বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) তাপসী রাবেয়া হলে র্যাগিংয়ের ঘটনায় পাঁচ নারী শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তিনজন শিক্ষার্থীকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার এবং আরও দুইজনকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২৭ জুন) বাকৃবির তাপসী রাবেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড মো হেলাল উদ্দীনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অর্ডিন্যান্স ফর স্টুডেন্ট ডিসিপ্লিন’ এর ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শাস্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে কৃষি অনুষদের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মারিয়া সুলতানা মীমকে ১২ মাসের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া একই অনুষদের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জোবায়দা জান্নাত সোহা এবং আশিকা রুশদাকে ৬ মাসের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এছাড়াও প্রভোস্টের আওতাধীন শাস্তি অনুসারে কৃষি অনুষদের দ্বিতীয় বর্ষ ও প্রথম বর্ষের অন্য ২ জনকে ১ হাজার টাকা করে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে।
শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা জানান, প্রশাসন দুই পক্ষকে একসঙ্গে বসায়নি। ওই মেয়ে (ভিক্টিম) অনেক অভিযোগ আমাদের নামে দিয়েছে যার কোনো প্রমাণ নেই। আমরা মানছি যে, রাতে বসাটা আমাদের ভুল ছিল তবে তার উপর শারীরিক নির্যাতন ও ফোন কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
শাস্তিপ্রাপ্ত দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বলেন, ঘটনার শুরু ১৯ মে দিবাগত রাত ২টার দিকে আমি আমার রুমে পড়তে ছিলাম তখন তার (ভিক্টিম) একজন সহপাঠী আমাকে এসে জানায় যে সে (ভিক্টিম) আমার নামে খারাপ কথা বলে বেড়িয়েছে। এরপর আমি ও আমার একজন সহপাঠী এবং ভিকটিম ও তার আরও তিনজন সহপাঠী মিলে আমরা গেস্ট রুমের পাশে একটা জায়গায় বসেছিলাম। আমরা তখন ছাঁদে ছিলাম তাই তিনজন জুনিয়রের একজন তাকে ছাঁদে আসতে বলে বিষয়টি সমাধানের জন্য। পরে সে ছাঁদে আসতে চাইনি তাই আমরা গেস্ট রুমের পাশে একটা জায়গায় বসেছিলাম যেখানে সিসিটিভিতে সব দেখা যায়। আমরা তার প্রতি কোনো শারীরিক নির্যাতন করিনি, তার ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়নি। তবে সেদিন একঘন্টা ৪৫ মিনিট মতো আমাদের আলোচনা চলে। পুরো ঘটনা সিসিটিভি রেকর্ড আছে। ওই মেয়ে সেদিন দোষ স্বীকারও করেছে এবং পরের দিন বাসায় চলে যায় এখানো আসেনি।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, আমাদের বক্তব্য হচ্ছে কোনো শারিরীক নির্যাতন তো এখানে নাই তাহলে এতো বড় শাস্তি কেন? ভিকটিমের বয়ানে অনেকগুলো ভুল ও মিথ্যা কথা বলেছে আমরা যেগুলো প্রভোস্ট ও হাউজ টিউটর ম্যামদের সঙ্গে বসার সময় প্রমাণ করেছি। ম্যামরা বায়াসড ছিল। ম্যামরা আমাদের চরিত্র নিয়ে অনেক কথা বলেছে, প্রভোস্ট ও হাউজ টিউটর মিলে আমাদের ৫ জনকে বলেছে আমাদের নাকি মেয়ে ঘটিত সমস্যা আছে। প্রভোস্ট ও হাউজ টিউটর ম্যাম পরীক্ষার আগে আমাদের রাত ১১টা বা সাড়ে ১১টার দিকে আমাদের ডেকে জেরা করে, বয়ান না পড়িয়ে স্বাক্ষর করে নেয়। ২৭ মে ম্যামরা আমাদের একে একে ডাকেন। আমাদের বয়ান নিয়ে আমাদের পড়তে না দিয়েই আমাদের স্বাক্ষর করে নেয়। আমরা বলেছিলাম তার উপর কোনো টর্চার করা হয়েছে কি না, সেখানে সিসিটিভি আছে, ভিডিও আছে সেটা দেখে ব্যবস্থা নেন। হল প্রশাসন আমাদের কোনো কথা শুনেনি। ম্যামরা জোর পূর্বক আমাদের স্বীকার করিয়ে নেয় একপ্রকার। হলের ম্যামরা আমাদেরকে তিনটা শর্ত দেয় পরে আমরা এই বিষয় প্রক্টর স্যারকে জানিয়েছিলাম, পরে এটা নিয়ে আরো আলোচনা হয়। এরপরে আমাদেরকে আর কিছু বলে নাই তারপর হুট করে আজকে এই নোটিশটা আসলো।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, র্যাগিংয়ের অভিযোগ পাওয়ার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। হল প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করেছে এবং আমরা প্রক্টরিয়াল বডি থেকেও একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। উভয় পক্ষ থেকেই লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল। এরপর সংশ্লিষ্টদের পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে আমাদের কাছে দাখিল করা হয়। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ঘটনার পরদিন সকালেই পরীক্ষা না দিয়ে বাড়ি চলে যায় এবং বাসা থেকেই অভিযোগ পাঠায়। পরে হল প্রশাসন তাকে ডেকে এনে সরাসরি বক্তব্য নেয় এবং বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
ঘটনার বিষয়ে তাপসী রাবেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলী বলেন, এটি হলের অভ্যন্তরীণ একটি বিষয় ছিল এবং তদন্তে আমরা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছি। তদন্ত কমিটিতে আমি নিজে ছাড়াও হলের তিনজন হাউজ টিউটর সদস্য হিসেবে ছিলেন। আমরা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য নিয়েছি এবং তদন্ত করে প্রতিবেদন উপাচার্য স্যারের কাছে উপস্থাপন করেছি। পরে অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগ ছিল, রাত ১টা ৪৫ মিনিট থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত পাঁচজন মিলে ভুক্তভোগী ছাত্রীকে মানসিকভাবে নির্যাতন করেছে। মেয়েটি সে সময় অসুস্থ অনুভব করছিল এবং বারবার জানাচ্ছিল সে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ছে, স্ট্রোক করতে পারে। কিন্তু অভিযুক্তরা নাকি তখন বলেছে, ‘মারা যাওয়ার আগে কিছু লক্ষণ তো দেখাও।’ বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক। আমরা মেয়েটিকে অভিভাবকসহ ডেকে এনে তার বক্তব্য নিয়েছি এবং পৃথকভাবে অভিযুক্ত পাঁচজনের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছি। অভিযুক্ত পাঁচ শিক্ষার্থীর মধ্যে একজনকে ১২ মাসের জন্য, দুইজনকে ৬ মাসের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং বাকি দুইজনকে ১ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।