বাজেটের আকার কম, ঘাটতিও কম

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো—সরকারের আর্থিক সুনাম ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক ঋণ-নির্ভরতা কমানো এবং ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের চাপ কমানো। ২০১০-১১ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এর পর থেকে বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি সাধারণত ৫ শতাংশের বেশি ছিল। আর করোনা মহামারির সময়ে তা ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেট হবে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বাজেট। সরকারের লক্ষ্য হলো ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা। যেখানে বাজেটের একটি বড় অংশ শুধু ঋণ ও সুদ পরিশোধেই খরচ হয়।

সরকার আগামী অর্থবছরে মোট ব্যয় জিডিপির ১২ দশমিক ৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ছিল ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। বাজেটের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও, এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধিকে সামনে রেখে তৈরি করা হচ্ছে।

বাজেটের আকার :২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ২ জুন টেলিভিশনের পর্দায় বাজেট পেশ করবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। এ বাজেট চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমদও বাজেটে শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব বাজেট ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে। প্রশাসনিক ব্যয় কমানো কঠিন হলেও সরকার বড় এবং ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প বাদ দিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে, আর বাকি অর্থ আসবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাপকভাবে ঋণ গ্রহণ করেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বেড়েছে। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে তা ৯ শতাংশের ওপরে রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব ও ব্যয়ের ব্যবধান কমিয়ে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ-নির্ভরতা কমাতে চায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার এই পদক্ষেপ আগেই প্রয়োজন ছিল। এই চক্র থেকে বের হতে হলে রাজস্ব বাড়াতে হবে, তবে ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনতে চাওয়ার উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে শুধু ঘাটতি কমালেই হবে না সরকারকে আয় বাড়ানোর বাস্তবসম্মত কৌশল নিতে হবে। করজালের পরিধি না বাড়িয়ে কেবল ব্যয় কমিয়ে আর্থিক ভারসাম্য আনা যাবে না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে রাজস্ব আহরণে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। আয় বাড়ানো ছাড়া শুধু ব্যয় কমিয়ে চলা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।

এদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে যাচ্ছে সরকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২৫ শতাংশ কমিয়ে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটের ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার দেশীয় উৎসর পরিবর্তে বিদেশি ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করবে। কারণ বিদেশি ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেট ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা কমানোর সঙ্গে ব্যাংক ঋণ কমানো যুক্তিযুক্ত। সরকার যদি প্রচুর পরিমাণে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে।

গত কয়েক বছর ধরে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে বাজেটের আকার বেড়েছে, যদিও রাজস্ব আয় খুব একটা বাড়েনি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালের জুনে ছিল ৭ লাখ ২২ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যার মধ্যে ২১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে;  যেমন সঞ্চয়পত্র এবং ব্যক্তি ও করপোরেটদের কাছে ট্রেজারি বন্ড বিক্রির মাধ্যমে।

চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা কমিয়ে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণের পরিমাণ ছিল মূল বাজেটে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কমে ৯৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। এর প্রধান কারণ এডিপি বাস্তবায়নের ধীরগতি। এই সময়ে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নেয়নি; বরং ৫৯ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।