিইউ, সিসিইউসহ অন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিতে তড়িত ভাবে ৫০০ শয্যার কক্সবাজার সরকারি মেডিকেল কলেজ (কমেক) ও হাসপাতালটি স্থাপণ জরুরী বলে মনে করছেন কক্সবাজারের সচেতনমহল।

তথ্যমতে, হাসপাতালটিতে সরকারি মঞ্জুরি হওয়া পদ রয়েছে ৩২৮টি। এর মাঝে ৭৬টি শূন্য পদ বিদ্যমান। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে পাঁচশ হতে এক হাজার রোগী সেবার জন্য আসেন। মাত্র তিনজন চিকিৎসক এখানে সেবা দেন। ন্যূনতম সেবা চালু রাখতে হলে জরুরি বিভাগে অন্তত ১২ জন চিকিৎসক দরকার। এ ছাড়া ২৫০ শয্যার হলেও হাসপাতালের ইন্ডোরে গড়ে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ রোগী ভর্তি থাকে।