যেখানে নদী যায়

মহিবুল আলমের কাব্যে নারী, রাষ্ট্র ও প্রতিবাদের ভিন্নস্বর

মহিবুল আলম —একাধারে কথাসাহিত্যিক, কবি ও ভ্রমণপিপাসু। কুমিল্লার মুরাদনগরে জন্ম, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে বসবাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষে লেখালেখির সূচনা কলেজ জীবনে। পরে দৈনিক সংবাদ, বাংলার বাণী, ইত্তেফাকসহ বহু পত্রিকা ও সাহিত্য সাময়িকীতে গল্প লিখে পরিচিতি লাভ। প্রবাসজীবনের দীর্ঘ বিরতির পর ‘দিঘল মেঘের দেশে’ উপন্যাস দিয়ে পুনরাবির্ভাব।

বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রকল্পের মাধ্যমে স্বীকৃত এই লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশাধিক। ‘তালপাতার পুথি’, ‘মায়াগন্ধা’, ‘মরদ’, ‘ঈশ্বর’, ‘জোড়া সিঁথি নদীর তীরে’ প্রভৃতি উপন্যাসে উঠে এসেছে দেশ, রাজনীতি, প্রেম ও প্রবাসের বাস্তবতা। সাহিত্যচর্চার জন্য পেয়েছেন বাংলাদেশ, নিউজিল্যান্ড ও ভারতের বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা।

প্রবাসে থেকেও সাহিত্যের প্রতি অটুট ভালোবাসায় মহিবুল আলম একান্তে গড়ে তুলেছেন নিজের বাগান আর শব্দের জগত।

সম্প্রতি লেখক মাহবুব সেতু তার কাব্যগ্রন্থ যেখানে নদী যায় আমাকে উপহার দেন। পাঠ করে কবিতা কবিতা সম্পর্কে লিখতে আগ্রহী হলাম। চেষ্টা করেছি নানানমূখি আলোচনা করতে। নিশ্চয় পাঠক কবিকে বুঝতে পারবেন। বুঝতে পারবেন কবির সময় ও কবির কাব্যচিন্তার গভীরতা। 

“যেখানে নদী যায়” কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি একান্তভাবে আমাদের সমাজের উপেক্ষিত, প্রান্তিক, ও ভাঙা মানুষের আত্মকথন। এটি এমন এক কবিতার সংকলন, যেখানে নারীশরীর হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র, নদী হয়ে উঠেছে ভাগ্য এবং প্রতিটি শব্দ যেন একটি আর্তনাদ—যা শুনতে পায় না সভ্যতার মূলধারার লোকেরা। এই গ্রন্থে কবি মহিবুল আলম সমাজের বুকে গেঁথে থাকা শোষণ, পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রীয় নৈরাশ্য এবং নারীর প্রতি সহিংসতার গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক অনুধ্যান রূপায়ণ করেছেন কবিতার ভাষায়, যা কখনও রূঢ়, কখনও নগ্ন, আবার কখনও কষ্টমাখা কাব্যিকতায় ভরপুর।

বইটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নারী—শুধু একজন নয়, বরং একেকটি কবিতায় উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন নারীর চেহারা, চিহ্ন, যন্ত্রণা, আত্মপরিচয়, এবং বেঁচে থাকার কৌশল। এই নারীরা কখনও ‘ঠাঁইহীন যুবতী’, কখনও ‘বৈষ্ণবী দেহ’, কখনও শহরের নিলামঘরের পণ্য, আবার কখনও নদীর মতো ধীর, নিঃশব্দ, অথচ অভিমানভরা যাত্রার প্রতীক। তাদের শরীর কেবল যৌন রাজনীতির শিকার নয়, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার, সমাজের, এমনকি নিজ ভেতরের পরিণতির এক রাজনৈতিক মানচিত্র।

“যেখানে নদী যায়” মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে:
১. প্রথমত, এটি নারীর ওপর সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতার এক নির্মোহ প্রতিবেদন।
২. দ্বিতীয়ত, এটি কবিতার ভাষায় নতুন এক বাস্তব নির্মাণের প্রয়াস—যেখানে সুন্দর নয়, রূঢ়তাই কবিতার মূল শক্তি।
৩. তৃতীয়ত, এটি আমাদের তথাকথিত সভ্যতার নিচের স্তর উন্মোচনের চেষ্টা, যেখানে বিক্রি হয় মানুষ, চিহ্ন মুছে যায় আত্মপরিচয়ের, আর নদীও রক্তমাখা বয়ে যায়।

এখানকার কবিতাগুলো গদ্য-ছন্দ ও আখ্যানভিত্তিক কাঠামোয় নির্মিত হলেও প্রত্যেকটিতে রয়েছে প্রতীকী গভীরতা ও রাজনৈতিক উপপাদ্য। উদাহরণস্বরূপ, ‘নয় দুয়ারের বারো উঠোন’ কবিতায় শুধু যৌনপল্লির বর্ণনা নেই, আছে তার ভৌগোলিকতা, ইতিহাস, শ্রেণি ও বঞ্চনার নকশা। আবার ‘লাশবাহী কফিন’ বা ‘সচল শকুন’ কবিতায় মৃত্যু এবং পুরুষতন্ত্রের চিত্র রূপায়িত হয়েছে এমন এক ভাষায় যা চেতনায় প্রলম্বিত হয়।
এই গ্রন্থে নদী কেবল একটি প্রকৃতি নয়; নদী এখানে এক বহমান চেতনা—যা ধ্বংস, প্রতিবাদ, এবং আত্মপরিচয়ের দোলাচলে ছুটে চলে। যেখানে নদী যায়, সেখানেই জীবন ভাঙে, পুনর্গঠিত হয়, আর প্রতিবারই কিছু নতুন হারায়। কবি এই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে, তার হাতে আছে শব্দ, আর চোখে আছে সেইসব মুখ—যাদের আমরা ভুলে গেছি বা ভুলে যেতে শিখেছি।

