সেকালের বরযাত্রা

বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। প্রত্যেক জাতি নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি ও সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী সারাজীবনের জন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সনাতন সম্প্রদায়ের এসব বিয়ের রীতি ধর্মীয় দৃষ্টিতে একইরকম হলেও লৌকিকতার ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতার প্রভাবে প্রভাবিত হয়। ফলে বিয়ের অনুষ্ঠানের আচার-ব্যবহার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নরকম হয়। সনাতন সম্প্রদায়ের বিয়ে পদ্ধতি আবার দু-রকমের হয়। লামন্ত এবং চলন্ত বিয়ে। লামন্ত বিয়ে হলো বর ছাড়া বরযাত্রী গিয়ে কনের বাড়ি থেকে কনে নিয়ে এসে বরের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান করা, যা ৩০/৩৫ বছর আগেও চালু ছিল। এটার অর্থ হলো, বীরের বেশে কনে তুলে নিয়ে এসে বিয়ে করা। এ বিয়েতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটা ছবি ফুটে ওঠে। আর কনের বাড়িতে বরযাত্রাসহ বর নিয়ে কনেকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসাকে চলন্ত বিয়ে হিসেবে অভিহিত করা হয়, যা বর্তমানে চালু আছে।

সেকালে হিন্দু সমাজে বেশিরভাগ বিয়ে হতো লামন্ত। বেশিরভাগ বরযাত্রা হতো হেঁটে। এমনকি ১৫/১৬ কিলোমিটার হেঁটে বরযাত্রায় যেতে হতো। আত্মীয়স্বজনসহ সমাজের সবাই বরযাত্রায় অংশগ্রহণ করতেন। কারণ সেকালে সমাজের বন্ধন ও নিয়মকানুন খুবই শক্ত ছিল। সমাজের নিয়মকানুন অমান্য করার সাহস এবং মন-মানসিকতা কারো ছিল না। সমাজপতিরাও শক্তহাতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। ফলে সমাজের কোনো কাজে কেউ না করতে পারতেন না।

১৯৭৬ সালে পাড়ার এক জ্যাঠাতো দাদার বিয়েতে বরযাত্রায় যাওয়ার কথা শুনে খুশিতে টগবগ। কারণ আমার ১০ বছর বয়সে আমি এ প্রথম বরযাত্রায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। পরের দিন যথারীতি সকাল ৮টায় লাইন ধরে ঢুলিসহ সমাজের প্রায় শতাধিক লোক বরযাত্রা শুরু করলাম। গন্তব্যস্থান ছিল চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা থানার গুজরা গ্রামে। প্রায় ১৩ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরত্ব। এখনকার মতো গাড়ি ছিল না। হেঁটে গন্তব্যে যাত্রা। দোহাজারী থেকে দেওয়ান হাটের ভেতর দিয়ে হাছনদণ্ডী হয়ে সাতবাড়িয়ার ওপর দিয়ে বরমার মধ্য দিয়ে বরকল পার হয়ে তারপর গুজরা গ্রাম। রাস্তা এখনকার মতো ভালো ছিল না। কাদাযুক্ত এবং পিচ্ছিল রাস্তা। পা এক স্থানে রাখা দায়। এক পা দিয়ে অন্য পা তুলতেই অপর পা কাদায় আটকে যায়। এভাবে অতিকষ্টে পা এবং কোমরের ব্যথা বাড়িয়ে কোনোরকম দুপুর ২টার দিকে আমরা বিয়ে বাড়িতে পৌঁছাই। বয়স্কদের অবস্থা আরো করুণ। তারপরও কেমন জানি সবার মাঝে একটা আনন্দের ধারা বিরাজ করছে অনুভব করলাম। বিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করার পূর্বে কনেপক্ষ ঘাঁটা আটকালেন। ঘাঁটার দু-দিকে দুটি কলাগাছ লাগিয়ে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে সুন্দর একটা গেট তৈরি করা। যার ওপর কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতা এবং বিভিন্ন জাতের ফুল দিয়ে সাজানো। কনেপক্ষ একটা কাগজে ২০১ টাকা লিখে ফিতার ওপর আটকে দিয়ে দু-পাশে দু’জন শক্ত করে ফিতা ধরে আছেন। শুরু হলো বরপক্ষের সঙ্গে কনেপক্ষের দর কষাকষি। বরপক্ষ ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত ওঠেন। কিন্তু কনেপক্ষ তাতে রাজি নয় বলে জানিয়ে দিলো। শুরু হলো তর্কাতর্কি। শেষ পর্যন্ত কনেপক্ষের মুরুব্বি টাইপের একজন এসে ঘাঁটা আটকানো মহিলাদের বকাবকি করে ৫০ টাকায় দফারফা করে দিলেন। তারপর শুরু হলো পানি ছিটিয়ে বরযাত্রীদের বরণ করে নেওয়ার পালা। তালপাতা দিয়ে বানানো হাতপাখার ওপর মগ থেকে পানি ঢেলে পাখাটা একটা পদ্ধতিতে নেড়ে বরযাত্রীদের উদ্দেশ্যে পানি ছিটিয়ে মারা হলো। বিশেষ কাউকে আবার ভালো করে পানি দিয়ে মুরগি ভেজা করে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, বরপক্ষের একজন সুযোগ বুঝে কন্যাপক্ষের হাত থেকে পানির মগ কেড়ে নিয়ে সমস্ত মগের পানি তাদের ওপর ঢেলে দিয়ে বীরত্ব প্রকাশ করলেন। বরপক্ষের লোকজন হাততালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানালেন। আমরা ছোটদের দলও হাততালির মাধ্যমে হৈ চৈ করে নাচানাচি করতে লাগলাম।

