অ্যামাজনের বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর জঙ্গলে টিকে থাকার লড়াই

ব্রাজিলের অ্যামাজন জঙ্গলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাস করে যাদের সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর কোনো যোগাযোগ নেই। ব্রাজিল সরকারের আদিবাসী বিষয়ক সংস্থা -এর তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রায় ১০০টির মতো এমন জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা বাইরের কারো সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখে না। তারা বাইরের লোকজন বা অন্যান্য আদিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না, কারণ অতীতে তাদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং এখনো তাদের বনভূমি দখল ও ধ্বংস করা হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অ্যাকর রাজ্যে থাকা আদিবাসীদের রাবার উৎপাদনের সময় দাসে পরিণত হয়েছিল। তাদের পূর্বপুরুষরা নির্যাতন থেকে বাঁচতে নদীপথে জঙ্গলের গভীরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এসব নির্মম ঘটনার স্মৃতি হয়তো এখনো তাদের মধ্যে বেঁচে আছে।

এইসব জনগোষ্ঠীদের সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা যায়। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত তারা একা থাকতে চায়। তারা বাইরে থেকে কেউ এলে তীর ছুঁড়ে মারে বা কখনও চুপচাপ জঙ্গলের ভিতরে লুকিয়ে পড়ে। এটা বোঝায় যে তারা বাইরের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায় না।

কিছু অস্পর্শিত আদিবাসী গোষ্ঠী, যেমন আওয়া। তারা শিকার ও সংগ্রহ করে বাঁচে এবং এক জায়গায় বেশিদিন থাকে না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা একটি ঘর তৈরি করতে পারে এবং কয়েকদিন পরেই তা ছেড়ে চলে যায়।
আবার অন্য কিছু গোষ্ঠী একটু বেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করে। তারা জঙ্গলের খোলামাঠে ঘর বানিয়ে একসাথে থাকে, বিভিন্ন ফসল চাষ করে, শিকার ও মাছ ধরে খায়।

ধারণা করা হয় যে এরকম প্রায় ৩০০ অস্পর্শিত মানুষ ম্যাসাকো এলাকায় বাস করে। তারা অনেক বড় বড় ধনুক ও তীর ব্যবহার করে – একবার এমন একটি ধনুক পাওয়া গেছে যার দৈর্ঘ্য ছিল ৪ মিটারেরও বেশি। তারা কচ্ছপ খেতে পছন্দ করে, কারণ তাদের পরিত্যক্ত ক্যাম্পে কচ্ছপের খোসার স্তূপ পাওয়া গেছে।

তবে এরকম কিছু গোষ্ঠী এখন প্রায় বিলুপ্তির মুখে। তাদের সদস্য সংখ্যা কয়েকজনের বেশি নয়।
এই ছোট ছোট ছড়িয়ে থাকা গোষ্ঠীগুলো মূলত রন্ডোনিয়া, মাতো গ্রোসো ও মারানিয়াও রাজ্যে বাস করে। তারা ভয়াবহ জমি দখলের ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া শেষ কয়েকজন। কাঠ ব্যবসায়ী, খামার মালিক ও অন্যান্যদের হাতে তারা একসময় হত্যার শিকার হয়েছিল। এখনও এদের উপর হামলা চালানো হয় এবং এদের বনভূমি দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

বিচ্ছিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কিছু গোষ্ঠীর শেষ প্রজন্ম এখন টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে

পিরিপকুরা, মাতো গ্রোসো

এই গোষ্ঠী কী নামে নিজেদের ডাকে তা জানা যায় না। তাদের প্রতিবেশী আদিবাসী গাভিয়াওরা তাদের ‘পিরিপকুরা’ বা ‘প্রজাপতি মানুষ’ বলে ডাকে। কারণ তারা জঙ্গলে সবসময় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে বেড়ায়। ১৯৮০-এর দশকে প্রথম তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, তখন প্রায় ২০ জন ছিলেন। পরে তারা আবার জঙ্গলে ফিরে যায়। ১৯৯৮ সালে, দুইজন পিরিপকুরা পুরুষ – বাইটা ও তামান্দুয়া – নিজেরাই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসেন। একজন অসুস্থতা হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

