বাংলাদেশে এই প্রথম, সুপারি পাতা থেকে তৈরি হচ্ছে প্লেট ও ডাইনিং সামগ্রী। যা ১০০% প্রাকৃতিক, কম্পোস্ট্যাবল, বায়ো-ডিগ্রেডেবল। পরিবেশবান্ধব বলে সুপারি পাতার সামগ্রী বহু শতাব্দী ধরে উপমহাদেশের ঘরে ঘরে খাবার পরিবেশনে ব্যবহূত হয়ে আসছে বিভিন্ন আকারে ও উপযোগিতায়। সুপারি গাছের ঝরে যাওয়া পাতার খোল সংগ্রহ পূর্বক নীম পেস্ট, লেবুর নির্যাস ও উত্তপ্ত পানি দিয়ে পরিশোধিত করে ২১০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ডাইসের মাধ্যমে বিভিন্ন আকার তৈরি করা হয়। ঠাণ্ডা হয়ে গেলে পণ্যগুলো শক্ত হয় এবং খোলা হাতের স্পর্শ ছাড়াই বাছাই ও প্যাকেটকৃত হয় বলে পণ্য তৈরি হয় সর্বপ্রকার ব্যাকটেরিয়া এবং জীবাণুমুক্ত। প্লেট-ডাইনিং সামগ্রীগুলো তুলনামূলক শক্ত হয় বলে গরম, ঠাণ্ডা ও তরল প্রতিরোধক এবং মাইক্রোওয়েভ এবং ফ্রিজার নিরাপদ। শুষ্ক খাবার বহুবার পরিবেশন করা যায়, কিন্তু পানীয় বা গ্র্যাভি খাবার একবারই পরিবেশনযোগ্য।
অব্যবহারযোগ্য ও পচনশীল প্রাকৃতিক উপাদান থেকে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীতে রূপান্তরিত হয় বলে, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশে ব্যাপকহারে ব্যবহূত হচ্ছে সুপারি পাতার সামগ্রী। দৈনন্দিন ব্যবহার, অনুষ্ঠান, পার্টি, পিকনিক বা আউটিংয়ের জন্য বিশ্বের সর্ববৃহত্ অনলাইন মার্কেটপ্লেস amazon.com-এ পণ্যগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিগত প্রায় এক দশক ধরে ভারত ও চীন এই পণ্যের অন্যতম রপ্তানিকারক এবং কাঁচামাল সরবরাহকারী। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারি ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যায়, প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সকল প্রকার ভ্যাট-ট্যাক্স আওতামুক্ত ও রপ্তানি নীতিমালায় বিভিন্ন প্রণোদনা এবং ক্যাশ ইনসেনটিভ প্রাপ্ত। হস্তশিল্পের আওতায় স্থানীয় সরকার হতে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রাপক শিল্প হিসাবে নথিভুক্ত। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বলে উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশে রপ্তানি বাজারে প্রবেশে রয়েছে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা।
জুপেরিয়া ইন্কর্পোরেশন, ১০০% প্রাকৃতিক এই পণ্য সামগ্রীগুলো বাংলাদেশে এককভাবে বিপণন শুরু করেছে এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার, একজন নারী উদ্যোক্তা, যৌথভাবে উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ব্রাইট এরিকার সঙ্গে পণ্য উত্পাদন করছেন এবং একক বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছেন। নারী উদ্যোক্তা রহিমা আক্তার বলেন, ‘বর্তমানে প্লাস্টিকের সর্বগ্রাসী আগ্রাসন এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণের কথা চিন্তা করে আমরা পাট ও সুপারি পাতা নিয়ে কাজ শুরু করি এবং এই লক্ষ্যে ভারতের কেরালায় বিভিন্ন উত্পাদনকারীপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করি। আমরা প্রাথমিকভাবে ভারতের কেরালা থেকে পণ্যটি আমদানির পরিকল্পনার প্রাক্কালে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা এই উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি খুঁজে বের করি এবং চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে এখন পর্যন্ত সবপ্রকার বিপণন এবং উত্পাদন ক্ষমতায় সহায়তা করে আসছি। বর্তমানে আমরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং হস্তশিল্প মেলায় পণ্যগুলোর প্রচার ও প্রসার করে আসছি এবং চুক্তির মাধ্যেমে ইউনিমার্টসহ বিভিন্ন সুপার শপে এই পণ্য সরবরাহ করে আসছি। এছাড়াও বাংলাদেশে অবস্থিত সকল দূতাবাস, বহুজাতিক কোম্পানি এবং এনজিও এই পণ্যের অন্যতম ক্রেতা।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি কোনো নীতিমালা না থাকায় আমাদের ট্যাক্স এবং ভ্যাট প্রদান করতে হচ্ছে, যা ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যটির ক্রয়মূল্যকে বৃদ্ধি করছে এবং যা প্লাস্টিক পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম অন্তরায়। অথচ বিশ্বের কোনো দেশেই এই পণ্যের ওপর কোনো প্রকার শুল্ক নেই বরং ইনসেনটিভ প্রদান করা হয়। অব্যবহারযোগ্য ও পচনশীল প্রাকৃতিক উপাদান থেকে ব্যবহারযোগ্য পণ্য সামগ্রীতে রূপান্তরিত হয় বলে অন্যান্য দেশের মতো সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের এই পণ্যের জন্য দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার।’ জুপেরিয়া ইনকর্পোরেশনের কর্ণধার আরো বলেন, ‘যেহেতু পানীয় এবং খাবার প্লাস্টিক মাধ্যমে পরিবেশিত হলে খাবারের সঙ্গে বিক্রিয়ায় ক্যান্সারের মতো রোগ সৃষ্টিকারী করে এবং একটি পরিবেশ বিপর্যয়কারী পণ্য, সেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই দিকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া এবং প্রধাণমন্ত্রীর কার্যালয় হতে শুরু করে সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খাবার ও পানীয় পরিবেশনে প্লাস্টিকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা জরুরি।’ তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় কর্মরত সকল প্রতিষ্ঠানকেও এই ব্যপারে দ্রুত এগিয়ে আসার আবেদন রাখেন। অন্যথায় অধিক জনসংখ্যার এই দেশে প্লাস্টিক সামগ্রীর আগ্রাসী ব্যবহার সর্বদাই আমাদের সর্বোচ্চ দূষণকারী দেশের তালিকায় প্রথম দিকেই রাখবে এবং মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আক্রান্ত হবে জাতি।
বাংলাদেশে এই পণ্য সামগ্রী উত্পাদন এবং রপ্তানিতে রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। আমাদের দেশের উপকূলবর্তী জেলাসমূহ, যেমন :খুলনা, বাগেরহাট, লক্ষীপুর, নোয়াখালী অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক আকারে সুপারি উত্পাদিত হয়, কিন্তু সঠিক ব্যবহারের অভাবে এর পাতা বিনষ্ট বা সাধারণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়। সঠিক নীতিমালা এবং প্রণোদনা প্রণয়ন হলে, বর্তমান স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এইসকল প্রাকৃতিক সামগ্রী হতে পারে অন্যতম দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুনতম অধ্যায়।