পটভূমি, আপন অনুপ্রেরণা ও দৃষ্টিভঙ্গি “যেখানে নদী যায়” কাব্যগ্রন্থটি যেন এক নারীর অভ্যন্তরীণ নদীর প্রবাহ; যে নদী কখনও শান্ত, কখনও ক্ষুব্ধ, কখনও আবার নিঃশব্দে শুষে নেয় সমস্ত দুঃখ। এই কাব্যগ্রন্থের পেছনে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি—যেখানে নারীর শরীর, ভূমি ও প্রকৃতি হয়ে উঠেছে পুঁজিবাদী ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণের কেন্দ্রস্থল। কবির দৃষ্টিভঙ্গি এখানে শুধুমাত্র নারীবাদী নয়, বরং ন্যায্যতা, প্রতিবাদ ও এক আন্তঃসংলাপমূলক বয়ান তৈরি করা—যেখানে নারীর অভিজ্ঞতা একক নয়, বরং বহুমাত্রিক ও পারিপার্শ্বিকতার দ্বারা নির্মিত।

কবির আপন অনুপ্রেরণার উৎস খুঁজলে আমরা দেখি তাঁর গভীর সংলগ্নতা নদীর সঙ্গে—নদী এখানে কেবল প্রকৃতির অংশ নয়, বরং স্মৃতি, শরীর, ইতিহাস ও প্রতিরোধের প্রতীক। কবি বেড়ে উঠেছেন এমন এক ভূগোল-সমাজে, যেখানে নদী মানে শুধু জল নয়, বরং ভাঙন, স্থানচ্যুতি, আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারহীনতার প্রতিচ্ছবি। নারীর শরীর ও নদীর প্রবাহ—এই দুইয়ের মিলনস্থল থেকেই কবির কল্পনাশক্তি ও ভাষার নির্মাণ।

এই কাব্যগ্রন্থে কবি নিজেকে ‘প্রতিনিধিত্বকারী কণ্ঠ’ হিসেবে নয়, বরং ‘ভেতর থেকে উচ্চারিত কণ্ঠ’ হিসেবে প্রকাশ করেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আত্মজ ও সমষ্টিগত—তিনি ব্যক্তিগত বেদনা ও রাজনৈতিক উপলব্ধিকে একত্র করে এক নতুন ধ্বনি নির্মাণ করেন। কবি বুঝেছেন, নারীর নিপীড়ন কেবল যৌন বা সাংসারিক নয়; বরং তা মাটি, নদী, সম্পদ, ভাষা এমনকি স্মৃতির উপর নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়েও ঘটে। সেই বোধ থেকেই কবির কবিতা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা—যা নির্লজ্জ, খসখসে, নির্মোহ, কখনো রোমান্টিক-আভ্যন্তরীণ, আবার কখনো জননীসুলভ অগ্নিঝরা উচ্চারণ।

এখানে কবি কেবল কাব্য রচনা করেননি; বরং ইতিহাসের গহ্বর থেকে তুলে এনেছেন নারী ও প্রকৃতির অবদমিত কণ্ঠ, নিভে যাওয়া প্রতিরোধ, এবং সেইসব অলিখিত যন্ত্রণা যা রাষ্ট্রের দলিলে স্থান পায় না। “যেখানে নদী যায়” তাই কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়—এ এক সামাজিক দলিল, স্মৃতির মানচিত্র, এবং নারীর চোখে দেখা একটি শোষিত সমাজের অভিধান। কবির দৃষ্টিভঙ্গি সাহসী, বিশ্লেষণমুখী এবং একই সঙ্গে কাব্যিক—যা বর্তমান বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

মহিবুল আলমের কবিতা শুধু পাঠ নয়, মুখোমুখি হওয়া—আমাদের নিজেরই এক ভিন্ন মুখোশের, লজ্জার, দায়বোধের, অথবা অপরাধবোধের। কবির সাহসী ও ব্যতিক্রমী ভাষা নির্মাণ একদিকে আধুনিক কাব্যপ্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করে, অন্যদিকে ‘প্রতিবাদ-নির্ভর কাব্যভাষা’ নির্মাণে নতুন মাত্রা যুক্ত করে।

সুতরাং, “যেখানে নদী যায়” এমন একটি কাব্যগ্রন্থ, যা শুধু একটি পাঠ নয়—বরং একটি চিহ্ন, একটি কন্ঠস্বর, একটি সাড়াশি যাত্রা—নদীর মতোই গভীর, গোপন, অথচ অবিরাম। এ গ্রন্থ পাঠকের হৃদয় ভেদ করে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—"আমরাও কি সেই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক একজন নিলামকারী?"

