নির্ভীক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ষাটের দশকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলন ও ছয় দফার আন্দোলনকে গণআন্দোলনে রূপ দেওয়ার পেছনে অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৫৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

১৯৬৯ সালের ১ জুন ৫৮ বছর বয়সে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ক্ষণজন্মা এই সাংবাদিক। এ দেশে সাংবাদিকতা জগতে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। গণমানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই বাংলার মানুষের হৃদয়ে তিনি অবিনশ্বর হয়ে রয়েছেন। মানিক মিয়া প্রচলিত অর্থে শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না। বরং এই অগ্রণী ব্যক্তিত্ব সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের মুক্তির পথ রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন নিঃশঙ্কচিত্তে। 

দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে অবলম্বন করে আজীবন দৃঢ়চেতা, মননশীল এবং দেশপ্রেমিক মানিক মিয়া এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সম্মুখ সারিতে থেকেছেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। সেজন্য তিনি বাংলার মানুষের কাছে ‘নির্ভীক সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।

ইত্তেফাক পূর্ব পাকিস্তানে যে ভূমিকা পালন করেছিল, তা ছিল সময়ের দাবি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আত্মপ্রত্যয়ী তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অবস্থান, ইত্তেফাকের সাংবাদিকতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান ছিল এক ও অভিন্ন। সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। একজন রাজনীতিমনস্ক সাংবাদিক হয়েও তার রাজনৈতিক কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল না, ছিল না ব্যক্তিগত কোনো লোভ। এ কারণেই সৎ ও নির্মোহ অবস্থান থেকে সত্য কথা বলার সাহস দেখাতে পারতেন। জেল-জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন এবং সরকারের অসহযোগিতাকে মোকাবিলা করে, নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে তাকে মানুষের অধিকারের কথা বলতে হয়েছে।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ায়। তার বাবা মুসলেম উদ্দিন মিয়া। শৈশবেই মানিক মিয়ার মা মারা যান। গ্রামের পূর্ব ভাণ্ডারিয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলে মানিক মিয়ার শিক্ষাজীবনের শুরু। পিরোজপুর জেলা সরকারি হাই স্কুল থেকে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৫ সালে মানিক মিয়া ডিস্টিংশনসহ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে কর্মরত থাকাবস্থায় ১৯৩৭ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার অন্তর্গত গোয়ালদি গ্রামের অভিজাত পরিবারের খোন্দকার আবুল হাসানের কন্যা মাজেদা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদের পরিচালনা বোর্ডের সেক্রেটারি পদে যোগ দেন।

মজিদা বেগম ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।

১৯৪৮ সালে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকায় চলে আসেন এবং সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৩ সালে তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ রূপান্তরিত হয়। মানিক মিয়ার সম্পাদনায় দৈনিক ইত্তেফাক আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামরিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ১৯৫৯ সালে তিনি এক বছর কারাভোগ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। ফলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য দুটি পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী বন্ধ হয়ে যায়। গণ-আন্দোলনের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি ফের প্রকাশিত হয়। ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরে সৃষ্ট দাঙ্গা ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে তা প্রতিরোধে স্থাপিত দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির প্রথম সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’, ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ আর ‘রঙ্গমঞ্চ’ শিরোনামে কলাম লিখে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতাকামী করে তোলেন মানিক মিয়া। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ১৯৬৯ সালের ২৬ মে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক কাজে রাওয়ালপিন্ডি যান। সেখানেই ১৯৬৯ সালের ১ জুন রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কর্মসূচি: দিনটি উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার আজিমপুর মাজার প্রাঙ্গণে সকাল ৮টা থেকে কুরআনখানি এবং বেলা ১১টায় দোয়া ও তবারক বিতরণ করা হবে। মরহুমের কনিষ্ঠ পুত্র আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর পক্ষ থেকে এতিমখানায় কুরআনখানি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া মরহুমের জ্যেষ্ঠ কন্যা মরহুমা আখতারুন্নাহার বেবীর পরিবারের পক্ষ থেকে নিজ বাসভবনে বাদ মাগরিব কুরআনখানি ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।