সম্প্রতি ফল মেলার শেষ দিনে, যাহা ঘটিল, তাহা কেবল কোনো মেলার বিশৃঙ্খলা নহে, ইহা একটি সমাজের অন্তর্নিহিত আত্মিক দৈন্য ও লুটেরা মানসিকতার নগ্ন প্রকাশ। রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের সামনের ময়দানে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ফল মেলার সমাপ্তি লগ্নে যেই 'লুণ্ঠন উৎসব' ঘটিল, তাহা লজ্জার, গ্লানির ও ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেতবাহী।
যেই ফলগুলি এতিমখানায় পৌঁছাইবার কথা ছিল, তাহা চলে গেল তথাকথিত 'সাধারণ' দর্শনার্থীদের ব্যাগে, হাতে ও পকেটে। কতিপয় মানুষ, যাহারা 'উন্নয়নশীল' দেশের 'শিক্ষিত নাগরিক' বলিয়া নিজেদের গর্ব করিয়া থাকেন, তাহারা কাহাকেও তোয়াক্কা না করিয়া, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের উপেক্ষা করিয়া ও শিষ্টাচার পদদলিত করিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িলেন ফলের স্তূপে। হায়! দেশের গবেষণাগার ও প্রদর্শনী স্টলগুলি, যেইখানে লোকে জ্ঞান আহরণে যাইবে, সেইখানে তাহারা গিয়াছিলেন লুটের আশায়।
এ প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজনের মন্তব্য মনে রাখিবার মতো- 'মেলায় যাওয়া মানেই উপহার নিয়ে ফেরা'-এমন মনোভাব মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে। হ্যাঁ, এই 'উপহার' নামক হস্তান্তর এখন মানুষ বুঝিয়া লইতেছে 'নিয়মবহির্ভূত ছিনিয়ে নেওয়া' রূ পে। প্রথমত, এই ঘটনা আমাদের দেশের সামাজিক শিক্ষার ভয়াবহ দৈন্যকে প্রকাশ করিল।
একটি দেশের নাগরিকেরা যদি ফল প্রদর্শনীকেও 'লুণ্ঠনের ক্ষেত্র' বলিয়া বিবেচনা করেন, তাহা হইলে সেই সমাজে আদর্শ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সভ্যতা কাহার আশ্রয়ে বাঁচিয়া আছে, তাহা সত্যই প্রশ্নের বিষয়। এই লুটেরাদের মাঝে যে শিশুরাও ছিল, তাহারা এখনই শিখিয়া লইল-'যদি সুযোগ মেলে, তাহা হইলে যাহা খুশি লইয়া ফেল, বাধা আসিলে কানে তুলিয়ো না।' দ্বিতীয়ত, আমরা যদি ভাবি-এই মানসিকতা কেবল সাধারণ জনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাহা হইলে তাহা হইবে আত্মপ্রবঞ্চনা। ইতিহাস সাক্ষ্য দিতেছে, সমাজে যখন লুটেরা মানসিকতা নিচের স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত হয়, তখন তাহার প্রতিচ্ছবি দেখা দেয় উপরতলায়ও। ইহাদের মানসিকতা হয় সেই ফল লুটের দর্শনার্থীদের হুবহু প্রতিবিম্বমাত্র- অবস্থানভেদে কেবল ক্ষুদ্র বা বৃহৎ।
বিশ্ব ইতিহাসে এমন উদাহরণ বহু, যেখানে এই লুণ্ঠনপ্রিয় প্রবৃত্তি সামগ্রিক সমাজকে তলানিতে ঠেলিয়া দিয়াছে। রোমান সাম্রাজ্য, একটি সময় যাহা ছিল জ্ঞান, শক্তি ও শৃঙ্খলার প্রতীক, তাহার পতনের অন্যতম কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ লোভ, দুর্নীতি ও ভোগবিলাসের অসীম আকাঙ্ক্ষা। আবার আফ্রিকার কতিপয় রাষ্ট্র-যেমন জাইরে (বর্তমানে কঙ্গো), সোমালিয়া অথবা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র-লুটেরাদের দৌরাত্ম্যে অর্থনীতি ও শৃঙ্খলা উভয়ই ধ্বংস হইয়াছে। আসলে, যে সমাজে মানুষ অধিকাংশ সময়ই ভাবে- 'আমার লাভটি আগে, নীতিনৈতিকতা পরে' সেখানে ন্যায় হয় বিক্রয়যোগ্য ও দুর্নীতি হয় গৌরবের বিষয়! যখন দেখিব, জনগণ স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া মঞ্চের ফল লুটিয়া লইতেছে, তখন বুঝিতে হইবে-এই সমাজের অনেকেই বিশ্বাস করেন, সুযোগ হইলেই টুকিয়া লইতে হয়। আর সেই সুযোগ যদি সিস্টেম নিজেই দেয়, তাহা হইলে তো কথাই নাই।
এই রূপ মানসিকতা রোধ করিতে হইলে চাই নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ। বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে 'নৈতিকতা' নামক বিষয়টি কেবল একটি অধ্যায়ের নাম নহে, বাস্তব জীবনের শৃঙ্খলা শিক্ষা দানের অনুশীলন হইতে হইবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া-ইহাদের মাধ্যমে সমাজে এই বোধ জাগাইতে হইবে যে, 'সকল কিছু পাওয়ার মতো নহে, কিছু কিছু ছাড়িতে হয়, কর্তব্য ও দায়িত্বের প্রয়োজনে।'
আমরা যদি চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হইবে বিবেকবান, দায়িত্বশীল ও সংযমী-তাহা হইলে আজই থামাইতে হইবে এই লুটেরা মানসিকতার পাগলা ঘোড়াগুলিকে। অন্যথায়, যেই সমাজে ফলের মেলা লুণ্ঠনের উৎসবে পরিণত হয়, সেই সমাজে একদিন যেই কোনো কিছুকে লুণ্ঠনের পণ্যে পরিণত করিবে।