সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটায় গেলেই শোনা যাবে থেমে থেমে চলা করাতের শব্দ, কাঠ কাটা, হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠোকা, দড়ি দিয়ে বেঁধে গুন ও আলকাতরার টান। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আকার ও ধরনের কাঠের নৌকা। এখানকার কারিগররা নিপুন হাতে তৈরি করছেন একেকটি নৌকা যার কদর রয়েছে দেশজুড়ে।
সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য কেন্দ্র তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা। এখানে বছরের বারো মাসই চলে নৌকা তৈরির কাজ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই শিল্পকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক কারিগর।
কথা হয় ৬৫ বছর বয়সী মারজান গাজীর সঙ্গে। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে কারিগরি কাজ করে আসছেন তিনি। তার মত আরও শতাধিক নৌকা তৈরির কারিগর দিনরাত কাজ করছেন সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের পাটকেলঘাটা বলফিল্ড মোড়ে গড়ে ওঠা ছয়টি নৌকা কারখানায়। দৈনিক ৫০০ থেকে ৮০০টাকা মজুরিতে কাজ করছেন তারা। তাদের থাকা-খাওয়ার খরচ কারখানা মালিক বহন করে থাকেন।
বর্তমানে এসব কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে ট্রলার, কোশা, পালতোলা ও ডিঙ্গি নৌকা। তবে এর মধ্যে ডিঙ্গি নৌকার চাহিদা বেশি। মেহগনি, খৈ, চম্বল কাঠ দিয়ে তৈরি হয় এসব নৌকা। প্রতি নৌকায় ২০সিএফটি থেকে প্রকারভেদে ৪০সিএফটি কাঠ প্রয়োজন হয়। প্রতিটি ট্রলার এক মাস, পালতোলা ১০দিন, বড় নৌকা ৫দিন, মাঝারি ৩দিন ও ছোট ডিঙ্গি নৌকা তৈরি করতে ২দিন সময় লাগে। এছাড়াও ১৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো নৌকা কিনতে পারেন তাদের কাছ থেকে।
নৌকা কারখানার মালিক শেখ আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার পিতার ব্যবসার উত্তরাধিকার সূত্রে আমিও প্রায় ১৭ বছর ধরে এখানে কাঠের ফার্নিচারের সঙ্গে নৌকা তৈরির কাজ করছি। অতিবৃষ্টিতে দীর্ঘস্থায়ী জ্বলাবদ্ধতার কারণে নৌকার চাহিদা তুলনামূলক বেড়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন অনেক জলাবদ্ধ অঞ্চলের মানুষ ও মৎস্যঘের ব্যবসায়ীরা আসছেন নৌকা কিনতে। তাদের চাহিদানুযায়ী নৌকা সরবরাহ করতে আমাদের অনেক সময় হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জাকির হোসেন, আল-ইমরান ও আক্তারুজ্জামান বিশ্বাস এই ৩কারখানার মালিকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এবার নৌকা বেচাকেনা মোটামুটি ভালো। তবে কাঠ, পেরেক কাটা, পিচ ও আলকাতরার দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারখানার জায়গা ভাড়াসহ সকল খরচ মিটিয়ে যৎসামান্য লাভ হয়। তারপরও এই শিল্পকে তারা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
পাটকেলঘাটা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ সরদার বলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি নৌকা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ও বাইরের জেলা থেকে শ্রমিকরা এসে এখানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এমন শিল্পকে সব সময় উৎসাহিত করা উচিত।
তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. রাসেল বলেন, নৌকা তৈরির কাজের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের সরকারিভাবে যদি কোনো অনুদান, প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা থাকে, তা দেওয়ার চেষ্টা করব। এছাড়াও বেকারত্বের সমস্যা সমাধানসহ এলাকার উন্নয়নে যেনো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয় সেজন্য সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’