সিলেটের সর্বত্র ছেলে ধরা আতঙ্ক : গুজব ঠেকাতে প্রশাসনের নজরদারি

বৃহত্তর সিলেটের সর্বত্র ‘ছেলে ধরা’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এক সপ্তাহ ধরে এই আতঙ্ক চলছে। আর ছেলে ধরা সন্দেহে সেখানে মানুষ গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। অভিভাকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কোন কোন স্থানে এলাকাবাসী রাত জেগে পাহারা বসিয়েছেন।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড মেম্বার মীর হোসেন তার দুসন্তান । এক সন্তানকে দূরে আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে লেখা পড়া করাচ্ছিলেন। ছেলে ধরা সন্দেহে তাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছেন।

এদিকে গত শনিবার রাতে সিলেটের কমলগঞ্জের দেওছড়া চা বাগান এলাকায় ছেলে ধরা সন্দেহে একজন নিহত হওয়ার ঘটনা ছাড়াও সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে।  রবিবার সন্ধ্যায় মৌলভীবজারের গ্রামে বন্ধুর প্রেমিকাকে তার বাড়িতে মোবাইল ফোন ও প্রেমপত্র দিতে গিয়ে এক যুবক  'ছেলেধরা' সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

আরও পড়ুন: তাছলিমা হত্যায় গ্রেফতার ৪, ধরাছোঁয়ার বাইরে পিটুনিতে নেতৃত্বদানকারী যুবক

এদিকে পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন পরিস্থিতির উপর বিশেষ নজরদারী শুরু করেছে। তারা ‘গুজবে’ কান না দিতে, আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘সন্দেহ জনক পরিস্থিতিতে ৯৯৯ নাম্বারে পুলিশকে খবর দিন।’ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে জনগণকে সতর্ক করা ছাড়াও মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিদের এই সচেতনাতামূলক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।  

‘পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজে মানুষের কাটা মাথা ও রক্ত লাগবে বলে সারাদেশে গুজব ছড়িয়ে পড়া’র  পরিপ্রেক্ষিতে  রবিবার রাতে সিলেট জেলা পুলিশের মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) মো. আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ও গণমাধ্যমে প্রেরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। গণবিজ্ঞপ্তিতে বলে হয়, ‘গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে হত্যার মাধ্যমে  কুচক্রী মহল দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির পায়তারা করছে। এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ।’

জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করাসহ পুলিশের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হয়। পুলিশের সহায়তা অথবা জাতীয় জরুরি সেবার জন্য ৯৯৯-এ কল করার জন্য বিশেষ অনুরোধ করা হয়।

কমলগঞ্জে নিহত ১

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি (৫০) নিহত হয়েছেন। শনিবার গভীর রাতে রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা বাগান এলাকায় এ ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয়রা জানান, এলাকায় সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে ঐ ব্যক্তিকে চা শ্রমিকরা আটক করে তার নাম পরিচয় জানতে চায়। অসংলগ্ন কথাবার্তায় ছেলেধরা সন্দেহে তাকে শ্রমিকরা পিটুনি দিয়ে গুরুতরভাবে আহত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন।

বন্ধুর প্রেমিকাকে মোবাইল ফোন ও চিঠি দিতে গিয়ে

বন্ধুর প্রেমিকাকে তার বাড়িতে মোবাইল ফোন ও প্রেমপত্র পৌছে দিতে গিয়ে বসন্ত শব্দকর (২৪) নামের এক যুবককে রবিবার সন্ধ্যায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার হাজীপুর ইউনিয়নের পীরেরবাজার এলাকার খাতাইরপার গ্রামে  গণধোলাই দেন স্থানীয় জনতা। পরে পুলিশ উত্তেজিত জনতার হাত থেকে ওই  যুবককে উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, কমলগঞ্জ পৌরশহরের নরেন্দ্রপুর এলাকার হবিব মিয়ার সাথে কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের খাতাইরপার গ্রামের এক তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই তরুণীর সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য একটি মোবাইল ফোন পৌঁছে দিতে হবিব তার বন্ধু, একই এলাকার বসন্ত শব্দকরের সহযোগিতা চায়। বসন্ত বন্ধু হবিবের দেয়া মোবাইল ফোন ও একটি চিঠি নিয়ে ওই তরুণীর বাড়ি আসলে স্থানীয় লোকজন বসন্ত শব্দকরকে ছেলেধরা হিসেবে সন্দেহ করে গণধোলাই দেয়। পরে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী বসন্তকে রক্ষা করে একটি দোকানে নিয়ে রাখেন। পরে পুলিশ বসন্তকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে ‘মোবাইল ফোন’ ও ‘প্রেমের চিঠির ঘটনা’ খুলে বলে।

ছাতক ও জামালগঞ্জে মানসিক প্রতিবন্ধি গণপিটুনির শিকার

সুনামগঞ্জের ছাতকে ছেলেধরা সন্দেহে (৫৫) বছর বয়সের এক ব্যক্তিকে গণপিটুনির পর পুলিশে দেওয়া হয় গত রবিবার  বিকালে। সদর ইউনিয়নের মল্লিকপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ওসি মোস্তফা কামাল বলেন, তাকে উদ্ধারের পর ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দিতে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান তিনি একজন মানসিক প্রতিবন্ধি। এর আগের দিন শনিবার রাতে সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকা তাহিরপুরে ছেলেধরা সন্দেহে এক মানসিক রোগীকে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। পুলিশ জানায়, শনিবার রাত ১০টায় নদীর পাড়ে বসে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন এক  লোক  গলাকাটা-গলাকাটা বলে চিৎকার শুরু করলে  তাকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে লোকজন ওই ব্যক্তিকে পার্শ্ববর্তী দোকান ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখে। পরে তাকে বাদাঘাট পুলিশ ক্যাম্পে নেয়া হয়। রাতেই তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পুলিশ জানায়, সে মানসিক ভারসাম্যহীন । একই দিন রাতে জামালগঞ্জ উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে আরো এক মানসিক প্রতিবন্ধি যুবক  আফজাল হোসেন (২৬) গণধোলাইয়ের শিকার হয়। সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জানান, ইতিমধ্যে জেলার সবকটি থানায় মাইকিং করে এসব বিষয়ে সচেতনতার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

ইত্তেফাক/এমআরএম