কাব্যগ্রন্থটি প্রতীক ও চিত্রকল্পের এক চমৎকার সিম্ফনি। এখানে প্রতিটি কবিতার গর্ভে লুকিয়ে আছে বহুস্তর বিশিষ্ট প্রতীক, যেগুলোর মধ্যে অনেকগুলো রাজনৈতিক, কিছু সামাজিক, আর কিছু আত্মিকভাবে গঠিত। নদী এই গ্রন্থের মূল প্রতীক। এটি কেবল প্রকৃতির উপাদান নয়—বরং নারীর শরীর, ভাগ্য, নির্বাসন, রাষ্ট্রশক্তির প্রবাহ এবং অদৃশ্য এক সংগ্রামের রূপক। নদী এখানে একইসঙ্গে জীবন এবং ধ্বংস, বেঁচে থাকা এবং ভেসে যাওয়া—এই দ্বৈততার ধারক। শরীর একটি পুনরাবৃত প্রতীক—নারীর দেহ কখনো পণ্য, কখনো ভূমি, কখনোইবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মানচিত্র। শকুন, কফিন, বারুদ, টিনের চাল, আলোহীন উঠোন প্রভৃতি শব্দের প্রতীকী ব্যবহারে স্পষ্ট হয় রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা, বঞ্চনা ও অমানবিকতা।

চিত্রকল্প নির্মাণে কবি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন দৃশ্য, ঘ্রাণ, শব্দ ও গতি—যার ফলে কবিতা হয়ে উঠেছে দৃশ্যমান, যেন পাঠক নিজে সেই পরিবেশে প্রবেশ করতে পারে। যেমন, “লাশবাহী কফিন ছুঁয়ে নীল বাতাসে নদী লাল হয়ে ওঠে”—এখানে ‘নীল বাতাসে লাল নদী’ একাধিক অনুভূতির সংমিশ্রণে গঠিত চিত্রকল্প: শান্তির রঙে ছড়িয়ে পড়ছে রক্তের স্রোত।

এই কাব্যগ্রন্থে উপমা ও উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার অনেকক্ষেত্রেই ঋজু, সরল, আবার কিছু ক্ষেত্রে দ্রুতগামী ও সহিংস, যেমন: “নারীর চোখে জোছনার হাড়গিলে চাহনি”—এখানে উৎপ্রেক্ষাটি কেবল চাক্ষুষ সৌন্দর্য নয়, তা নারীর অন্তর্নিহিত কষ্ট ও আত্মগোপন বিষণ্নতাও বহন করে। আবার, “তোমার শরীর যেন পেট্রল বোমা, ছুঁলেই জ্বলে উঠি বিদ্রোহে”—এই উপমা নারীর শরীরকে বিপ্লবী প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে, যেখানে কামনা ও প্রতিরোধ একত্রে মিশে যায়। “তোমার স্তনের নিচে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে হানাদার হয়ে”—এই উৎপ্রেক্ষা একদিকে নারীর শরীর আরেকদিকে রাষ্ট্রশক্তির অনুপ্রবেশ ও দখলদারিত্বকে সাংকেতিকভাবে প্রকাশ করে। এই ধরণের উপমা-উৎপ্রেক্ষা কেবল কবিতার অলঙ্কার নয়, বরং কবিতার রাজনৈতিক ভাষা। কবির এই কৌশল আধুনিক বাংলা কবিতার এক সাহসী পরিসর নির্মাণ করে।

“যেখানে নদী যায়” আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। অনেক কবিতা ছোট ছোট গল্পের মতো গড়ে উঠেছে। নারীর একদিন, রাতের যন্ত্রণা, নদীর ধারে দাঁড়ানো যুবতী—সবই যেন একেকটি সংক্ষিপ্ত কাব্যিক আখ্যান। এই গ্রন্থে নারীর শারীরিক অভিজ্ঞতা ও নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি ‘আত্ম’কে নয়, ‘সমষ্টিকে’ তুলে ধরে। কবিতাগুলো ছন্দমুক্ত, কিন্তু ধ্বনিগতভাবে ছন্দপূর্ণ এক গতিময়তায় ভরপুর। ভাষা অনেকক্ষেত্রে নগ্ন, রূঢ়, কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এ ভাষা পাঠককে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করে।

এই কাব্যগ্রন্থের ভাষা, চিত্রকল্প ও কাব্যিক প্রতিবাদের নির্মাণ বাংলা আধুনিক কবিতার ধারায় এক অনন্য সংযোজন। এটি কেবল নারীর শরীর বা রাষ্ট্রের পরিসর নয়, বরং এক গভীর সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক অবস্থানও বটে—যেখানে প্রতীক হয়ে ওঠে অস্ত্র, চিত্রকল্প হয়ে ওঠে আর্তনাদ, আর কবিতা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের নতুন ব্যাকরণ।

এ বইয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর শৈলী, ভাষা এবং লোকজ উপাদানের অভিনব ও সংবেদনশীল ব্যবহার। এই কাব্যগ্রন্থে কবিতাগুলোর গঠন প্রথাগত ছন্দের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়—বরং গদ্যছন্দ ও ছন্দহীন বাক্যের সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে এক ধরনের কাব্যিক বিপ্লব, যা পাঠককে স্বস্তি নয়, অস্থিরতায় ফেলতে চায়। এখানে ছন্দের কাঠামো ভাঙার মধ্য দিয়ে যে কাব্যধারা রচিত হয়েছে, তা জীবনের খসখসে, কর্কশ ও অনির্বচনীয় বাস্তবতাকে প্রকাশের জন্য একদম উপযুক্ত।