পিরিপকুড়ার দুই পুরুষ বাইতা এবং তামান্দুয়া। এই দুই ব্যক্তি, যারা কাকা-ভাগ্নে, স্থানীয়দের সাথে মাঝে মাঝেই যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু আবার বনে ফিরে গিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেছিলেন, আগে তাদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল, কিন্তু সাদা চামড়ার লোকজন আক্রমণ করে অনেককে মেরে ফেলেছে। এখন তিনি ও তার সঙ্গী জঙ্গলে শিকার করে, মাছ ধরে আর ফলমূল খেয়ে বেঁচে আছেন। আজও জানা নেই, আর কোনো পিরিপকুরা জীবিত আছে কিনা। তবে বাইটা ও তামান্দুয়া এখন চরম বিপদে, কারণ অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীরা তাদের জমি দখল করে জঙ্গলের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। সরকার তাদের জমি রক্ষা করার জন্য একটি সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, কিন্তু স্থায়ীভাবে সুরক্ষা না দিলে, এই দুইজনই হয়তো পিরিপকুরাদের শেষ প্রতিনিধি হয়ে থাকবে।

কাওয়াহিভাদের শেষ জনগোষ্ঠী সশস্ত্র কাঠুরে এবং শক্তিশালী পশুপালকদের হাত থেকে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

কাওয়াহিভা, রিও পার্ডো

এই গোষ্ঠী সম্পর্কে খুব কম জানা গেছে, তবে তারা কাওয়াহিভা নামক বড় একটি গোষ্ঠীর অংশ বলে মনে করা হয়। কয়েক বছর আগে তাদের সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০-এর মতো ছিল, কিন্তু এখন আরও কম হতে পারে। তারা সবসময় পালাতে থাকে, কারণ কাঠ কাটা ও জমি দখলের লোকজন সবসময় তাদের এলাকা দখল করে নিচ্ছে। সবসময় পালাতে থাকায় তারা চাষাবাদ করতে পারে না, শুধু শিকার আর মাছ ধরেই চলে। তাদের জমি এখনো সরকারিভাবে সুরক্ষিত না, ফলে তারা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রাজিলের জাভারি উপত্যকায় কোরুবো মা এবং তার সন্তান। ছবি: সংগৃহীত

করুবো, জাভারি উপত্যকা

ব্রাজিল ও পেরুর সীমান্তে জাভারি উপত্যকায় সবচেয়ে বেশি অস্পর্শিত আদিবাসী গোষ্ঠীর বাস। এই অঞ্চলের একটি গোষ্ঠী করুবো নামে পরিচিত। তাদের ‘ক্লাবমানুষ’ বলা হয় কারণ তারা বড় বড় লাঠি বা অস্ত্র নিয়ে নিজেদের রক্ষা করে। ১৯৯৬ সালে, ফুনাই নামের সংস্থা করুবোদের একটি ছোট দল (৩০ জন) এর সঙ্গে যোগাযোগ করে, যারা মূল দলের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মূল দল এখনো বাইরের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ না করেই জঙ্গলে থাকে।

এখন সমস্যা হলো, যারা ইতিমধ্যে বাইরের লোকের সংস্পর্শে এসেছে, তারা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এই রোগগুলো যদি বিচ্ছিন্ন এইসব গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের সবাই মারা যেতে পারে। এই অস্পর্শিত আদিবাসী মানুষগুলো শুধু তাদের সংস্কৃতি নয়, তাদের অস্তিত্বও আজ হুমকির মুখে। জঙ্গল কেটে ফেলা, জমি দখল, ও রোগের ভয় তাদের শেষ করে দিচ্ছে। 

তথ্যসূত্র: সার্ভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল