নাদিয়া মেল্লিতি: প্যারিসের রাস্তার ফুটবল খেলোয়াড় থেকে কানের সেরা অভিনেত্রী

প্রথম চলচ্চিত্রেই বাজিমাত করলেন ২৩ বছর বয়সী আলজেরিয়ান অভিনেত্রী নাদিয়া মেল্লিতি। যিনি একজন ফরাসি ছাত্রী এবং অপেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়। প্যারিসের রাস্তায় বন্ধুদের সথে যাকে ফুটবল খেলতে দেখা যেত। ৭৮তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে নিয়েছেন তিনি। নাদিয়া হলিউড তারকা জেনিফার লরেন্স এবং এলি ফ্যানিংকে হারিয়ে এই পুরস্কার জিতে নেন।

শনিবার (২৪ মে) সন্ধ্যায় কান উৎসবের প্যালেস দে ফেস্টিভ্যালের মঞ্চে নাদিয়ার হাতে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। অভিনয় জগতে সম্পূর্ণ নবাগত নাদিয়া মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘লা পেটিট ডের্নিয়ে’ চলচ্চিত্রে, যার ইংরেজী নাম ‌‘দ্য লিটল সিস্টার’। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন হাফসিয়া হার্জি। এটি ফাতিমা দাসের ২০২০ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক কাহিনী অবলম্বনে হাফসিয়া নির্মিত তৃতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

পুরস্কার হাতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন নাদিয়া মেল্লিতি। ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ভ্যারাইটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিনেমার গল্পে নাদিয়া ১৭ বছর বয়সী ফিলোসফির ছাত্রী ফাতিমার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। যিনি শহরতলীতে বাস করা প্যারিসের একজন মুসলিম মেয়ে। যিনি তার পরিচয় এবং ধর্ম নিয়ে লড়াই করছেন। নিজের লিঙ্গহীনতা নিয়ে লজ্জিত এবং তা পরিবারের কাছে প্রকাশ করেন না। ধীরে ধীরে তিনি নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলেন। নিজের যৌনতা আবিষ্কার করেন ও প্রেমে পড়েন।

ফাতিমার চরিত্রে অভিনয় করেই সেরার পুরস্কার জেতেন নাদিয়া। পুরস্কার পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, ‘এখন আমার ভেতরে কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে, আমি এটা বর্ণনা করতে পারছি না কিন্তু এটা সত্যিই অসাধারণ।’

বিশেষ করে তার মাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নাদিয়া বলেন, ‘ধন্যবাদ মা। ​​আমি জানি তুমি দেখছো এবং আমি আশা করি তুমি খুব গর্বিত এবং খুশি।’

‘দ্য লিটল সিস্টার’ সিনেমার দৃশ্যে নাদিয়া মেল্লিতি। ছবি: সংগৃহীত

নাদিয়া কোনো অভিনয় প্রশিক্ষণ নেননি। সিনেমার প্রতি বিশেষ আগ্রহও ছিল না। তিনি শারীরিক ও ক্রীড়া বিজ্ঞানে বিভাগের ছাত্রী। ‘লা পেটিট ডের্নিয়ে’ ছবিতে সুযোগ পাওয়াটা তার কাছে রীতিমতো অবিশ্বাস্য ছিল উল্লেখ করে নাদিয়া জানান, তিনি মধ্য প্যারিসের চাতেলে এলাকায় একটি বড় শপিং মলের কাছে হাঁটছিলেন। তখন কাস্টিং ডিরেক্টর অড্রে জিনি তাকে খুঁজে পান।

অভিনেত্রীর ভাষ্যে, ‘আমি রাস্তায় হাঁটছিলাম এবং তিনি আমাকে ডাকলেন। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম তিনি একজন পর্যটক এবং আমি ভাবছিলাম আমার ইংরেজি কি ঠিকঠাক হবে।’ তখনও তিনি ভাবতে পারেননি এত বড় সুযোগ আসবে।

পুরস্কারপ্রাপ্তির পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে নাদিয়া বলেন, ‘আমি কখনও কোনও থিয়েটার বা সিনেমা করিনি’।

এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবের সেরা অভিনেত্রী নাদিয়া মেল্লিতি। ছবি: সংগৃহীত

তবে তিনি ফরাসি লেখক ফাতিমা দাসের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে স্ক্রিপ্টটি পড়ার সাথে সাথেই চরিত্রটির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছিলেন বলে জানান।

নাদিয়ার ভাষ্যে, ‘ফাতিমা, তার পারিপার্শ্বিকতা এবং উৎসের সাথে আমার খুব মিল ছিল। আমার মা অভিবাসী পটভূমি থেকে এসেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমার শিকড় আলজেরিয়ান। আমার বোনও আছে।’

নাদিয়া জানান, এই চরিত্রে তাকে বিস্তৃত আবেগগত পরিসর দেখাতে হয়েছিল, প্যারিসের এক কঠিন স্কুলে সমকামীতা সম্পর্কিত দৃশ্য থেকে শুরু করে পারিবারিক কথোপকথন এবং বিভিন্ন সঙ্গীর সাথে যৌনতা পর্যন্ত।

‘আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমি ফুটবল খেলতে চেয়েছিলাম। আমি আজও তা করি,’ যোগ করেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি সেই খেলাটি বেছে নিতে চেয়েছিলাম, যেটা সচরাচর পুরুষেরা খেলে এবং যে খেলায় পুরুষদের বেশি প্রতিনিধিত্ব করা হয়।’

‘দ্য লিটল সিস্টার’ সিনেমার শেষ দৃশ্যে তাকে বারবার ফুটবল মাথায় নিয়ে দক্ষতা প্রদর্শন করতে দেখা যায়।

মার্সেইতে জন্মগ্রহণকারী ৩৮ বছর বয়সী পরিচালক হাফসিয়া হার্জিরও সিনেমা বিষয়ক কোনও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই।

পুরস্কারপ্রাপ্তির পর এই পরিচালক বলেন, ‘নাদিয়ার ছবি দেখে আমি মুহূর্তেই মুগ্ধ হয়েছি। যদিও আমি অন্যান্য কাস্টিংও চালিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাদিয়ার সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি অত্যন্ত খুশি।’