যারা বাংলাদেশের ইতিহাসকে শুধু পৃষ্ঠা নয় স্পন্দনের মত পড়ে থাকেন, তাঁদের কাছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের (বীরউত্তম) নামটি এক অনিবার্য উচ্চারণ। একদিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানায়ক, অন্যদিকে দেশের রাজনীতির এক অনন্য রূপকার। তাঁর উত্থান কেবল একটি সময়ের প্রয়োজনে নয়, বরং ছিল একটি দিকহারা জাতির জন্য কাঙ্খিত দিকদর্শন। শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন শুধুমাত্র একটি অতীত অধ্যায় নয়, বরং তা তরুণ প্রজন্মের সামনে আজও প্রাসঙ্গিক। সময়ের প্রয়োজনে, সংকটের মুহূর্তে কিংবা ভবিষ্যতের সন্ধানে।
১৯৭৫-এর উত্তাল রাজনৈতিক পটভূমিতে জিয়াউর রহমান আবির্ভূত হন এক “নির্মাতা রাষ্ট্রনায়ক” হিসেবে। তাঁর অভ্যুত্থান ছিল ইতিহাসের গভীর থেকে উঠে আসা এক বাস্তবতার অনিবার্য ফলাফল। তিনি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন দেশ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন, অর্থনীতিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত, এবং জনগণের মনোবলে চরম হতাশাগ্রস্ত। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে তিনি যে দর্শন নির্মাণ করেন, তা ছিল আত্মনির্ভরতার, শৃঙ্খলার এবং সর্বোপরি, গণভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার এক নতুন খসড়া।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ', একটি তাত্ত্বিক ও বাস্তবভিত্তিক ধারণা, যা একদিকে জাতীয় ভূখন্ডের প্রতি আনুগত্যকে প্রধান করে, অন্যদিকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে রাষ্ট্রচিন্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এটি ছিল পাকিস্তানি 'ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ' ও ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ'-এর বাইরে একটি স্বতন্ত্র দর্শন। তরুণ প্রজন্ম আজ যখন পরিচয়ের সংকটে ভোগে, তখন ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ' তরুণদের সামনে জাতীয় পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা হাজির করতে পারে, যেখানে নিজস্বতা হারানোর ভয় নেই, আবার বাঙালিত্ব ও ইসলামি মূল্যবোধকে দ্বন্দ্বে না ফেলে একত্রে ধারণ করা যায়।
শহীদ জিয়া বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক সফলতার মাপকাঠি কেবল গণতন্ত্রের আবরণ নয়, বরং এর মূলে থাকা উচিত উৎপাদনশীলতা, কর্মনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা। তাঁর শাসনামলে 'কর্মই শ্রেষ্ঠ' এই বার্তা তিনি শুধু ভাষণে নয়, নীতিতে বাস্তবায়িত করেছিলেন। তিনি ব্যক্তির চেয়ে দল আর দলের চেয়ে দেশকে বড় করে দেখেছিলেন। তিনি প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজান, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালু করেন, গ্রাম পর্যায়ে কৃষি উন্নয়ন জোরদার করেন, এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা তৈরি করেন। তরুণরা আজ যখন কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দোলাচলে, তখন জিয়াউর রহমানের কর্মমুখী চিন্তাধারা আবারও আলোচনায় আসা উচিত, যেখানে রাজনীতি আর শাসন কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের শৃঙ্খলিত রূপরেখা।
শেখ মুজিবের অপশাসনের প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালে দেশে যখন একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, ঠিক সেই সময় শহীদ জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও মুক্ত মত প্রকাশের পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, নিষিদ্ধ দলসমূহকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনেন এবং একটি তৃণমূলমুখী রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেন। যে সময়ে আজ রাজনীতি ব্যক্তি ও পরিবারের কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, তখন শহীদ জিয়ার ‘পলিটিক্যাল ডি- সেন্ট্রালাইজেশন'-এর চিন্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে দলনির্ভর থেকে জনগণনির্ভর করে তুলতে চেয়েছেন, যেখানে জনগণ কেবল ভোটার নয়, বরং প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রনীতির অংশীদার হতে পারেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, নেতৃত্ব কেবল অভিজ্ঞদের সম্পত্তি নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণদের হাতে নেতৃত্বের ব্যাটন তুলে দেওয়াই রাজনীতিকে জীবন্ত এবং জনমুখী করে তোলে। তাঁর সময়েই বিএনপিতে বহু তরুণ, পেশাজীবী, শিক্ষক ও উদ্যোক্তা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শনেও 'যুবশক্তি' ছিল এক অন্যতম প্রধান নির্ধারক শক্তি। তিনি তরুণদের বলেছিলেন “দেশ গড়ার হাতিয়ার এখনই তুলে নিতে হবে, বয়স নয়, দায়বদ্ধতাই নেতৃত্বের যোগ্যতা।” আজ যখন তরুণ প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে পড়ছে, তখন শহীদ জিয়ার ‘ট্রাস্ট ইন ইয়ুথ’-নীতি ও তরুণ নেতৃত্বে আস্থা স্থাপন বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ী।
জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান, কিন্তু তাঁর রাজনীতি ছিল ধর্মান্ধতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা, এই দুই চরম অবস্থার বাইরের এক বাস্তববাদী মাঝপথ। তিনি 'বিশ্বাসের স্বাধীনতা' ও 'রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা' দুই দিকের ভারসাম্য বজায় রেখে সমাজ গঠনের চেষ্টা করেন এবং সফলভাবে একটি সার্বজনীন রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। একদিকে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করেন, অন্যদিকে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জন্যও তাদের ধর্মপালন ও রাজনীতিতে অংশগ্রহনের সুরক্ষিত অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। তরুণরা আজ যখন পরিচয়ের জটিল সংকটে পড়ে, তখন শহীদ জিয়ার এই ভারসাম্যমূলক রাষ্ট্রচিন্তা তাদের জন্য পথ দেখাতে পারে একটি মানবিক, সহনশীল ও নৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্নে। তরুণদের জন্য পরিচয় নির্মাণের পাশাপাশি তাদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতেও সুদুরপ্রসারী কার্যক্রম হাতে নেন জিয়াউর রহমান। তাঁর সময়েই দেশে টেলিকম, রেডিও ও টেলিভিশন কার্যক্রম সম্প্রসারণ শুরু হয়। সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদান আজও স্মরনীয়। বর্তমান জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন তিনি। তিনি তথ্যপ্রযুক্তিকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। আজ যে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ধারণাটি প্রবলভাবে প্রচারিত, তার বীজ রোপিত হয়েছিল শহীদ জিয়ার সময়েই। শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনকে কেউ কেউ কেবল অতীতের দলীয় ভাবনায় আবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে জিয়ার চিন্তা ছিল সময়ের অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁর দর্শনে ছিল। ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি, বাস্তববাদিতা ও জনমানুষের অন্তর্জগৎকে বোঝার এক অনন্য সক্ষমতা।
আজকের তরুণদের সামনে যখন রাজনীতি বিভক্ত, নেতৃত্ব সংকটে, আদর্শ বিলুপ্তির পথে তখন শহীদ জিয়ার চিন্তাকে নতুনভাবে পাঠ করা প্রয়োজন। তাঁকে শুধু একজন রাষ্ট্রপতি নয়, বরং একজন রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হিসেবেও অনুধাবন করা দরকার। যেহেতু বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একজন রাজনৈতিক চরিত্র ছিলেন, এ প্রেক্ষাপটে তাঁর ভক্ত ও অনুসারীর পাশাপাশি সমালোচক থাকাটাও একেবারে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এ দুইয়ের কোনো পক্ষই অস্বীকার করতে পারবে না যে, বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত যে ক'জন স্থাপন করেছেন, তাঁদের মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অন্যতম প্রধান ব্যক্তি।
জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ছিল একটি রাষ্ট্রদর্শন, যেখানে স্বাধীনতা, জাতীয়তা, আত্মনির্ভরতা ও জনগণের ক্ষমতায়নের স্পষ্ট রূপরেখা ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানামুখী পট পরিবর্তন স্বত্তেও আজকের দিনে এসে সেই নীতিদর্শন এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। জিয়াউর রহমানের এই আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে তাঁর সুযোগ্য সন্তান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান ৩১ দফা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখা দিয়েছেন, যা তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্খা, অধিকার ও সম্ভাবনার প্রতিফলন। জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও দর্শনকে ধারণ করতে হলে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরির এই কর্মসূচিকে গ্রহণ ও অনুসরণ করাই সময়ের দাবি। তারেক রহমানের মধ্যেই জিয়াউর রহমানের আদর্শিক প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছে তরুণ প্রজন্ম। ১৯ দফা যেমন পথ দেখিয়েছিল এককালে, তেমনি ৩১ দফা নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য একটি দৃড় নৈতিক ও রাজনৈতিক রূপরেখা হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে তুলবে।
এদেশের সচেতন তরুণ প্রজন্ম যদি নিজেদের দায়িত্ব ও আত্নপরিচয়ের জায়গা থেকে রাজনীতিকে ধারণ করতে চায়, সেক্ষেত্রে নতুন বাংলাদেশে বিনির্মাণে জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও দর্শণ তাদের অন্যতম প্রধান পাথেয় হিসেবেই বিবেচিত হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক। রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ক সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক