ইরানের ভূগর্ভে নির্মিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর আঘাত হানতে সক্ষম যেসব অস্ত্র রয়েছে, তার একটি এখনো অব্যবহৃতই রয়ে গেছে এবং সেটি এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের নাগালের বাইরে। এটির নাম 'জিবিইউ-৫৭এ/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর' (এমওপি), যা সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।
এমওপি কোনো পারমাণবিক বোমা নয়। এটি এমন একটি নন-নিউক্লিয়ার 'বাংকার ব্লাস্টার' বোমা, যা মাটির নিচের বাংকার ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এই ধরনের বোমার দিক থেকে এটি পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়। নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এই বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের ওজন ৩০ হাজার পাউন্ড বা ১৩ হাজার ৬০০ কিলোগ্রাম।
এটি সম্ভবত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ফোর্দো কমপ্লেক্সকেও ভেদ করে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, যা কি-না পাহাড়ের অনেক নিচে অবস্থিত। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এমওপি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। -খবর বিবিসির
এই বোমা কী? এটি ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, 'জিবিইউ-৫৭এ/বি হলো এমন একটি শক্তিশালী অস্ত্র যা মাটির গভীরে থাকা শক্তিশালী বাংকার ও টানেলে আঘাত হানতে সক্ষম। এই বোমাটি প্রায় ছয় মিটার লম্বা হয় এবং এটি মাটির প্রায় ২০০ ফুট (৬১ মিটার) গভীরে প্রবেশ করে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে বলে ধারণা করা হয়। আর যদি ধারাবাহিকভাবে একের পর এক বোমা ফেলা হয়, তাহলে প্রতিটি বোমার বিস্ফোরণ মাটির আরো গভীরে প্রবেশের পথ তৈরি করে।
এমওপি বোমা নির্মাণ করেছে বোয়িং। এই বোমাটি প্রায় ২১ হাজার ৬০০ পাউন্ডের (৯ হাজার ৮০০ কেজি) ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) বোমার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। এমওএবি বোমাকে 'মাদার অব অল বোম্বসৎ'-ও বলা হয় এবং এটি ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে ব্যবহার করা হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্র্যাডফোর্ডের পিস স্টাডিজের এমেরিটাস অধ্যাপক পল রজার্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী অনেক চেষ্টা করেছে এমন এক ধরনের অস্ত্র তৈরির জন্য, যার আকার ও শক্তি 'এমওএবি' এর মতোই হবে, কিন্তু সেটির বিস্ফোরক অংশটি থাকবে খুবই শক্ত ধাতব খোলের মধ্যে। সেই চেষ্টার ফলাফল হিসেবে তৈরি হয়েছে ওই এমওপি বোমা।
বর্তমানে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বি-টু স্পিরিট বিমান এই এমওপি বোমা বহনে সক্ষম। এই বিমান স্টিলথ বম্বার বা বি-টু নামেও পরিচিত। অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'নর্থরপ গ্রুম্যান' কোম্পানির নির্মিত এই বিমানকে বলা হয় মার্কিন বিমান বাহিনীর সর্বাধুনিক বিমান।
প্রস্তুতকারকের মতে, বি-টু প্রায় ৪০ হাজার পাউন্ড (১৮ হাজার কেজি) অস্ত্রপরিবহন করতে পারে। তবে মার্কিন বিমান বাহিনী দাবি করেছে, এই বিমান একসঙ্গে দুইটি বাংকার ব্লাস্টার বোমা সফলভাবে বহন করেছে, যার ওজন প্রায় ৬০ হাজার পাউন্ড (২৭ হাজার কেজি)।
পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় এক ঘণ্টার মধ্যেই এটি পৌঁছাতে সক্ষম বলেও দাবি নর্থরপ গ্রুম্যান কোম্পানির প্রফেসর রজার্স বলেন, ইরানের মতো শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, এমন কোনো দেশের বিরুদ্ধে যদি এমওপি বোমা ব্যবহার করা হয়, তাহলে বি-টু বিমানের পাশাপাশি এফ-২২ বিমান এবং ড্রোনও লাগবে। আর এমন বোমার সংখ্যা আমেরিকার হাতে খুব সীমিত। তার মতে, যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করার মতো সব মিলিয়ে ১০-২০টির মতো আছে।
ইরানের বিরুদ্ধে এমওপি বোমা ব্যবহার করা হবে?
নাতাঞ্জের পর ফোর্দো হলো ইরানের দ্বিতীয় পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণকেন্দ্র। তেহরান থেকে প্রায় ৬০ মাইল (৯৫ কিলোমিটার) দক্ষিণ-পশ্চিমে কোম শহরের কাছে একটি পর্বতের নিচে এর অবস্থান। ২০০৬ সালে এর নির্মাণ শুরু হয় এবং ২০০৯ সালে এটি কার্যকর হয়। ঐ বছরই তেহরান প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ফোর্দোর অস্তিত্ব স্বীকার করে। এই স্থাপনাটি প্রায় ৮০ মিটার (২৬০ ফুট) পাথর ও মাটির গভীরে অবস্থিত এবং ইরান ও রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করাই হলো ইরানে হামলার মূল উদ্দেশ্য। তিনি ইরান ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ইসরায়েলের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর এই হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হলো ফোর্দো, জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। ইসরায়েলের যুক্তরাষ্ট্র দূত ইয়েখিয়েল লেইটার ফক্স নিউজকে বলেছেন, এই পুরো অভিযানের লক্ষ্য হলো ফোর্দো নিশ্চিহ্ন করা।
তবে ইসরায়েলের নিজের এমওপি ব্যবহারের সক্ষমতা নেই এবং এই ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণ না করলে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এককভাবে এই বোমা ব্যবহার করার অনুমতি দেবে না বলে মনে করছেন অধ্যাপক রজার্স। তার বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবেই চাইবে না যে ইসরায়েল এটি একা করুক। ফলে, ইরানের বিরুদ্ধে শেষ অবধি এই বোমা ব্যবহার করা হবে কি না, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র এখানে কতটা সরাসরি জড়াতে প্রস্তুত। বিশেষ করে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে।
অধ্যাপক রজার্স বলেন, সবকিছু নির্ভর করছে এই প্রশ্নের ওপর যে ট্রাম্প পুরোপুরিভাবে ইসরায়েলিদের সাহায্য করতে রাজি কি-না। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এমওপি ব্যবহার করলে সাফল্য আসবে কি-না সেটাও নিশ্চিত না। কারণ ফোর্দোর প্রকৃত গভীরতা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো সম্পূর্ণ অজানা।