চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় প্রশংসা, জনপ্রিয়তা সবকিছুই পরিচালক ও অভিনয়শিল্পী কেন্দ্রিক। তবে এর পেছনেও থাকে অনেক না জানা গল্প, নেপথ্য কারিগরের অক্লান্ত শ্রম, যা হয়তো আড়ালেই রয়ে যায় দর্শকদের। তেমনি এক পেশার নাম- চলচ্চিত্র সম্পাদক। একটি চলচ্চিত্রের চূড়ান্ত গঠন নির্ধারণ করা এই পেশার ব্যক্তিগুলো যেন রয়ে থাকে আড়ালেই! বাংলাদেশের শোবিজ অঙ্গনের অসংখ্য নির্মাণের অন্যতম নেপথ্য কারিগর রাশেদুজ্জামান সোহাগ।
চলচ্চিত্র সম্পাদনার সঙ্গে সোহাগের পথচলা প্রায় ১৪ বছরেরও অধিক সময়ের। এই সময়ের মধ্যে তিনি এডিটিং ও কালার গ্রেডিং নিয়ে করেছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি বিজ্ঞাপনের কাজ। শুধুই কী বিজ্ঞাপন? তালিকায় আছে অগণিত ডকুমেন্টারি, নাটক, মিউজিক ভিডিও, ওয়েব সিরিজ এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও।
তার সম্পাদিত নানান কাজ যেমনভাবে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি কুড়িয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। যেমন- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত ‘পুত্র’ (১৩টি বিভাগে), ‘মায়া: দ্য লস্ট মাদার’ (১০টি বিভাগে), এছাড়াও রয়েছে ‘পিঁপড়া বিদ্যা’, ‘কমলা রকেট’, ‘ডুব’, ‘পায়ের ছাপ’, ‘কাঠবিড়ালী’, ‘দেশান্তর’ এবং সরকারি অর্থায়নে নির্মিত শিশুতোষ ছবি ‘অ্যাডভেঞ্চার অফ সুন্দরবন' এর মতো সিনেমাও!
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও রয়েছে তার দক্ষতার ছাপ। ‘ভালো থেকো ফুল’, ‘দ্য লাস্ট পোস্ট অফিস’, ও ‘নট অ্যা ফিকশন’- এই তিনটি চলচ্চিত্র স্থান করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ওয়েব কনটেন্ট জগতেও রয়েছে সোহাগের মুন্সিয়ানার ছাপ। তার সম্পাদনায় তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘ওভারট্রাম্প’, ‘সিন্ডিকেট’, ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান’, ‘কাবাডি’, ‘ইন্টার্নশীপ’, ‘নীল দরজা’সহ ইত্যাদি।
সোহাগের জন্ম ময়মনসিংহে। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই হারিয়েছিলেন পিতাকে। পরিবারের সে সময়কার আর্থিক জটিল মুহূর্ত পার করে সোহাগ নিজেকে তৈরি করেছেন নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে। সোহাগের পেশাগত জীবনের শুরু মাছরাঙ্গা প্রোডাকশন লিমিটেড-এর হাত ধরে। কাজ করেছেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রোডাকশন হাউজে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজের পোস্ট-প্রোডাকশন কোম্পানি Post Circle, যা ইতোমধ্যেই আছে ইন্ড্রাস্টির শীর্ষস্থানে।
কেমন ছিলো শুরুর পথচলা? জানতে চাইলে সোহাগ বলেন, ‘সৌভাগ্যক্রমে পথচলার শুরু থেকেই সকল সিনিয়রদের পাশে পেয়েছি। যখনই কোন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, তখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এ শক্তির কারণেই পথচলাটা অনেক বেশি সহজ ছিল।’
ইতোমধ্যেই তার কাজের স্বীকৃতিও এসেছে নানা দিক থেকে। ২০২২ সালে ‘মায়াশালিক’ ওয়েব ফিল্মের জন্য তিনি পেয়েছেন BABISAS (বাংলাদেশ বিনোদন সাংবাদিক সমিতি) থেকে ‘সেরা সম্পাদক’ পুরস্কার এবং ২০২৪ সালে TRUB (টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটি অব বাংলাদেশ) থেকে একই কাজের জন্য ভূষিত হয়েছেন সম্মানে। ২০২১ সালে BABISAS থেকে তিনি পেয়েছেন ‘সেরা কালারিস্ট’-এর পুরস্কার, ওয়েব সিরিজ ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান’-এর জন্য।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যত পোস্ট-প্রোডাকশন সম্পর্কিত যত পেশার লোকজন আছেন, তাদের সকলকে নিয়ে একটি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে চাই, যেন বাংলাদেশের কোন পোস্ট-প্রোডাকশনের জন্য দেশের বাইরের সহায়তা নিতে না হয়।’ তিনি বিশ্বমানের কাজ প্রস্তুত করতে চান বাংলাদেশের মাটিতেই।
রাশেদুজ্জামান সোহাগের হাতেই গড়ে উঠেছে সেলুলয়েডের অসংখ্য গল্পের চূড়ান্ত রূপ। নিখুঁত, প্রাণবন্ত এবং দর্শকের মনে দাগ কাটার মতো দৃশ্যাবলী। নিজের কাজের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চান এই চলচ্চিত্র সম্পাদক।