প্রথা ভাঙা এক উদ্যোক্তার গল্প

 

গল্পটা এক প্রথাগত শৃঙ্খলজয়ী নারীর। নারীরা স্বাধীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণত এফ-কমার্স, ক্যাটারিং, বুটিক কিংবা পার্লারের মতো ব্যবসায় যোগ দিলেও একেবারে প্রথাগত ব্যবসার ক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। সেদিক থেকে কিছুটা ব্যতিক্রমই বলতে হবে তানজিমাকে। একজন মা, একজন গৃহবধূ এসব ছাপিয়ে আজ তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ঢাকার শ্যামলী-আদাবর এই দুই এলাকার জি-গ্যাস এর এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর তিনি। বেড়ে উঠা নাটোরে। কিছুটা সলজ্জভাবেই জানালো একেবারে কম বয়সে বিয়ে হয় তাঁর। তবে স্বামীর অনুপ্রেরণায় ১৯৯৯ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ততদিনে কোল জুড়ে এসেছে দুটি সন্তান। কখনো কোনো পেশায় জড়াবেন এমনটি নাকি ভেবেও দেখেননি। ২০০৩ সালে হারান তাঁর স্বামীকে। এখান থেকেই শুরু তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

নাটোর থেকে ঢাকায় এসে যোগ দেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। কর্মক্ষেত্রে দ্রুতই সাফল্য আসতে থাকে।  চাকরিতে যোগদানের ৪ বছরের মধ্যে একটি বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে।  ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন সেই সংস্থাটির বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে।

সফল করপোরেট ক্যারিয়ার থেকে ব্যবসায় কেন? জানতে চাইলে জানালেন সন্তানের আগ্রহের কথা। ছোটো সন্তান ছোটো থেকেই চাইতো ব্যবসায়ী হবে। সেই ভাবনা থেকে ছেলেকে অনুপ্রেরণা জোগাতেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিছুটা বাজার যাচাই আর করপোরেট অভিজ্ঞতার পরিচিতি কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নেন জি-গ্যাস এর ডিস্ট্রিবিউটর হবার। খুব একটা জটিলতা পোহাতে হয়নি ডিস্ট্রিবিউটর হবার অনুমতি পেতে। তাঁর প্রত্যয় আর আত্মবিশ্বাস দেখে তাঁকে শ্যামলী-আদাবর অঞ্চলের এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে বেছে নেয় জি-গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

কাগজে কলমে না হয় ডিস্ট্রিবিউটর হলেন, কিন্তু শুরু থেকেই যাত্রাটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। একে তো ভারী পণ্য, গোডাউনে সিলিন্ডার আনা নেওয়ার কাজটি করতে হতো মাঝরাতে, নিজে দাঁড়িয়ে থেকেই কাজ করাতে হতো তাঁর। এছাড়া তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেওয়াও কম চ্যালেঞ্জিং ছিল না। তবে আত্মবিশ্বাস হারাননি একটি দিনের জন্যেও। প্রথম বিক্রয়ের অভিজ্ঞতাও খুব মজার। শুরুতে বিক্রয়কর্মী না থাকার ফলে নিজেকেই ঘুরে ঘুরে করতে হয়েছে বিক্রয়ের কাজটি। ঢাকায় তাঁর মূল ক্রেতা অবশ্য বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট। ফলে খুচরা দোকানে যে শুধুমাত্র সিলিন্ডার পাঠিয়ে দেবেন সেটির উপায় নেই মোটেই, তাই সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে কাজ করতে হয় তাঁর।

একেবারে শুরুর ক্রেতা সম্পর্কে জানাচ্ছিলেন মজার এক অভিজ্ঞতা। রাজশাহীর শ্যামলী স্কয়ারে একত্রেই ৪০টি রেস্টুরেন্ট। স্বাভাবিকভাবেই তারা অন্যান্য ব্র্যান্ডের এলপি গ্যাস ব্যবহার করছিলেন, সেখানে নাকি মাত্র দুদিনেই ৪০টি দোকানকেই রাজি করিয়ে ফেলেন অন্য ব্র্যান্ডের সিলিন্ডারের পরিবর্তে জি-গ্যাস ব্যবহারের জন্য। একজন ব্যবসায়ীর জন্যে সবচেয়ে অনুপ্রেরণার যে বিষয়টি, প্রথম মাস থেকেই ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় ব্যবসা থেকেই তুলে আনা, ঠিক সেটিই ঘটে প্রথম মাস থেকে। ব্যবসার শুরু থেকে আজ অবধি স্থায়ী বিনিয়োগ ছাড়া পরিচালন ব্যয়ের জন্যে ব্যক্তিগত তহবিলে হাত দিতে হয়নি কখনোই।

আগেই উল্লেখ করেছি তানজিমা জি-গ্যাসের সাথে কাজ করছেন এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে, এর মানে তিনি অন্য কোনো ব্র্যান্ডের কোনো পণ্য বিক্রি করছেন না। কেন জি-গ্যাস? বিশেষ কোনো সুবিধা কি তিনি পাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে? বা কেমন করছে তানজিমার টিএমটি এন্টারপ্রাইজ? জানতে চাইলে জি-গ্যাস এর মহাব্যবস্থাপক, বিক্রয় ও বিপণন, আবু সাঈদ রাজা বলছিলেন যে এলপি গ্যাসের সবচেয়ে বড়ো বাজার ঢাকা, আর ঢাকায় শ্যামলী-আদাবরের মতো জায়গায় স্রেফ নারী বলে যে ডিস্ট্রিবিউটর এর দায়িত্ব প্রদান করব এমনটি হবার জো নেই। টিএমটি এন্টারপ্রাইজ ও তানজিমা যোগ্য বলেই তিনি এই কাজটি সুনামের সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আমাদের সবসময়ই চেষ্টা থাকে তাঁর জন্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা প্রদান করা ও তাঁর সাফল্যের গল্প সকলের সামনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা। তবে ব্যবসায়িক সম্পর্কের প্রশ্নে তাঁর আর অন্য ডিস্ট্রিবিউটরের মাঝে কোনো তফাত্ করি না আমরা।

তানজিমা জানাচ্ছিলেন তাঁর স্বপ্নের কথা, ব্যবসার পরিসর বৃদ্ধি করতে চান বহুগুণে আর পর্যায়ক্রমে পুরো ঢাকা শহরেই তাঁর বিপণন নেটওয়ার্ক তৈরি করা।