উঠোনে তৈরি প্যান্ডেলের নিচে লম্বা করে দু-পাশে শীতল পাটির ওপর বেডশিট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বরযাত্রী বসার জন্য। আমরা ছোটরা কনে দেখার উদ্দেশ্যে বীরত্ব দেখিয়ে ঢুকে পড়লাম ঘরের ভেতর। বাইরে কনেপক্ষের ৭/৮ জন মহিলা মিলে বরপক্ষের লোকজনদের লৌকিকতার নিয়ম অনুসারে পান-চিনি খাইয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন। ২ জন মহিলা দু-পাশে বরযাত্রীদের মাথায় পান স্পর্শ করে যান এবং অন্য দু’জন মহিলা বিশেষ ব্যক্তিদের হাত ধুয়ে দিয়ে তাঁদের হাতে চিনি তুলে দেন। কাউকে কাউকে আবার চিনি খাওয়ানোর নাম করে সারা মুখে চিনি মেখে দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে তাঁদের হাতে চিনি তুলে দেন। দু-পক্ষের মাঝে বিভিন্ন শ্লোক বলে একপক্ষ অন্যপক্ষকে ধরাশায়ী করার রীতি ছিল। তাও হলো।

সকল নিয়মকানুন পালন করার পর দুপুরের খাবারের আয়োজনের উদ্দেশ্যে উঠোনে চার লাইন করে বাঁশ বিছিয়ে দেন এবং থালা হিসেবে কলাপাতা ব্যবহার করেন। সে কী আনন্দ! খাবারের আয়োজনের মাঝে সাদা ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি, মাছের মাথা দিয়ে আলুর দম, এক টুকরো মাছ, এক চামচ মাছের ঝোল, চিনিপাতা দই এবং সবশেষে এক টুকরো সুপারির সঙ্গে একটা করে পান। খাবারের মাঝখানে কনেপক্ষের একজন মুরুব্বি এসে গলায় গামছা পেছিয়ে সবাইকে কড়জোরে প্রণাম জানিয়ে খাবারে কোনো প্রকার ত্রুটি আছে কি-না জিজ্ঞেস করে নেন। সবাই সমস্বরে সায় দেন, খাবার ঠিক আছে। খাবারের পর মনের সুখে পান চিবোতে চিবোতে সবাই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে কনেপক্ষ এবং রাঁধুনির খুব সুনাম করতে করতে ভদ্রতার পরিচয় দিতে লাগলেন। তারপর ঢুলিরা ঢাকে কাঠির আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে কনেসহ কনেপক্ষের মহিলাদের চিত্কার করে কান্নাকাটি শুরু হলো। সঙ্গে আমরা ছোটদের আনন্দের হাসিটাও মিলিয়ে গেল। কেননা, আবার প্রায় ১৩/১৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হবে। বরের বোনের সঙ্গে বৌকে একটা রিকশায় তুলে দিয়ে দোহাজারীর উদ্দেশ্যে আবার বরযাত্রী রওনা হয়ে গেল। রাত প্রায় ৮টায় কারো পা, কারো কোমর ব্যথা নিয়ে বাড়িতে পৌঁছালাম।

 

দোহাজারী, চট্টগ্রাম