ওয়েডিং প্ল্যানারে সফল ক্যারিয়ার

 

বিয়ে মানে হাজার ঝক্কি। ভেনু থেকে মেনু, লাইটিং থেকে ক্যাটারিং একসঙ্গে সব ঝামেলা সামাল দিতে হয় চারদিক। তবে আজকের এই ইঁদুরদৌড়ের যুগে এত সময় কোথায়? কিন্তু বিয়ে যেহেতু জীবনে লোকে একবারই করে, তাই সকলেরই স্বপ্ন থাকে একটা ‘গ্র্যান্ড ওয়েডিং’-এর, যা সকলে মনে রাখবে।

বর্তমানে সারা বছরই বিয়ের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। বিয়েবাড়ি মানেই হই হুল্লোড় আর খাওয়া-দাওয়া! তবে একই সঙ্গে যদি অন্যের বিয়ে দিয়ে নিজের পকেটটাও ভরে নেওয়া যায়, তা হলে কেমন হয়? অবশ্যই আনন্দের সঙ্গে লাভবান হওয়া। ওয়েডিং প্ল্যানার হলে সম্ভব ঠিক এমনটাই।

বিয়ে যেহেতু জীবনে লোকে একবারই করে, তাই সকলেরই স্বপ্ন থাকে একটা ‘গ্র্যান্ড ওয়েডিং’-এর, যা সকলে মনে রাখবে। তাঁদের এই স্বপ্নকে মূলধন করেই আপনি তৈরি করে ফেলতে পার নিজের ক্যারিয়ার। বিট্টু আর শ্রুতি।  আপনার কোনো আপনজনের বিয়ের কথা এখন মনে পড়তে পারে।  জাস্ট একটু ক্রিয়েটিভিটি আর হার্ডওয়র্ক— এই দুইয়ের কম্বো রাতারাতি হিট করিয়ে দিয়েছিল তাঁদের ওয়েডিং প্ল্যানিংয়ের ক্যারিয়ার। এ তো গেল প্ল্যানের কথা। তবে রিয়েল লাইফেও এমনটাই সম্ভব। কারণ ওয়েডিং প্ল্যানারদের আয় এবং চাহিদা দুইই দিন-দিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।

একটি বিয়েবাড়ির এ টু জেড আয়োজন এবং দেখাশোনার দায়িত্বে থাকে ওয়েডিং প্ল্যানাররা। বিয়েবাড়ির খুঁটিনাটি আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে শুরু করে বর-কনের সাজসজ্জা, বিয়েবাড়ির যাবতীয় কেনাকাটার পাশাপাশি অতিথি আপ্যায়ন, সবকিছুই সামলাতে হয় তাঁদের। অনেকসময় বিয়ের তারিখ পর্যন্ত ঠিক করতে হতে পারে ওয়েডিং প্ল্যানারদের। সেক্ষেত্রে ক্লায়েন্ট যে মতেই বিয়ে করতে চান না কেন সেই অনুযায়ী পুরোহিত, ফাদার বা কাজিসাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করাও তাঁদেরই দায়িত্ব। ক্লায়েন্টের ক্ষমতা অনুযায়ী বিয়ের বাজেট তৈরি করাও একটা গুরুদায়িত্ব। নিমন্ত্রিতদের লিস্ট তৈরি করা, আমন্ত্রণের জন্য কার্ড ছাপানো, একে-একে আমন্ত্রণ সেরে ফেলার জন্য সঠিক যানবাহনের ব্যবস্থা করা, সবই থাকে ওয়েডিং প্ল্যানারদের আয়ত্বে। বিয়েবাড়ির ভেনু ঠিক করে সময় মতো বুকিং সেরে ফেলাটা খুব কঠিন কাজ। ক্যাটারারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্লায়েন্টের পছন্দ অনুসারে মেনু ঠিক করা, ফোটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার, ডেকরেটর, মিউজিক ব্যান্ড ইত্যাদির ব্যবস্থাও সব পাকা করে রাখতে হয় ওয়েডিং প্ল্যানারদের। পাশাপাশি বিয়েবাড়ির অতিথিদের জন্য যাতায়াতের সুব্যবস্থা করা, বিয়ের দিন যাতে কোনো অসুবিধায় না পড়তে হয় তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে বসার জায়গা আর পানির ব্যবস্থা রাখার মতো ছোটখাটো তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ্রওপরেও নজর রাখতে হয় তাঁদের। বিয়ের দিন বর-কনে তো বটেই, তাঁদের পরিবারের লোকজনেরাও চায় নিজেদের সেরা রূপে সকলের সামনে আসতে। সেইমতো তাঁদের জন্য ড্রেস এবং অ্যাকসেসরিজ শপিং করা এবং বিউটিশিয়ানকে অ্যাপয়েন্ট করার কাজও করে থাকেন প্ল্যানাররা। তবে বিয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে যেটা জরুরি তা হলো রেজিস্ট্রেশন। বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ম্যারেজ রেজিস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং কোর্টে নোটিস দেওয়া, সবই সামলাতে হয় ওয়েডিং প্ল্যানারদের।

 