এই কাব্যগ্রন্থে ভাষা হয়ে উঠেছে অস্ত্র। সাহসী, নগ্ন, সরল এবং নির্মমভাবে স্পষ্ট ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে কবি যে সত্য উচ্চারণ করেছেন, তা কোনো লজ্জা, পরোক্ষতা কিংবা অলংকারের আড়ালে ঢেকে রাখা হয়নি। নারী শরীর, নিপীড়ন, রাষ্ট্রীয় দখলদারিত্ব, যুদ্ধ, ক্ষোভ—এই সব বিষয়ে ভাষা কখনো গর্জে উঠেছে, কখনো ফিসফিস করে বলেছে, আবার কখনো যেন চিৎকার করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। “শরীরেই মানচিত্র আঁকে ওরা”, “তোমার স্তনের নিচে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে”—এই ধরনের পঙ্‌ক্তিতে যে সাহসী উচ্চারণ রয়েছে, তা মূলত নারীকে কেবল একটি শিকার নয়, বরং প্রতিরোধের প্রতিমূর্তি হিসেবেও তুলে ধরে।

লোকজ উপাদানের ব্যবহার এই কাব্যগ্রন্থকে দিয়েছে আরেকটি ব্যতিক্রমী মাত্রা। পুকুরঘাট, বটগাছ, শালিক, সোনালি ধান, কাঁচা-পাকা আমের ঘ্রাণ, লাল শাড়ি, গাঁয়ের মেয়ে, নদীর কূল, জুঁই ফুল—এইসব লোকজ প্রতীক বারবার এসেছে। কিন্তু এগুলো নিছক নস্টালজিয়া তৈরি করতে আসেনি, বরং অনেক সময়েই এই উপাদানগুলো বিদ্রোহ, শোষণ, অথবা লাঞ্ছনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, নদী শুধুই প্রকৃতি নয়—নারীর আত্মা, তার বহমানতা, আবার কখনো তার ক্ষরণ ও নির্বাসনও। কখনো নদীর দিকেই তাড়া করে রাষ্ট্রীয় বুলেট, কখনোইবা সেই নদীর জলেই ধুয়ে যায় পুরুষতন্ত্রের রক্তমাখা চিহ্ন।

শৈলীগতভাবে এই কাব্যগ্রন্থটি ফর্ম ভেঙে নতুন কিছু নির্মাণের সাহস দেখিয়েছে। কখনো কবিতাগুলি ছোট ছোট বাক্যে বিভক্ত, যেখানে প্রতিটি বাক্য একটি পূর্ণাঙ্গ অনুভবের আধার। কখনো আবার কবিতা হয়ে উঠেছে দীর্ঘ, অনর্গল, উগ্র এক অভ্যন্তরীণ মনোলগ। এই বিন্যাসের মধ্য দিয়ে পাঠককে প্রতিনিয়ত চমকে দেওয়া হয়েছে, ধাক্কা দেওয়া হয়েছে এবং নিজস্ব মূল্যবোধ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভাষা ও শৈলীর দিক থেকে এই কবিতা-সংকলন একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদপত্র। কবি সাহসিকতার সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র এবং পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন নারীর এক বিকল্প, আত্মসচেতন রূপ। কোথাও এই কাব্য প্রতিরোধের গান, কোথাও নীরব হাহাকার, কোথাও গ্লানির কষ্ট, আবার কোথাও বা উত্তাল বিপ্লবের ভাষা। এই বহুমাত্রিকতা কবির শৈলীকে করে তুলেছে সময়োপযোগী, জরুরি এবং অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

এই কাব্যগ্রন্থে ভাষার সাহস, ছন্দের ভাঙচুর, লোকজ উপাদানের রূপান্তর এবং চিত্রকল্পের রাজনৈতিক ব্যঞ্জনা মিলে এক অনন্য আধুনিক নারীকাব্যের জন্ম দিয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবার দাবি রাখে।

“যেখানে নদী যায়” কাব্যগ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ‘নয় দুয়ারের বারো উঠোন’। এই কবিতাটি শুধুমাত্র একটি নদীকে নিয়ে লেখা নয়—এটি এক বিস্তৃত অঞ্চলের ইতিহাস, স্মৃতি, হারানো শেকড় এবং তার সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নিপীড়নের গভীর প্রতিবেদন। কবিতা যেভাবে আরিচা নামের একটি উপনদীকে কেন্দ্র করে নিজের আখ্যান নির্মাণ করে, তাতে এই নদী হয়ে ওঠে কেবল একটি জলধারা নয়—একটি কৌমের নস্টালজিয়া, হারানো জনপদের হাহাকার, আর রাষ্ট্রীয় দখলদারিত্বের এক প্রতীক।

নস্টালজিয়ার উপস্থিতি কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে ছড়িয়ে আছে। “আরিচা নাম তার, সে উপনদী, কেউ ডাকে না আজ” – এই লাইনটি দিয়ে শুরুতেই কবি আমাদের নিয়ে যান সেই শূন্যতায়, যেখানে নদীর নামটুকুও মুছে যেতে বসেছে। নদী যেন কোনো এক গ্রামীণ নারীর মতো—কখনো গৃহিণী, কখনো কন্যা, আবার কখনো উপেক্ষিত বার্ধক্যে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস। এই আরিচা শুধু নদী নয়; এটি একসময়ের গঞ্জ, যেখানে জীবনের কোলাহল ছিল, পাট ব্যবসা ছিল, ছিল কৃষিজীবনের ছন্দ—যা এখন মৃতপ্রায়, শুষ্ক, নীরব। এই স্মৃতি কেবল কবির নয়, এটি বহুস্বরিক এক সামষ্টিক স্মরণ—যা পাঠকের মধ্যেও জেগে তোলে নিজ নিজ শেকড়ের খোঁজ।

