কেরানীগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে, পাঠদান বন্ধ

চাকরির শুরুতে ১১তম গ্রেড নির্ধারণসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত সহকারী শিক্ষকরা ঢাকার কেরানীগঞ্জে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি শুরু করেছেন। এতে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষকেরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সোমবার (২৬ মে) সকাল থেকে কেরানীগঞ্জ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সহকারী শিক্ষকরা কর্মবিরতি শুরু করেন।

আন্দোলনকারী সহকারী শিক্ষকদের তিন দফা দাবি হলো—প্রাথমিক ও উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে করা পরামর্শক কমিটির সুপারিশের যৌক্তিক সংস্কার করে সহকারী শিক্ষক পদকে শুরুর পদ ধরে ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা নিরসন এবং প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতিসহ দ্রুত পদোন্নতি।

আজ সকালে উপজেলার জিনজিরা পী এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বই খাতা নিয়ে পাঠ গ্রহণের আশায় শ্রেণীকক্ষে বসে আছেন। বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকেরা শিক্ষক মিলনায়তন কক্ষে বসে আছেন। শ্রেণীকক্ষের বাইরে অভিভাবকদের কেউ দাঁড়িয়ে, কেউবা বসে আছেন। একই চিত্র দেখা গেছে ১০৮নং পারজোয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আমিরাবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমবাগিচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইমামবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৬৬ নং নয়াশুভাঢ্যা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়েও।

ভাংনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শিপ্রা বসু বলেন, এ বিদ্যালয়ে আমি ৩০ বছর ধরে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি করছি। প্রতিদিন মিরপুর থেকে কেরানীগঞ্জে যাতায়াত করে এ চাকরি করছি। অথচ এ দীর্ঘ চাকরি জীবনে আমার কোনো পদোন্নতি হয়নি। তাই আমাদের মতো ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করছে। 

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা ভাবছেন আমরা ক্লাস না নিয়ে বসে আছি। পরে আমরা তাদের আন্দোলনের বিষয়টি বুঝিয়েছি। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলনে থাকবো।

জিনজিরা পী এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী সালমা আক্তার সকাল নয়টা থেকে অপেক্ষা করছে শিক্ষকের জন্য। কিন্তু সাড়ে দশটার পরও ক্লাসে কোনো শিক্ষকের উপস্থিতি নেই। সালমা বলেন, সকাল সাড়ে আটটায় বই খাতা নিয়ে স্কুলে এসেছি। অনেক সময় ধরে ক্লাসে বসে আছি, কিন্তু ম্যাডামরা এখনও আসেননি। আমাদের কোনো পড়া দিয়ে যাননা। তারা তাদের রুমে বসে মোবাইল টিপে।কয়দিন ধরে আমরা ক্লাসে আসি কিন্তু কোনো শিক্ষক আসেনা।

এ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীর মা শাহানাজ বেগম বলেন, আমার ছেলেটা নিয়মিত স্কুলে যায়। এখন স্কুলে গিয়েও যদি ক্লাস না হয়, তাহলে সে তো অনেক পিছিয়ে পড়বে। ঘরে তো আমরা ঠিকভাবে পড়াতে পারি না। শিক্ষক ছাড়া শিশুরা কীভাবে শিখবে?

নয়াশুভাঢ্যা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীর বাবা হাফিজ উদ্দিন বলেন, ছোট বয়সেই যদি পড়ালেখায় ছন্দপতন হয় পরে তা কাটিয়ে ওঠা খুব কঠিন হবে। শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো শিগগিরই সরকারের পূরণ করা উচিত। যাতে করে আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে না পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১০৮নং পারজোয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, আন্দোলনের কারণে আমরা ক্লাস নিচ্ছি না। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এসে পাঠ গ্রহণের আশায় বসে আছে। আমরা বাধ্য হয়ে পাঠদান করতে পারছি না। এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের এভাবে বসিয়ে রাখায় আমাদেরও কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমরা নিরুপায়। আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিলে আমরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করবো।

জিনজিরা পি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী এক শিক্ষক বলেন, আমাদের যৌক্তিক দাবির বিষয়ে গত ৫ মে থেকে আন্দোলন চলছে। ২৫ মে পর্যন্ত অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালন করা হলেও আজ সোমবার থেকে সারা দেশের সরকারি সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করা হচ্ছে। সারা দেশের সব সহকারী শিক্ষক কর্মসূচি পালন করলেও এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলতে থাকবে।

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের সংগঠন ঐক্য পরিষদের সভাপতি ও আমিরাবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহীনুর আক্তার দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের দাবি যৌক্তিক। তিন দফা দাবিতে গত ৫ মে থেকে ১৫ মে পর্যন্ত দিনে এক ঘণ্টা, ১৬ মে থেকে ২০ মে পর্যন্ত দুই ঘণ্টা, ২১ মে থেকে ২৫ মে পর্যন্ত অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালন করেছি। পরবর্তীতে আজ সোমবার থেকে লাগাতার পূর্ণদিবস কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এর আগেও আমাদের ন্যায্য ও যৌক্তিক অধিকার নিয়ে কথা বলেছি। তবে বিনিময়ে শুধু আশ্বাস পেয়েছি, কোন সমাধান পাইনি। এবার আমরা একটা সুষ্ঠু সমাধানের আশা করছি।

এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আঞ্জুমান আরার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।