প্রয়োজনীয় দক্ষতা

ওয়েডিং প্ল্যানিংয়ের পেশা খুব ইন্টারেস্টিং। তবে এ পেশার ক্ষেত্রে কোনো গতে বাঁধা ছক নেই। বেশিরভাগ কাজটাই নিজের সৃজনশীলতার উপর নির্ভর করে করতে হয়। তাই বলা যায় এক্ষেত্রে ক্রিয়েটিভিটি ইজ দ্য কি ওয়ার্ড! ক্লায়েন্টের পরিবারের পছন্দ-অপছন্দ চট করে ধরে ফেলার ক্ষমতা থাকাটা বেশ জরুরি। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়ে কাজ করলে কাজটা আরও ভাল করে করা যায়। দেশের   যে কোনো জেলায় বিয়ে মানে বিড়াট উত্সব। এই উত্সবে সকলকে সামিল করে অনুষ্ঠানটিকে মাতিয়ে রাখার দায়িত্ব থাকে ওয়েডিং প্ল্যানারদের হাতেই। অনেকসময় অনেক কম বাজেটের মধ্যেও কাজ করতে হয় তাঁদের। তার মধ্যেও নিজেদের আইডিয়াকে কাজে লাগিয়ে বিয়েবাড়িটা হিট করে দেওয়ার মধ্যেই ফুটে ওঠে তাদের দক্ষতা। অর্গানাইজেশনাল স্কিল এই পেশার ক্ষেত্রে খুব দরকার। কোন মাকের্টে কোন জিনিস সহজে পাওয়া যায়, এই বিষয়ে একটা জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। নিজেকে সঠিকভাবে মার্কেট করা এ পেশার মূলমন্ত্র। আর প্রফেশনালিজম এ পেশার ক্ষেত্রে খুবই জরুরি।

 

প্রয়োজনীয় যোগ্যতা

এই পেশায় আসতে গেলে শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি দরকার পেশাগত দক্ষতার। যে কোনো বয়স বা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকেই এই পেশায় আসা যায়। বিয়ের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান সে বিষয়ে একটা স্বাভাবিক জ্ঞান থাকা দরকার। তবে এই পেশায় বিভিন্ন ধরনের ক্লায়েন্টদের সঙ্গে ডিল করতে হয় আর তার মধ্যে বেশিরভাগই হাই প্রোফাইল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি তাই ন্যূনতম উচ্চ মাধ্যমিক বা সমতুল পাশ করা থাকলেই হবে। বিভিন্ন ধর্মের নিয়ম-কানুন আর বাকি সূক্ষ্ম বিষয়গুলির ব্যাপারে একটা সুষ্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। প্রথমে কোনো ট্রেনিং নিয়ে নিলে বা অন্ততপক্ষে কোনো নামী প্ল্যানারের অধীনে অ্যাসিস্ট করলে কাজের দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা দুই-ই বাড়ে।

 

কাজের সুযোগ

কিছুদিন আগেও বাড়িতে বিয়ের উত্সব লাগলে সবাই মিলে সব আয়োজন করত। তবে এখন হাতে সময় কম আর ব্যস্ততাও বেশি। তবে গ্র্যান্ড ওয়েডিংয়ের স্বপ্ন অনেকেই দেখে। আর তাঁদের এই স্বপ্ন সত্যি করতে মাঠে নেমেছেন ওয়েডিং প্ল্যানাররা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওয়েডিং প্ল্যানিং এখন এক হিট ক্যারিয়ার। বাংলদেশে এই পেশার জনপ্রিয়তা লক্ষণীয় হারে বেড়েছে। বেশ কিছু ওয়েডিং প্ল্যানার সংস্থাও গড়ে উঠেছে সাম্প্রতিক কালে। সেখানে কাজের সুযোগ তো অবশ্যই আছে পাশাপাশি চাইলে নিজে স্বনির্ভরভাবেও কাজ যায়। ভাল কাজ পাওয়ার জন্য ভাল পোর্টফোলিয়ো থাকা প্রয়োজন। নিজের আগের কাজের কিছু ছবি দিয়ে তৈরি করতে হয় এই পোর্টফোলিয়ো। এটা ক্যাটালগ হিসেবে কাজ করে। ক্লায়েন্টরা বেশিরভাগ সময়ে এই পোর্টফোলিয়ো দেখেই ওয়েডিং প্ল্যানার নিবার্চন করেন। এছাড়া ওয়েডিং প্ল্যানিং ছাড়াও ব্রাইডাল কনসালট্যান্ট হিসেবেও কাজ করতে পারেন তারা।

 

আয়-রোজগার

ওয়েডিং প্ল্যানিং ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে কোনও বাঁধাধরা আয়ের অঙ্ক ধরে রাখা যায় না। বেশ কয়েকটা ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে আপনার পকেটে কত আসেব। এই পেশার ক্ষেত্রে একবার প্রতিষ্ঠা এবং নাম করতে পারলে রেট কার্ডেও পরিবর্তন আসে। তারপর নিজের টিমে কত জনকে নিয়োগ করছেন তার ্র্রওপরও নির্ভর করছে আপনার কতটা আয় হচ্ছে। তবে মোটামুটি বছরে দশ-বারোটা বিয়ে সুসম্পন্ন করতে পারলে কয়েকলাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করা যায়। কোনো ওয়েডিং প্ল্যানিং সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকলে শুরুতে মাসিক দশ থেকে বিশ হাজার  টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। পরবর্তীকালে সেটা বেড়ে ৪৫ হাজার বা তারও বেশি হতে পারে। সংস্থার রেপুটেশনের ওপরও অনেকটা নির্ভর করবে আপনার আয়-রোজগার।