অন্যদিকে, এই স্মৃতিমেদুরতা কেবল আবেগ দিয়ে তৈরি হয়নি—এর পেছনে রয়েছে স্পষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ। নদীর অস্তিত্ব হরণ মানে একটি জনপদের মৃত্যু। কবিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় কীভাবে বাঁধ নির্মাণ, নদী খননের নামে ব্যবসায়িক স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও শহরমুখী উন্নয়নের নামে ছোট ছোট জনপদ ধ্বংস হয়ে গেছে। “বাঁধ উঠল যেদিন, আরিচার বুক কাটা গেল সেইদিন”—এই এক পঙ্‌ক্তিতেই ধরা পড়ে নদীর দখল মানেই নারীর দখল, শস্যের দখল, এবং ইতিহাসের দখল। নদীর দখল এক শাসনতান্ত্রিক কৌশল, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করে শহরের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এখানে ‘বারো উঠোন’ কিংবা ‘নয় দুয়ার’ কেবল একটি ঘরের গঠন নয়—এগুলি একটি সম্প্রদায়ের বসতভিটার প্রতীক। কবি যে গ্রামীণ গৃহস্থালির অবয়ব তৈরি করেছেন, তা বাংলা লোকজ সংস্কৃতির এক গূঢ় প্রতিচ্ছবি। এই ঘর এবং উঠোনের মাঝে যে নারীরা বাস করত, যারা নদীর সঙ্গে কথা বলত, মাছ ধরত, কলস ভরত, তাদের হারিয়ে যাওয়া আসলে নারী জীবনের এক প্রান্তিকীকরণের গল্পও বটে।

আঞ্চলিক ভাষা ও উপমাগুলির ব্যবহারে কবিতা আরও বেশি মানবিক এবং জৈব হয়ে উঠেছে। কবি যে শব্দসম্ভার ব্যবহার করেছেন, তাতে যেন ধরা পড়ে মাটি, নদী, হাঁটুর নিচের কাদা, পা ডোবানো জলে কাঁটার খোঁচা—এই সব বাস্তবতা। এই কাব্যে আঞ্চলিকতাই হয়ে উঠেছে সর্বজনীন, কারণ এখানকার ইতিহাস, বেদনা ও স্বপ্ন কেবল একটি অঞ্চলের নয়—বাংলার হাজার নদী ও উপনদীর জীবনচক্রের সামগ্রিক প্রতিধ্বনি।

সব মিলিয়ে, ‘নয় দুয়ারের বারো উঠোন’ কেবল স্মৃতিমেদুর কোনো কবিতা নয়, এটি হয়ে উঠেছে একটি জনপদের অস্তিত্বচিহ্ন সংরক্ষণের প্রয়াস, যা ইতিহাসের পাঠও বটে। কবি নদীকে স্মরণ করে কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও নারীবাদী বাস্তবতার জন্য। এর মধ্য দিয়েই ‘যেখানে নদী যায়’ কাব্যগ্রন্থ আরও একধাপ এগিয়ে যায়—নদীর দিকে তাকিয়ে আমরা ফিরে দেখি আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, আমাদের হারানো ভূগোল, এবং আমাদের জেগে ওঠা মনুষ্যত্ব।

“শকুন কি তবে পুরুষেরা, নাকি কোনো যুবতীর দিঘল উঠোন?” — এই পঙ্‌ক্তিটি “যেখানে নদী যায়” কাব্যগ্রন্থের অন্যতম গভীর ও প্রতিবাদী উচ্চারণ, যা শুধু পুরুষতন্ত্র নয়, বরং নারীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক জটিল সামাজিক গেরোতন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করে। এখানে কবি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন রেখেছেন—যা কাব্যিক ভাষায় এক দার্শনিক প্রতিরোধের রূপ নিয়েছে। ‘শকুন’ প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে হিংস্রতা, মৃতজীবিতা ও ভোগ-অভিলাষী প্রবৃত্তির প্রতিনিধি হিসেবে। তবে কবি শুধু পুরুষদের এই প্রবৃত্তির বাহক হিসেবে চিহ্নিত করেননি; বরং পাঠককে ভাবতে বাধ্য করেছেন—এই শকুন কি ব্যক্তি হিসেবে পুরুষ, না কি সমাজের এক ধরণের লালসা, যা নারীকে প্রতিনিয়ত নিঃশেষ করে? অন্যদিকে, ‘যুবতীর দিঘল উঠোন’– শুধু এক নারীর ব্যক্তিগত পরিসর নয়, বরং তা নারীর দৈনন্দিনতা, শরীর, শ্রম, সামাজিকতা ও নিঃসঙ্গতা—সবকিছুর মেটাফর হয়ে ওঠে।

এই পঙ্‌ক্তি নারীবাদী পাঠেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কবি নারীকে কেবল ভুক্তভোগী করে দেখাননি; বরং তাঁর অবস্থানকে প্রশ্নের মাধ্যমে পুনর্পাঠের জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন। নারীর দিকেই যদি সমাজের লালসার কেন্দ্রবিন্দু হয়, তবে সেই সমাজ শুধু পুরুষ দ্বারা নির্মিত নয়—তাতে নারীও বহু সময় সক্রিয়, কখনো শিকার আবার কখনো কাঠামোর অংশ হয়ে অন্য নারীর নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। এই দ্বৈততা বা জটিলতার দিকেই কবি ইঙ্গিত করেন, যেখানে লিঙ্গ নয়, বরং মানসিকতা ও ক্ষমতার বিন্যাস হয়ে ওঠে আসল প্রশ্ন।

