১৮৬৬ সালে দীননাথ সেন ঢাকায় ব্রাহ্মদের নিজস্ব উপাসনালয় নির্মাণের প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ২৫ আগস্ট ১৮৬৬ সালে ৯ সদস্যের নির্মাণ কমিটি গঠন করা হয়। মন্দিরটি স্থাপনের আগে ঢাকার ব্রাহ্মরা উপাসনার জন্য একত্রিত হতেন আরমানিটোলার ব্রাহ্মসমাজ গৃহে। জনৈক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিজের বাড়িটি ব্রাহ্ম সমাজকে দান করেন। মতান্তরে এই জমির মালিক ছিলেন কলতাবাজারের জমিদাররা। উমাকান্ত ঘোষ এই মন্দির ভবনের নকশা প্রস্তুত করেন। রামমাণিক্য সেন নির্মাণ কাজ পরিচালনা করেন। দোতলা সমান উচ্চতার একতলা এ মন্দিরটি নির্মাণ ব্যয় হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। ডেভিড কফ এই মন্দিরটিকে সেসময়কার দক্ষিণ এশিয়ার ব্রাহ্ম মন্দিরের মাঝে সর্ববৃহত্ ও আকর্ষণীয় বলে উল্লেখ করেন। শহরের প্রায় সকল ধর্মের লোকের উপস্থিতিতে ৫ ডিসেম্বর ১৮৬৯ সালে মন্দিরটি উদ্বোধন করা হয়। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাঝে ছিলেন নবাব আবদুল গণি, নবাব আহসানুল্লাহ, ত্রিলোচন চক্রবর্তী, জোয়াকিন পোগোজ, বরদাকিঙ্কর রায়, লক্ষ্মীকান্ত দাস, ডেভিড, কৃষ্ণকুমার বসু প্রমুখ। প্রতি রবিবার সন্ধ্যায় এখানে প্রায় ৩শ’ সভ্য উপাসনার জন্য উপস্থিত হতেন বলে জানা যায়। ১৮৭০ সালে এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন দীননাথ সেন।
৪ ফুট উঁচু মঞ্চের ওপর পূর্ব-পশ্চিমে আয়তাকার মন্দিরটি ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। মন্দির ভবনের ছাদের সামনের অংশে একটি নকশাদ্বার চূড়ায় লেখা আছে ‘ব্রাহ্মসমাজ’। সাদামাটা এ মন্দিরে প্রবেশ করতে হয় ৫টি প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে। সিঁড়িগুলো ওপরের দিকে পাশে ক্রমশ কমে গেছে। সিঁড়ির ঠিক মাঝখানে উন্মুক্ত খিলান প্রবেশপথ। বারান্দার চারকোণের ওপরের অংশে আছে ৪টি বর্গাকার কক্ষ। পেছন দিকের বারান্দার অংশে ঘরগুলোতে ওঠার জন্য দুটি আলাদা সংকীর্ণ সিঁড়ি। উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহূত মন্দিরের মূল হলঘরটির দৈর্ঘ্য ৫৫ ফুট, প্রশস্ত ২২ ফুট এবং উচ্চতা ২১ ফুট। চারপাশের বারান্দা থেকে হলঘরে প্রবেশের নির্দিষ্ট দূরত্বে মোট ১৬টি প্রবেশপথ আছে। এরমধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ৫টি করে আর পূর্ব-পশ্চিমে ৩টি করে প্রবেশপথ আছে। বিশালাকার এই প্রবেশপথগুলো সবই খড়খড়ির। হলঘরের উত্তর অংশের ঠিক মাঝখানে ৪ ফুট উঁচু বেদিতে উঠতে হয় ৪টি প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে। এই বেদির ওপর বসে সম্পাদক ব্রাহ্মসমাজের মতবাদের কথা বলেন। এই উপাসনালয়ে কোনো প্রার্থনা বা পূজা হয় না। বেদির সামনে বসে শিল্পীরা ব্রাহ্মসমাজের বিভিন্ন গান গেয়ে থাকেন। আর চারপাশের বেঞ্চে বসে অতিথিরা তা শোনেন। হলঘরটির পূর্ব ও পশ্চিম দিকের ওপরের অংশে আছে রেলিং দেওয়া আয়তাকার বারান্দা। এছাড়া মন্দির নির্মাণের সময়ই মন্দিরের পেছনের অংশে সমাজের প্রচারকদের জন্য কয়েকটি ভবন নির্মাণ করা হয়।
সংকলন:আহসান জোবায়ের