এই প্রশ্ন-ভিত্তিক কৌশল পাঠককে নিরুত্তর করে তোলে। একদিকে নারী–পুরুষ বিভাজনের ক্লিশে ভাঙে, অন্যদিকে সমাজে প্রচলিত দায় আর ভূমিকার সরলীকরণকেও চ্যালেঞ্জ করে। এর মধ্য দিয়েই কবি একটি রাজনৈতিক অবস্থান নেন—তবে তা প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষায় নয়, বরং আত্মজ প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা এবং প্রতীকী চিত্রের মাধ্যমে। এই পঙ্‌ক্তির সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি একযোগে কবিতা, প্রতিরোধ এবং সমাজ-মনস্তত্ত্বের উন্মোচন। শকুন কেবল একজন পুরুষ নয়—সে হতে পারে একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্রযন্ত্র, একটি বিশ্বাস, এমনকি নারী নিজেও, যদি সে নিজেকে বা অন্য নারীকে নিঃশব্দে শিকার হতে দেয়। কবির উপলব্ধি তাই একরৈখিক নয়, বরং বহুস্তরবিশিষ্ট ও আত্মসমালোচনায় উন্মুক্ত। প্রশ্নের মাধ্যমে কবি নারীর জীবনে নেমে আসা বৈষম্য ও নির্যাতনের প্রাত্যহিক কাঠামোগত উৎসের দিকেই আলো ফেলেন—এটি কেবল একটি পঙ্‌ক্তি নয়, একটি সাহিত্যিক জাগরণ।

“যেখানে নদী যায়” কাব্যগ্রন্থে এক বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটে, যেখানে নারী, তার শরীর ও আত্মা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক শোষণ এবং নদী বা প্রকৃতির সঙ্গে নারীর আত্মিক সম্পর্ক এক আন্তঃনির্ভর জটিলতায় উঠে এসেছে। কবিতাগুলো নারীর দেহকে নিছক প্রেম বা কামনার উপাদান নয়, বরং এক রাষ্ট্রীয় মুদ্রা, এক ভোট-চালিত ব্যবসার প্রতীক হিসেবে চিত্রায়িত করে। ‘ঠাঁইহীন যুবতী’, ‘চালতার ভাঁজ’, ‘নিলাম’, ‘বৈষ্ণবী দেহ’—এইসব কবিতায় নারীর শরীরে লেগে থাকে লিপস্টিক নয়, বরং নির্বাচনী পোস্টার; থাকে রাজনীতিকের ছায়া, মহাজনের সুদের হিসাব এবং শকুনের নির্লজ্জ দৃষ্টি। এখানে নারী শরীর রাষ্ট্রের ভোটের পণ্যে রূপ নেয়—যেখানে প্রেম নয়, চলে দরকষাকষি, ক্ষমতার রঙ।

‘লাশবাহী কফিন’ কবিতায় নারীচরিত্র নিজেই চায় নিজের লাশ নিজে বহন করতে। এটি নিছক আত্মনিহত প্রলাপ নয়, বরং এক অস্তিত্ববাদী প্রতিবাদ যেখানে মৃত্যু হয়ে ওঠে আত্মমর্যাদার রাজনৈতিক প্রকাশ। এখানে কফিন কেবল দেহ বহনের কাঠামো নয়, বরং তা প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়—এ এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আত্মার শেষ রেজোলিউশন। এ কবিতায় নারীর চাওয়া তার নিজের শেষযাত্রার নিয়ন্ত্রণ—ধর্ম, সমাজ, পরিবারের বাইরে গিয়ে নিজের মৃতদেহকেও সে স্বাধীনভাবে বহন করতে চায়। এই অভিপ্রায় এক গভীর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অস্বীকৃতির বহিঃপ্রকাশ—যা পিতৃতন্ত্র ও গেরোতন্ত্রের মুখে এক তীব্র প্রশ্নচিহ্ন।

‘নিলাম’ ও ‘সচল শকুন’ কবিতায় উঠে এসেছে এক নির্মম নগরবাস্তবতা—যেখানে শহর আর সভ্যতা অলংকার নয়, বরং একটি ভাঙনের মঞ্চ। এখানে মেয়েরা বিকোয়, সভায় তাদের দেহের দাম হাঁকা হয়, এবং রাজনীতিকেরা সেই দরপত্রে অংশ নেয় শকুনের মতো চোখ নিয়ে। শহরের দেয়ালে পোস্টার লাগানো হয়, কিন্তু দেয়াল কথা বলে না। পোস্টার জোড়া দেয় আত্মহীন রাজনীতি, আর গলির মোড় খুঁড়ে আনে এক অন্ধ মঞ্চ, যেখানে কোনো প্রেম নেই—শুধু টেন্ডার, উন্নয়ন, বাৎসরিক বাজেটের গন্ধ।

‘যেখানে নদী যায়’ বা ‘নয় দুয়ারের বারো উঠোন’—এইসব কবিতায় নদী যেন নারীর জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে এক হয়ে গেছে। নদী এখানে এক জৈবিক অভিজ্ঞান, এক নরম অথচ বহনশীল জীবনরেখা—যা শরীর বহন করে, আবার গিলে ফেলে। নদী এখানে শুধু জল নয়—এ নারীর নিঃসঙ্গতা, তার গর্ভ, তার দুঃখ, তার প্রান্তিক যাপন। আরিচা নামক জায়গাটিকে ঘিরে কবি নির্মাণ করেছেন স্মৃতির জটিল সামাজিক নথি—যেখানে ছিল চালতার গাছ, আর এখন কেবল থাকে ঘাম, শ্রম, চাকা, এবং ঘূর্ণিপাক রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের। নদী কখনও নারীর মতো—প্রকৃতি, উদার; আবার কখনও—ধ্বংসী, দূরবর্তী, আত্মবিচ্ছিন্ন।

এইভাবে “যেখানে নদী যায়” কাব্যগ্রন্থে দেহ, মৃত্যু, শহর ও নদী মিলেমিশে গড়ে তুলেছে এক সংহত ও প্রতিবাদী কাব্যিক বাস্তবতা—যেখানে প্রতিটি চিত্রকল্প, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি স্তবক উচ্চারণ করে এক অবদমিত, উপেক্ষিত, অথচ তীব্রভাবে জীবন্ত নারীর কণ্ঠস্বর। এটি কেবল কবিতার বই নয়, বরং এক ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দলিল—যার ভাষা সাহসী, যার প্রতীক বিচিত্র, যার চেতনা দ্রোহী, আর যার নদী সবসময় কোথাও না কোথাও চলে যায়।

“যেখানে নদী যায়” কাব্যগ্রন্থটি কেবল কবিতার সংকলন নয়—এটি বাংলা কবিতার ভেতরে এক রাজনৈতিক, দার্শনিক ও ভাষিক সীমানা ভাঙার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একদিকে নারীর শরীরকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পণ্যায়ন ঘটে—তার অনুপম, সাহসী ও প্রতীকসমৃদ্ধ ভাষায় প্রতিবাদ রচিত হয়েছে এই গ্রন্থে; অন্যদিকে নাগরিকতা বনাম প্রান্তিকতা, শহর বনাম নদী, রাষ্ট্র বনাম শরীর—এই দ্বন্দ্বগুলি থেকে উঠে এসেছে এক বিকল্প বয়ান, এক মহৎ কাব্যিক ইতিহাস, যা আমরা তথাকথিত মূলধারার সাহিত্যে কমই দেখি।

এই কাব্যগ্রন্থে নারীশরীর কেবল কামনার বস্তু নয়—বরং এক রাজনৈতিক ভূখণ্ড। এই ভূখণ্ডে জড়ানো থাকে ভোট, রাষ্ট্র, মহাজনের হিসাব, ধর্মীয় প্রতীক, মিডিয়ার মিথ, এবং সর্বোপরি, শকুনের মতো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলা সাহিত্যে বহু আগে থেকেই নারীর শরীর এসেছে প্রেম, কামনা, বিচ্ছেদ, বা মাতৃত্বের প্রতীকে। কিন্তু এখানে তা এসেছে যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে—এক এমন অঞ্চল যা বারবার লুপ্ত হয়, বিক্রি হয়, অথচ কখনও আত্মসমর্পণ করে না। এই দৃষ্টিকোণ বাংলা সাহিত্যে এক নতুন পর্ব সূচিত করে—যেখানে নারী নিজের দেহ ও দুঃখের ভাষা নিজেই নির্মাণ করে।

এই কবিতাগুলো নাগরিক ও প্রান্তিক বাস্তবতার এক অপূর্ব ভাষ্য নির্মাণ করেছে। শহর শুধু সভ্যতার নয়, ক্ষমতার—যেখানে বিক্রি হয় মানবদেহ, গণতন্ত্র, সম্ভ্রম। আর প্রান্তিকতা, যেমন নদীর ধারে গড়ে ওঠা গ্রাম বা আরিচার চালতা গাছ, ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সেই শহুরে রাস্তায়, যার মানচিত্রে তারা নেই। এই গ্রন্থ নাগরিক-প্রান্তিক সংঘাতকে একটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হিসেবে চিহ্নিত করে, আর তার ভাষা গড়ে তোলে নদী, দেহ, কফিন, এবং নিলামের প্রতীক দিয়ে। এখানে কবিতা হয়ে ওঠে বিকল্প ইতিহাসের বাহক—যেখানে স্মৃতি, শোষণ ও সংবেদনশীলতা একাকার।
"যেখানে নদী যায়" কাব্যগ্রন্থটি তুলনামূলক আলোচনার পরিসরে রেখে আমরা যদি আর্তুর র‍্যাঁবো (Arthur Rimbaud), সিলভিয়া প্লাথ (Sylvia Plath), বা মহাশ্বেতা দেবীর লেখনীর দিকে তাকাই, তাহলে এক গভীর সংলাপ খুঁজে পাই—যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক প্রতিরোধ ও ভাষার বিপ্লব একসাথে জেগে ওঠে।

র‍্যাঁবো ও ‘যেখানে নদী যায়’
র‍্যাঁবো ছিলেন এক ভাষাবিপ্লবী কবি, যিনি ঐতিহ্যগত ছন্দ ও নান্দনিকতা ভেঙে দিয়ে জীবন, শরীর, সময় এবং স্বপ্নের এক বিচিত্র অনুবাদ হাজির করেছিলেন। তাঁর "A Season in Hell" বা "Illuminations"–এ আমরা দেখি আত্মার ভেতরের বিদ্রোহ, কবিতায় সত্যকে শারীরিকভাবে অনুবাদ করার প্রয়াস। ঠিক তেমনি “যেখানে নদী যায়”-এ কবি নারীদেহ, নদী ও শহরের ভাঙনের মধ্য দিয়ে সমাজের স্তরগুলো চিত্রিত করেছেন—প্রথার বিরুদ্ধে এক কবিতার যুদ্ধ। যেমন র‍্যাঁবো লিখেছিলেন—
“I is another.”
(Je est un autre)
এখানে ব্যক্তিসত্তাকে বহুবচনে রূপান্তরের যে প্রয়াস, তা “যেখানে নদী যায়”-এ নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে উঠে আসে—নারী যেন নিজ দেহে বহন করে রাজনীতি, সমাজ, ইতিহাস ও ক্ষরণ। এখানে 'আমি' কেবল কবি নয়, সে ‘নদী’, ‘ঠাঁইহীন যুবতী’, ‘কফিন’, ‘শহর’–এক বহুবচনীয় স্বর।

সিলভিয়া প্লাথ ও আত্ম-বিস্ফোরণ:
সিলভিয়া প্লাথের কবিতা যেমন “Lady Lazarus” বা “Daddy”–তাতে শরীর, মৃত্যু, মানসিক ব্যথা এবং নারীবাদ একত্রে বিস্ফোরিত হয়। প্লাথ যেমন করে সাহসী, রুক্ষ ও নগ্ন ভাষায় নারীর অভিজ্ঞতা লেখেন, তেমনি “যেখানে নদী যায়”–এও আমরা পাই:
 “লাশ নিজে বহন করব আমি—
কফিনেও থাকবে আমার নাম।”
এটি আত্মহত্যার কামনা নয়, বরং অস্তিত্বের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার এক প্রতীকী প্রয়াস—যা প্লাথের আত্ম-বিস্ফোরণের ভাষার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। দুজনেই দেহ ও ভাষাকে পুনর্নির্মাণ করেছেন নারীজীবনের অন্ধকার অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করতে।

মহাশ্বেতা দেবী ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ
যেমন মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে আমরা দেখি সাঁওতাল নারী ‘দ্রৌপদী মেঝেন’ নিজের উলঙ্গ শরীরকে অস্ত্র করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তেমনি “যেখানে নদী যায়”–এর ‘বৈষ্ণবী দেহ’ বা ‘নিলাম’-এর নারীও নিজের বিক্রি হওয়া শরীরকে একটি ভাষা বানিয়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলে। রাষ্ট্র, সমাজ ও বাজার যখন নারীর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন এই কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে অস্ত্র।

তুলনামূলক দৃষ্টিতে যা স্পষ্ট
র‍্যাঁবো ভাঙেন ভাষার ছক, এখানে কবিও তাই করেন—ছন্দহীনতা, হঠাৎ সংলাপ, চিত্রকল্পের বন্যা দিয়ে।
প্লাথ আনেন আত্ম-প্রতিবাদের শব্দ, এখানে নারীদেহে সেই প্রতিবাদ গড়ে উঠে, স্পষ্ট ও রক্তাক্ত।
মহাশ্বেতা নারীকে করেন রাজনৈতিক প্রতীক, এখানেও নারী হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত কাব্যিক দলিল।
লোকজ ভাষা আর আঞ্চলিক প্রতীক যোগ করে এক বাঙালি নারীর নিজস্ব শব্দতন্ত্র—যা পাশ্চাত্য কবিতার সঙ্গে না মিলিয়েও এক তীক্ষ্ণ, স্বতন্ত্র প্রতিবাদ ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। 

এই কাব্যগ্রন্থে রয়েছে এক “মোহহীন কিন্তু গভীর সংবেদনশীলতা”—একপ্রকার কাব্যিক নির্মমতা, যা বাস্তবতাকে রূপক করে না, বরং বাস্তবের চামড়া খুলে তার ভেতরের কঙ্কাল দেখায়। কবিতা এখানে কোনো আলঙ্কারিক সৌন্দর্যচর্চার উপায় নয়, বরং এক চিৎকার, এক আত্মার প্রতিবাদ, এক অস্তিত্ববাদী ঘোষণা। এই কাব্যগ্রন্থ পাঠককে নান্দনিক আশ্বাস দেয় না; বরং তাকে ধাক্কা দেয়, প্রশ্ন তোলে, চেতনাকে অস্থির করে তোলে। এবং এই অস্থিরতাই এ কাব্যের দর্শন—যেখানে শরীর, স্মৃতি, মৃত্যু ও নদী মিলে গড়ে তোলে এক জ্যান্ত ভাষা, এক কাব্যিক দর্শন, যা বাংলা সাহিত্যে অনন্য। কাব্যগ্রন্থটি কোনো অনুকরণ নয়, বরং র‍্যাঁবো, প্লাথ ও মহাশ্বেতাদের মতো লেখকদের আত্মার এক আত্মীয়স্বরে কথা বলে। এটি এক ধরনের কাব্যিক প্রতিবাদপত্র, যেখানে নারী দেহ, নদী, লাশ এবং শহরের প্রতীকগুলো মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক নতুন নারীবাদী ভাষা—যা বাংলা কবিতার ইতিহাসে সাহসী, অনাড়ম্বর এবং রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য সংযোজন।

লেখক: কবি ও সম্পাদক